প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯ প্রসঙ্গে - মতামত - Dainikshiksha

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯ প্রসঙ্গে

মো. সিদ্দিকুর রহমান |

দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের পর ৯ এপ্রিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯ জারি করেছেন । বৈষম্যে জর্জরিত প্রাথমিক শিক্ষা। বৈষম্য অবসানের স্বপ্ন নিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগে আমাদের এ স্বাধীন সার্বভৌম প্রিয় মাতৃভূমি। দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী ও পুরুষের নিয়োগ বিধিমালায় বৈষম্য ছিল। এখন থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক পদে নিয়োগে নারী ও পুরুষ প্রার্থীদের নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্বীকৃত বিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি। এই পদে নিয়োগের জন্য পূর্বে নারীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচ.এস.সি) বা সমমানের ডিগ্রি। পুরুষদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বর্তমান নিয়োগ বিধির মতোই দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক(সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি রাখা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় নারী ও পুরুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা বৈষম্য নিরসনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুভ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। এতদিন মহিলা শিক্ষকদের যোগ্যতা কম থাকায় খানিকটা হলেও উচ্চ ডিগ্রিধারী মহিলা শিক্ষকের শিক্ষার সুযোগ থেকে শিশু শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত ছিল। অপরদিকে মহিলাদের উচ্চ মাধ্যমিক ডিগ্রি ছিল অনেকটা শুভঙ্করের ফাঁকি। প্রতিযোগিতায় খুব কম সংখ্যক মহিলা এ যোগ্যতা নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসতে সক্ষম হয়েছে।

অপরদিকে এ যোগ্যতা দেখিয়ে সহকারি শিক্ষকদের বেতন স্কেলের বৈষম্য সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়। পূর্বে প্রধান শিক্ষকের পদে সরাসরি ৩৫শতাংশ নিয়োগে যোগ্যতা ছিল মাস্টার্স বা স্নাতক ও ৩ বছরের অভিজ্ঞতা। অথচ বর্তমানে সহকারি শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের একই যোগ্যতা। আবার ৬৫শতাংশ প্রধান শিক্ষকের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৭ বছরের সহকারি শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বের মত মাস্টার্স বা শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। একই যোগ্যতায় ৭ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে পদোন্নতি, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে আরেকটি বৈষম্য। সরাসরি নিয়োগে একই যোগ্যতায় অভিজ্ঞতা বিহীন প্রধান শিক্ষকেরা অভিজ্ঞ সহকারি শিক্ষকদের দেখভাল করবেন। বিষযটি মোটেই সমীচীন নয়। মানসম্মত ও ফলপ্রসু প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস গঠনের জন্য দাবী ও লেখালেখি করে আসছি। এর পরেও প্রাথমিক শিক্ষায় বহু মন্ত্রী ও সচিব দায়িত্ব পালন করে চলে গেলেন। কেউ বিষয়টি নিয়ে কিঞ্চিত ভাবছেন বলে দৃশ্যমান নয়। দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশের গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগীসহ সকল মন্ত্রণালয়ের ক্যাডার সার্ভিস আছে। একমাত্র নেই শিশু শিক্ষার জনগোষ্ঠী বিশাল শিক্ষক, কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। প্রাথমিক শিক্ষা ঘুরে দাড়ানোর অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো নিজস্ব ক্যাডার সার্ভিস।

অভিজ্ঞতা বিহীন কর্মকর্তা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষার জন্য শুভ নয়। এক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষায় ক্যাডার সার্ভিস সৃষ্টি করে সহকারি শিক্ষক পদকে এন্ট্রিপদ ধরে শতভাগ প্রমোশন কার্যকর করা হলে প্রাথমিক শিক্ষা হবে অধিকতর কার্যকর ও শিক্ষাবান্ধব। মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কিছুদিন পূর্বে এক সভায় বলেছেন, প্রাথমিকের সহকারি শিক্ষকেরা ৮০% প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাবে। প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় কেন তাঁর বক্তব্য বা মনের ইচ্ছা বাস্তবায়ন হলো না। আমাদের মনে সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় সমস্যা দীর্ঘসূত্রিতার আরেকটি চ্যালেঞ্জ পূর্বের মন্ত্রী বা কর্মকর্তারা ফাইল যেটুকু এগিয়ে এনেছেন সেই কার্যক্রম স্থগিত করে নতুনভাবে কার্যক্রম চালু করা। যার দৃষ্টান্ত হলো ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রধান শিক্ষকদের ১০ গ্রেড ও সহকারি শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডের কার্যক্রম মন্ত্রী বা কর্মকর্তা রদবদলের সাথে সাথে বানরের তৈলাক্ত বাঁশের মতো নেমে আসে। অনেক হতাশার মাঝেও প্রাথমিক শিক্ষা এগিয়ে চলছে। তার কিছু দৃষ্টান্ত মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি আশাতীত সফলতা অর্জন করেছে। এখন পূর্বের ন্যায় শিক্ষকেরা বা শিক্ষক নেতারা ছুটি না নিয়ে শিক্ষা অফিসে, মহাপরিচালক ও মন্ত্রণালয়ে ঘুরাঘুরি করেনা। আমার অনেক সেন্হভাজন নেতারা আক্ষেপ করে বলেছেন, আপনার লেখালেখির জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে তথা অফিসে অগেরমত যেতে পারিনা।

আমি তাদের বলেছি আমার লেখালেখির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে যথাযথ শিশুদের পাশে অবস্থান করা কাজে কিছুটা সহযোগিতা করতে পেরেছি বলে আমি ধন্য। শিক্ষকরা নিয়মিত ও সময়মত বিদ্যালয়ে আসেনা। এ দায় কি একা শিক্ষকদের ? মাননীয় মন্ত্রী থেকে তৃণমূলের কর্মকর্তা পর্যন্ত এ দায় নিতে হবে। কতিপয় নেতাকে দেখেছি মহাপরিচালকের দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে থেকে বছরের পর বছর শিশুদের অধিকার বঞ্চিত করে যাচ্ছেন। তাদের দেখাদেখি তৃণমূলের নেতারাও এ কর্মে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছেন। এ কাজ তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ মন্ত্রী, সচিব, ডিজিসহ তৃণমূলের কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা। বর্তমানে পৃষ্ঠপোষকতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষকেরা এখন বিদ্যালয়মুখী। মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ সকলকে শিক্ষকদের স্কুলমুখী রাখার কার্যক্রমের জন্য অভিনন্দন জানাই। এ কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়লে আগামী প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আরো প্রশংসনীয় উদ্যোগ যা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম আল হোসেন চালু করেছেন।

তা হলো One day one word, বিদ্যালয় ভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, দেখে দেখে পড়তে পারার যোগ্যতা মূল্যায়ন। যা প্রাথমিক শিক্ষায় বিশাল অগ্রগতি হবে বলে আশাবাদী। প্রাথমিক শিক্ষাকে কাঙ্খিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিশুদের পরীক্ষা না নেওয়ার সফল কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কিন্ডারগার্টেনসহ সকল শিশুর অভিন্ন মূল্যায়ন ব্যবস্থা, বই ও কর্মঘন্টা প্রয়োজন। মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর প্রতি সবিনয় নিবেদন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের ওপর অভিন্ন বিধি প্রয়োগ করুন। আগামী প্রজন্মকে সুশিক্ষিত ও সুনাগরিক হিসেবে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা সম্পূর্ণ কর্মীর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্মত করার লক্ষ্যে সহকারি শিক্ষক পদ এন্ট্রি ধরে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত শতভাগ পদোন্নতি দিলে প্রাথমিক শিক্ষা ভরে যাবে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জনবল দিয়ে। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষাবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বৈষম্যহীন সোনার বাংলা গড়ে উঠুক।

লেখক: আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ এবং প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম; সম্পাদকীয় উপদেষ্টা, দৈনিক শিক্ষা

 

তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র - dainik shiksha তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট - dainik shiksha ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে - dainik shiksha বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর - dainik shiksha এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website