প্রাথমিকে মহাজোট, নেই কেন তত চোট - মতামত - Dainikshiksha

প্রাথমিকে মহাজোট, নেই কেন তত চোট

মো. সিদ্দিকুর রহমান |

প্রাথমিক সহকারীদের শিক্ষক মহাজোট নামে পরিচিত সংগঠনটিতে এখন চরম বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এতে বিশেষ করে সহকারীদের মনে চরম ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। আট মাস পূর্বে প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম ও বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতিসহ শিক্ষকদের সকল সংগঠন সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে অনশনকে মহাঅনশনে রূপান্তরিত করেছেন। সেদিন সহকারী নেতৃবৃন্দের মাঝে মঞ্চে মাইক নিয়ে টানাটানির ছবি মিডিয়া ও ফেসবুকে দিয়ে অনেককে নেতৃত্ব জাহির করতে দেখা গেছে। 

আজকের এ বিভক্তি নিয়ে শিক্ষকদের মনে প্রশ্ন, এ মহা অনশন কি তাহলে প্রতারণা ছিল? মাননীয় মন্ত্রীকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোষামোদি করে ডেকে এনে অনশন ভাঙানোর কী প্রয়োজন ছিল? অনশনরত শিক্ষকদের ক্ষোভের মুখে মন্ত্রী বলেই ফেললেন, ‘আপনাদের নেতাদের কথামতো তো আমি অনশন ভাঙাতে এসেছি। তবে নেতারা যদি বৈষম্যের যৌক্তিকতা বোঝাতে পারেন, বৈষম্য দূর করে দেব।’ এ বৈষম্য বোঝাতে ও বুঝতে নেতৃবৃন্দসহ ডিজি. অফিসকে ৮ মাস সময় লেগে গেল। এবার মন্ত্রণালয়ের বোঝার পালা। অর্থমন্ত্রণালয়সহ বাকি মন্ত্রণালয়ের বোঝার তো এখনও বাকি। বিলম্বে সমস্যার সমাধান বাধাগ্রস্ত হয়। অনশন ভঙ্গ যদি নেতৃবৃন্দের ইচ্ছায় না হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীমহোদয়ের ইচ্ছেয় হতো, তবে বৈষম্য দূরীকরণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতো।  

বৈষম্য দূরীকরণে নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের প্রধান অভিভাবক হিসেবে মাননীয় মন্ত্রীও দায় এড়াতে পারেন না। প্রাথমিক শিক্ষার ছুটি, সময়সূচি, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা ৩ বছর পর প্রাপ্তি, ননভ্যাকেশনাল সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নেতৃবৃন্দ ভাবনাহীনভাবে উদাস দৃষ্টিতে বসে আছে। প্রাথমিক শিক্ষা মহাপরিচালক মহোদয়ের দ্বিতীয় ও সর্বশেষ গণশুনানিতে আমি বিষয়টি প্রাথমিকের সকল নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে উপস্থাপন করেছিলাম। এছাড়া সময়সূচি নিয়ে ইউনেস্কোর ‘শিক্ষার জবাবদিহি: আমাদের দায়বদ্ধতা পূরণ’ আলোচনা সভায় প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষাবান্ধব সময়সূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বক্তব্য রেখেছিলাম। আমার বক্তব্য শেষ না হতেই মহাজোটের জনৈক শীর্ষ নেতা বিরোধিতা করে বলেছিলেন, আর্ন্তজাতিক বিশ্বের সাথে মিল রেখে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি সারাদেশে এক শিফটের বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নেই বলে জানান। সেদিন এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ একে তো আমি বয়স্ক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও ক্ষুদে লেখক, মহাজোটের শীর্ষ নেতারা ভ্রান্ত বক্তব্যের খোলস উম্মেচন করা সেই সময় সমীচীন ছিল না বলে অনুভব করেছিলাম।

অন্যদিকে দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষকদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা জন্ম নেয়ারও আশঙ্কা ছিল। মহাজোটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা দূরীকরণের চ্যালেঞ্জ হলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ তেল প্রয়োগ। স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারে সহকারী, প্রধান শিক্ষক, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের তেল প্রয়োগে বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকেন।  প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের জন্য তেল প্রয়োগে কারো যেন মাথাব্যথা নেই। ফলে সমস্যার সমাধান না হয়ে কেবলই সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। প্রাথমিকের কেন্দ্রীয় নেতারা আজকাল শিক্ষকতা লাভের পর সময়ক্ষেপণ না করেই নেতৃত্বের শীর্ষে ওঠার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন।

তাদের আছে শুধু শিক্ষার বড় বড় ডিগ্রি, না আছে ত্যাগী মনোভাব-অভিজ্ঞতা, না আছে প্রাথমিক শিক্ষার অতীত-বর্তমান জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। অথচ পূর্বের নেতৃত্ব ছিল ত্যাগী, বিচক্ষণ, সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন।  

আজকালকার মহাজোটের মহাসমাবেশ দেখে প্রায় নস্টালজিক হয়ে পড়ি। এরশাদের আমলে ওসমানী উদ্যানে প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি সভা হয়। সেদিনের ওসমানী উদ্যান ছিল গাছপালাশূন্য। আগের রাতে বৃষ্টি হয়ে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কাদা পানি। সে কাদা পানিতে ২ লক্ষ শিক্ষকের সমাবেশ। সেদিন সমাবেশকে জোরদার করার জন্য পরিবারের সদস্যদের আসতে হয়েছিল। সে সভায় পোষ্য কোটা, কল্যাণ ট্রাস্ট, এক বছরের ট্রেনিং, বেতন স্কেলের অসঙ্গতি, প্রাথমিক শিক্ষকদের ৫০ শতাংশ বেসরকারি চাকরি সরকারি গণনা করে টাইম স্কেল, পেনশনের সুবিধা, প্রদানসহ অসংখ্য সমস্যা সমাধান হয়েছিল। উক্ত সমাবেশে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ পুরো ওসমানী উদ্যানে কাদাপানিতে কানায় কানায় পূর্ণ শিক্ষকদের দেখে বলেছিলেন, ‘সমাবেশ আর মহাসমাবেশ কাকে বলে আপনাদের নেতা অধ্যাপক আসাদ আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।’

বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের সংখ্যা ও নাম সঠিকভাবে বলা দুরূহ ব্যাপার। বেশিরভাগ সংগঠনকে দেখা যায় ফেসবুকে স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য তেল প্রয়োগে ব্যস্ত থাকতে। আজকে প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সমস্যা দূরীকরণে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন প্রয়োজন। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া  কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন সম্ভব নয়।  

সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন এককভাবে নয়, যোগ করতে হবে প্রধান শিক্ষক, দপ্তরি কাম প্রহরী, বিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত ম্যানেজিং কমিটিসহ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে এগিয়ে নিতে হবে আন্দোলন। প্রত্যেকের যৌক্তিক দাবি নিয়ে এগিয়ে গেলে গড়ে উঠবে ৮১ সালের মতো ৩ মাস ১০ দিনের প্রাথমিক বিদ্যালয় তালাবদ্ধ কঠোর আন্দোলন। সামরিক সরকারের মতোই নাড়া দেবে সংশ্লিষ্টদের ভিত। 

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে অর্জিত হবে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাসহ শিক্ষা পরিবারের সকল বৈষম্য। স্বার্থসিদ্ধির জন্য তৈল প্রয়োগ প্রবণতা ত্যাগ করার মাধ্যমে নেতৃবৃন্দই সর্বাগ্রে পদক্ষেপ নিতে পারেন এই আন্দোলনের। প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকলকে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সংগ্রামী ভূমিকা পালন গ্রহণ করে স্বীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাই। প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকলের মাঝে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রমী মনোভাব জাগ্রত হোক।

প্রাথমিকের সহকারী বেতন বৈষম্যসহ সকল বৈষম্য দূরীকরণে ত্বরান্বিত করার একমাত্র ভরসা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে নেতৃবৃন্দকে মন্ত্রণালয়ে ডাকা সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই না। সময়ক্ষেপণ করে সমস্যা জিইয়ে রাখা হলে বর্তমান শিক্ষা বান্ধব সরকারের সুনাম ক্ষুন্ন ছাড়া কিছুই বয়ে আনবে না। প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের অভিভাবক হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে দ্রুত সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নেবেন এ প্রত্যাশায় প্রাথমিকের শিক্ষকদের সাথে আমি একমত।

 

লেখক: আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম ও দৈনিক শিক্ষার সম্পাদকীয় উপদেষ্টা 

শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর হচ্ছে নীতিমালা - dainik shiksha শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর হচ্ছে নীতিমালা প্রাথমিকে ৬১ হাজার শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হবে - dainik shiksha প্রাথমিকে ৬১ হাজার শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হবে দৈনিকশিক্ষার প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরকে ওএসডি - dainik shiksha দৈনিকশিক্ষার প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরকে ওএসডি প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার রুটিন - dainik shiksha প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার রুটিন ভিকারুননিসায় ৪৪৩ অতিরিক্ত ভর্তি, সাবেক অধ্যক্ষকে শোকজ - dainik shiksha ভিকারুননিসায় ৪৪৩ অতিরিক্ত ভর্তি, সাবেক অধ্যক্ষকে শোকজ তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র - dainik shiksha তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে - dainik shiksha বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর - dainik shiksha এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website