প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক ২০১৮ : কিছু প্রশ্ন - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক ২০১৮ : কিছু প্রশ্ন

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত ২৬ ফেব্রুয়ারি বুধবার তার কার্যালয়ের শাপলা চত্বরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৮ বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রাক্কালে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বিজ্ঞানকে শিক্ষার ভিত্তি হিসাবে ধরে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্লাস নাইন থেকে ছাত্রছাত্রীরা বিষয়ভিত্তিক হিসেবে বিভাজিত হয়ে যায় যার কোন প্রয়োজন নেই। এখানে উল্লেখ্য যে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সভায় বক্তব্যে বলেছেন দেশের শিক্ষার হার বেড়েছে সত্যি কিন্তু এখন থেকে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে। তিনি কারিগরি তথা জীবনমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমান একই ভাবে কর্মমুখী, প্রকৃতিমুখী ও জীবনমুখী শিক্ষার ডাক দিয়েছিলেন যা তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লিখিত রয়েছে। ১৯৭২-এর সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা অন্তর্র্ভুক্ত করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে গণমুখী/সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার কথা, সবার জন্য অবৈতনিক/বাধ্যতামূলক শিক্ষা ও সমাজের প্রয়োজনে শিক্ষা। বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, সুষ্ঠু জাতি-সমাজ গড়তে শিক্ষা অপরিহার্য, শিক্ষায় ব্যয় ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ, নারী শিক্ষাঅপরিহার্য, সমাজের চাহিদা ও জাতির প্রয়োজনে শিক্ষা, শিক্ষার ক্ষেত্রে মেধার লালন ও পৃষ্ঠপোষকতা, মেডিকেল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর জোর দেয়া, জাতির প্রয়োজনে আলোকিত মানুষ তৈরি, ড. খুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন কার্যকরকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ১৯৭৩ সালের গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ জারি ইত্যাদি। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে এ তথ্য জানা যায়। 

সম্পাদকীয়তে আরও জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বিগত এগারো বছর ধরে রাষ্ঠ্রীয় ক্ষমতায় আসীন এবং সেই সময়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সব অর্জনগুলো সাধিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাক প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অসমতা দূরীকরণ, শতভাগ শিশু ভর্তি নিশ্চিত করন, বিনামূল্যে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে পুস্তক বিতরন, নারী শিক্ষার প্রসার, একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রবর্তন, ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য নিজ ভাষায় পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুতআরোপ, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা, শিক্ষা বৃত্তি/আইটি শিক্ষার প্রসার ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট গঠন উল্লেখযোগ্য।

বর্তমান সরকার গুণগত শিক্ষা বিশেষত উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে বিভিন্নমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন যার মধ্যে দাতা সংস্থার অর্থায়নে হেকাপ (Higher Education Quality Improvement Project) প্রকল্প অন্যতম, শিক্ষার স্বীকৃতির জন্য (Accredation Council) গঠন করেছে, শিক্ষার্থীদের সম্মাননার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ইত্যাদি এবং এসব কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রাপ্তসংস্থা হলো ইউজিসি যার সদর দপ্তর ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত। এই সংস্থাটি গত কয়েক বছর যাবত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মদ্যে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক বিতরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রচলিত নিয়মানুসারে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক বিতরণ এই শিরোনামে ইউজিসির ওয়েবসাইটে নির্ধারিত ফরমে শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে স্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে দরাখাস্ত আহ্বান করা হয়। বিভিন্ন অনুষদের নির্ধারিত বছরের শ্রেষ্ঠ নম্বর বা সিজিপিএ প্রাপ্তরাই এই পদকের জন্য নির্বাচিত হন।

বর্তমান বছরে দেশের ৩৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭২ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বর্ণপদক বিতরণ করা হয় যার মধ্যে ৮৪ জন ছাত্র এবং ৮৮ জন ছাত্রী। এখানে উল্লেখ্য যে, পদকপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়েরগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে দেশে বর্তমানে সরকারি ৪৬টি ও বেসরকারি পর্যায়ে ১০৫টি মোট ১৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৩৬টি (৩০.৪৬%) এ পদকের আওতায় আসল কেন। বিষয়টি যদিও এমন হয় যে উল্লেখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মাত্র স্বল্পসংখ্যকের ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণ এটাই প্রমাণ করে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ইউজিসির ওয়েবাইটের সঙ্গে পরিচিত নয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে ইউজিসি ওয়েবসাইটে পর্যালোচনা করেনা স্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের তাদের শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে অবহিত করলে হয়তো তাদের অংশগ্রহণ অনেক বাড়ত।

যদি তথ্য আসে যে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ব্যবস্থাপনা খুব দুর্বল তা হলে হয়তো ভুল হবে না যার প্রমাণ এ পুরস্কারে তাদের প্রতিনিধত্ব ১.৩২ আর পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৪.৩৫%। তার অর্থ এই যে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেও আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে এর অনুশীলন করতে আমাদের পথ চলার অনেক বাকি রয়েছে যদিও এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনেকটা অসম রয়েছে। যদিও ইউজিসি ওয়েবসাইটের পাশাপাশি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে লিখিত চিঠি (Hard copy) পাঠাতে হলে স্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের তাদের জনসংযোগ (public relations) বিভাগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের খুজে বের করার প্রয়াস চালাতে পারত। বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে পাস করা শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের কে কোথায় দেশে কিংবা বিদেশে রয়েছে তার তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে (Data Base) এ আছে কিনা তা জানা নেই এবং বিষয়টিতে নজর দেয়ার গুরুত্ব থাকা উচিত।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউজিসির নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথাবার্তা এবং গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৮ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আগে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য ইউজিসি চেয়ারম্যানের আগারাগাঁও কার্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়েরগুলোর অভিন্ন ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে এক আলোচনা মিলিত হন। এই প্রতিষ্ঠানটি (ইউজিসি) শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান থেকে সরে এসে আসন্ন শিক্ষাবর্ষে (২০২০-২১) সমমনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে চারটি গুচ্চ ভাগে ভাগ করে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আরও একটি গুচ্চ ভর্তি পরীক্ষা হবে। এ প্রক্রিয়ার সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন প্রশ্নে তিনটি পরীক্ষা যেমন বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখার জন্য একেকটি পরীক্ষা হবে।

তবে ১৯৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে চলা চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা ইউজিসি আয়োজনে ভর্তি পরীক্ষা অংশ নেবে না। বর্তমানে ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মধ্যে ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয় সম্মান প্রথম বর্ষে ভর্তির আসন রয়েছে ৬০ হাজার। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি এবং সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার মনোন্নয়নে বদ্ধপরিকর।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচর্য হিসেবে সদ্য সমাপ্ত কয়েকটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেছেন কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় দিনের বেলায় পাবলিক রাতের বেলায় প্রাইভেটে পরিণত হয়। তিনি বিশেষ করে সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্সের কথা উল্লেখ্য করেছেন যা থেকে প্রতি সেমিস্টারে জনপ্রতি পঁচাত্তর থেকে আশি হাজার টাকা আয় হয়। এই কার্যক্রমের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ধারার কার্যক্রম ক্ষতির সম্মুখীন হয় যা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এসব কোর্স বন্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চিঠি প্রদান করে যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

তারপরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম, উপাচার্যদের অদক্ষতা, কর্মস্থলে (ঢাকার বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয়) তাদের অনুপস্থিতি থাকা, নিয়োগ বাণিজ্য/ছাত্র ভর্তি বাণিজ্য পরিচালনা ইত্যাদি নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় যা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তেমন কিছুই করার থাকে না শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবহিত করা ছাড়া। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান যার পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা উপাচার্যদের হাতে ন্যস্ত।

এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের যার সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনের সম্পর্ক রয়েছে এবং একডেমিক-প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে উপাচার্যরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রশাসনকে সহায়তা করবে সেটাই প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য আলোকিত মানুষ তৈরি করা আর শিক্ষকরা হচ্ছে এই মানুষ তৈরির কারিগর এবং এর মধ্যে অনেক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন যা সমাজের আরও দশটি মানুষের তুলনায় ভিন্ন। তাছাড়াও গবেষণার জন্য বাজেট বৃদ্ধি, শিক্ষকদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য কাজ করছে।

লেখক : ড. মিহির কুমার রায়, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website