বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সাধারণ মানুষের শিক্ষা কেমন চলছে? - শিক্ষাবিদের কলাম - Dainikshiksha

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সাধারণ মানুষের শিক্ষা কেমন চলছে?

মো. সিদ্দিকুর রহমান |

২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ বর্তমান সরকারের এক যুগান্তকারী ঐতিহাসিক সাফল্য। এ ছাড়াও অবকাঠামোগত, আইসিটি, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ অসংখ্য উন্নয়নকে ম্লান করে দিয়েছে শিক্ষক সংকটসহ নানাবিধ কাজের যন্ত্রণা। ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বরণের পর থেকে চলে আসছে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর নির্মম ছোবল।

এরশাদ ও বর্তমান সরকারের আমলে কিছুটা ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করেও প্রশাসনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের জন্য আজ প্রাথমিক শিক্ষা কঙ্কালে পরিণত হতে চলেছে। স্বাধীনতার পর নিদারুন অভাবে খাদ্য, বস্ত্র, রাস্তাঘাট, পুল, রেলপথ, বাড়িঘর ধ্বংসের মাঝে সরকারি শূন্য কোষাগার নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল তৃনমূলের সাধারণ মানুষের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশ যখন অভাবের যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, সে সময়ে তিনি ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেড় লক্ষ প্রাথমিক শিক্ষকের চাকুরি জাতীয়করণ করেন। এ মহামানবের আবির্ভাব না হলে স্বাধীন জাতি ও সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের অহংকার আজ কোথায় থাকতো জানিনা? বেসরকারি শিক্ষকেরা আজও বৈশাখী ভাতা থেকে বঞ্চিত। বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্ত থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। স্বাধীনতার পূর্বে প্রাথমিক শিক্ষকদের স্বল্প বেতন হাট বারে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পোষ্ট আফিসের পিওনের কাছে ধর্না দিয়ে নিতে হতো। প্রাথমিক শিক্ষায় ও শিক্ষকদের জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্টের পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা তথা শিক্ষকদের ওপর কাজের ব্যাপকতা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। শিক্ষক সংকটসহ নানা বাড়তি চাপ আজ প্রাথমিক শিক্ষকদের অমানুষিক যন্ত্রণা হয়ে দাড়িয়েছে। মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা সংকট নিরসন না করে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে শিক্ষকদের দায়ী করে আসছেন।

এ যেন নিজেদের দায় শিক্ষকদের ওপর চাপানোর এক অপকৌশল। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করবে এ প্রত্যাশা শিক্ষকসহ দেশবাসীর। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গাইবান্ধার সুন্দরবন উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষক নেতা মো. মাসুদুর রহমান শিক্ষকদের  শিওরক্যাশের যাতনা থেকে মুক্তির আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘ইতোপূর্ব উপবৃত্তির টাকা বিতরণ করা হতো ব্যাংকের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত উপবৃত্তি কার্ডে তথ্য সংযুক্ত করে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস পর্যন্ত উপবৃত্তির অর্থ বিতরণ করা হয়েছিল।

২০১৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই থেকে ডিসেম্বর এই ছয় মাসের এক কিস্তির অর্থ প্রদান করা হয় শিওরক্যাশের মাধ্যমে। তাই প্রয়োজন প্রত্যেক সুবিধাভোগীর জন্য শিওরক্যাশের একাউন্ট খোলার। রুপালী ব্যাংক শিওরক্যাশের একাউন্ট খুলতে শিক্ষকরা শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রেখে ৪/৫ দিন ধরে এক নাগাড়ে ফরম পূরণ করেছেন। এর পরে আছে টপশিট তৈরি ও সংশোধন। এ এক মহা কর্মযজ্ঞ। অত:পর বিতরণ করা হয়েছিল জুলাই-ডিসেম্বর কিস্তির উপবৃত্তির টাকা।

শিওরক্যাশের মাধ্যমে উপবৃত্তি প্রদানে অনেক বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়। ২০ থেকে ২৫ ভাগ অভিভাবক এখন পর্যন্ত গত ছয় মাসের টাকা মোটেও পাননি। আবার গত কয়েকদিন থেকে শুরু হয়েছে নতুন বিড়ম্বনা। ভুলে ভরা শিওরক্যাশের তথ্য আপডেট করতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। সকাল থেকে সারাদিন বিরতিহীনভাবে শ্রম দিয়ে সেই তথ্য নির্দিষ্ট ছকে সংযোজন ও সংশোধন করতে হয় তাদের। আবার দু’এক দিন পর পর নতুন নতুন ফরম্যাটে তথ্য প্রদান যেন এক বিরক্তিকর অবস্থা। এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যের জন্য শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করলে তারা কিছুই বলতে পারেন না। এভাবে ছোটাছুটি আর হয়রানির শিকার হতে হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের।’’
বহু বছর যাবৎ শিক্ষকগণ শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বহির্ভুত অনেক কাজের সাথে জড়িত। যেমন- ভোটার তালিকা হালনাগাদ, আদমশুমারি, অর্থনীতি শুমারি, কৃষিশুমারি, মৎস্যজীবী শুমারি, বিস্কুট বিতরণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ কার্যক্রম সহ অসংখ্য কাজ তাদের করতে হয়। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় পাঠদানের কাজ।

সংশ্লিষ্টরা পাঠদান বার্হিভূত কাজের চাপ না কমিয়ে তৃনমূলে গরিব মানুষের সন্তানদের শিক্ষার আধিকার নষ্ট করে যাচ্ছে। প্রধান শিক্ষকদের একধাপ নিচের স্কেলের সহকারি শিক্ষকদের বেতন প্রদান, প্রধান শিক্ষকদের গেজেটের মর্যাদায় ১৬ হাজার টাকা বেতন স্কেলসহ জটিলতা নিরসনে দীর্ঘ ৩ বছর ঝুলিয়ে রেখে মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রাথমিকের ছুটির তালিকা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। শিশু শিক্ষার্থীরা দেশের সংগ্রামের ইতিহাস সংস্কৃতি জানবে। এতে দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা দেশত্ববোধ জাগ্রত হবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ ছুটির তালিকায় জাতীয় ও বিশেষ দিবসগুলো ছুটি দেখিয়ে শিক্ষকদের দিবস উদযাপনের নির্দেশ দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে দিবসগুলো পালন করতে বলা গভীর ষড়যন্ত্র।

প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম বিষয়টি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন নিবেদন করেও কোন ইতিবাচক ফলাফল পাইনি। শিক্ষকদের প্রত্যাশা বেশি ছুটি নয়। জাতীয় দিবসসহ বিশেষ দিবস কর্মদিন ঘোষণা করা। উক্ত ছুটি গ্রীষ্মের ছুটির সাথে সমন্বয় করে ১৫দিন ছুটি রাখা।

এতে প্রাথমিক শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারীর মত ৩ বছর পর পর শ্রান্তিবিনোদন ভাতা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত হবে। ভাবখানা এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে, প্রাথমিক শিক্ষার তেমন কোন সমস্যা নেই। সমস্যা শুধু শিক্ষকদের আন্তরিকতা। সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্টদের মোটেই দায় নাই।

বদলিসহ প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব পদায়নের কাজ নিয়ে মন্ত্রণালয়কে অধিকতর ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মকর্তাদের কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকায় শিক্ষা ও শিক্ষকদের সমস্যা নিরসনে ভাবনার সময় মাননীয় মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মাঝ থেকে অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন সাধারণ মানুষের শিক্ষা আজ মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ভাষায় আমাকে ক্ষোভের সাথে বলতে হচ্ছে রাবিশ! রাবিশ! রাবিশ! বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শ তৃনমূলে সাধারণ মানুষের শিক্ষার আধিকার নিশ্চিতকরণে চোখের রঙিন চশমা খু্লে ও কান পরিষ্কার করে মুক্তিযুদ্ধের আর্দশ ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন করুন। এ প্রত্যাশা বার বার করা দুঃখজনক।

মো. সিদ্দিকুর রহমান: আহবায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম ও দৈনিক শিক্ষার সম্পাদকীয় উপদেষ্টা।

দুর্নীতিবাজরা সাবধান হয়ে যান: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha দুর্নীতিবাজরা সাবধান হয়ে যান: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী অর্ধাক্ষর শিক্ষকরা সিকিঅক্ষর শিক্ষার্থী তৈরি করছেন: যতীন সরকার - dainik shiksha অর্ধাক্ষর শিক্ষকরা সিকিঅক্ষর শিক্ষার্থী তৈরি করছেন: যতীন সরকার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে যা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে যা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ১৮১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু - dainik shiksha ১৮১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন ২০ ফেব্রুয়ারি - dainik shiksha স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন ২০ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ - dainik shiksha প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website