বন্ধ শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল করার উপায় কী? - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

বন্ধ শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল করার উপায় কী?

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

সারা পৃথিবীর মতো করোনা অভিঘাতে আমাদের দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়িতে অবস্থান করছেন। এরকম একটি অনিশ্চিত অবস্থায় বন্দি থাকবেন এটি তাদের কেউ প্রথমদিকে ভাবতে পারেননি। এরই মধ্যে ২ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। সামনে ঈদ। ঈদের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে কিনা তা নিয়ে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা না খোলা নিয়ে একই ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে। আমাদের দেশে কেজি, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশ বড় অঙ্কের এতে প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষকের সংখ্যাও কয়েক লাখ। সুতরাং এতসব শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত রয়েছেন যেসব প্রতিষ্ঠানে, এর সঙ্গে সেগুলো সচল করা পুরোপুরি নির্ভর করছে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে হ্রাস পাওয়ার ওপর। সেই পরিস্থিতি এখনো দেশে সৃষ্টি হয়নি। কবে সৃষ্টি হবে তাও নিশ্চিত নয়। তবে ২ মাসের অধিক সময় ধরে গোটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ হয়ে আছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন এটি যেন কেউ কিছুতেই আর সহজে মেনে নিতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারছে না, শিক্ষকরাও এভাবে শিক্ষার্থীবিহীন অবস্থায় থাকতে পারছেন না। মঙ্গলবার (১৯ মে) ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়।

নিবন্ধে আরও জানা যায়, এরই মধ্যে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা বন্ধ রয়েছে। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সামনের দিকে টিকে থাকতে পারবে কিনা সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কেননা দেশে অপরিকল্পিতভাবে ব্যক্তি উদ্যোগে অসংখ্য কেজি স্কুল, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেগুলোর একটি বড় অংশ করোনা-উত্তরকালে আদৌ টিকে থাকতে পারবে কিনা সেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কেননা করোনা পরিস্থিতি আরো কয়েক মাস চলতে থাকলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বাড়ি ভাড়া, শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন সংকুলান করতে পারবে কিনা সেটি দেখার বিষয় হয়ে উঠবে। সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক শিক্ষার্থী সরে যেতে পারে। ফলে গোটা দেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিষয়টি এখন থেকেই সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের চিন্তায় থাকা প্রয়োজন। সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে উভয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অবকাঠামোগত ধারণা নতুনভাবে বিন্যস্ত করার চিন্তা-ভাবনা থাকা প্রয়োজন।

এরই মধ্যে কথা উঠেছে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পাঠ দেয়ার ও পরীক্ষা নেয়ার। করোনা ভাইরাসের দুর্যোগ এখনো সবার মনে প্রাধান্য পাওয়ায় অনলাইন শিক্ষার বিষয়টি গণমাধ্যমে খুব বেশি স্থান করে নিতে পারছে না। তবে কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন পদ্ধতিতে কিছু কিছু পাঠদান করছে বলে দাবি করছে। বাকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন মাধ্যম প্রবর্তন করার কথা বললেও তাদের প্রস্তুতি নেই এটি প্রায় নিশ্চিত। দেশের আর সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অনলাইন পদ্ধতিতে পাঠদান কিংবা পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ নেই এটি প্রায় নির্দ্বিধায় সবাই স্বীকার করে নিচ্ছেন। পৃথিবীর অনেক দেশে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে পাঠদানের ব্যবস্থা বেশ আগে থেকেই আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেইরকম কোনো ধারণা কার্যকর করার তেমন কোনো উদ্যোগ ছিল না। এর নানা ধরনের কারণও রয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই বহুধাবিভক্ত। প্রাথমিক স্তরে ১১ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর অনেকগুলোরই অনুমোদন নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাণিজ্যিক স্বার্থে কিংবা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে অনেকেই গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমনিতেই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আছে। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। খুব সীমিতসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি নিয়ে অবস্থান করলেও বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এবং পঠন-পাঠনের অভাব সবার কাছেই জানা বিষয়।

আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা এখনো যথেষ্ট মানসম্মত নয়। সেই অবস্থায় এত সব ধারার শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইন মাধ্যমে পাঠদানের সুযোগ সৃষ্টি করা মোটের ওপর অসম্ভব। আমাদের শ্রেণি পাঠগুলোই এখনো মানসম্মত পর্যায়ে উন্নীত করা যায়নি। সেক্ষেত্রে অনলাইন পদ্ধতির শিক্ষা ও পরীক্ষা চালু করা মোটেও সম্ভব নয়। আমাদের প্রায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এর জন্য প্রস্তুত নয়। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে করোনা ভাইরাসে আরো কয়েক মাস যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয় তাহলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হবে এটি প্রায় নিশ্চিত। বিশেষত আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের হতাশা ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। শিক্ষকদের মধ্যেও পেশাগত অস্তিত্বের সংকট কোনো কোনো স্তরে প্রকট হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দূরবর্তী, মধ্যবর্তী এবং নিকটবর্তী পরিকল্পনা প্রণয়নে এখনি হাত দিতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করে বাস্তবোচিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি অনলাইন পদ্ধতির বিষয়টি দূরবর্তী এবং প্রশিক্ষণনির্ভর একটি পরিকল্পনা হতে পারে। সেটি করোনা পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পর সরকার বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে দুটো পদ্ধতিতে গোটা দেশের শিক্ষার্থীর পঠন-পাঠনের অভাব কিছুটা পূরণের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে সংসদ টিভি চ্যানেলসহ দুই-তিনটি টিভি চ্যানেলকে শিক্ষা চ্যানেল হিসেবে সাময়িকভাবে ঘোষণা দিয়ে সব স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য কিছু কিছু ক্লাস প্রচার করার ব্যবস্থা করা। ক্লাসগুলো অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মাধ্যমে নেয়া গেলে গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থী হয়তো উপকৃত হতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু বাড়ির কাজ নির্ধারণ যেন পাঠ শেষে দেয়া থাকে। টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রস্তুতকরণে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র মিডিয়া সেন্টারের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অধিকারী রিসোর্স পারসনদের ব্যবহার করা যেতে পারে।

দ্বিতীয় যে কাজটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্ষদগুলোর সিদ্ধান্তক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা প্রতিটি শ্রেণি ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা অ্যাপস তৈরির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। দেশে মানসম্মতভাবে শ্রেণিভিত্তিক প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা অ্যাপস তৈরি করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর ব্যবহার, কার্যকারিতা ও শিখনফল ইতিবাচকভাবে পড়তে পারে। ব্যাপকসংখ্যক যোগ্য শিক্ষককে শিক্ষা অ্যাপস তৈরিতে যুক্ত করা গেলে যেসব মানসম্মত অ্যাপস পাওয়া যাবে সেগুলোর গোটা দেশের শিক্ষার্থীর পঠন-পাঠনে সংযুক্ত করা যেতে পারে। এর ফলে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষা অ্যাপস চালু করা গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পঠন-পাঠনে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। অ্যাপসের সুবিধার জন্য সব শিক্ষার্থীর কাছে ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তি সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সহযোগিতা ও ইতিবাচক মনোভাব কার্যকর থাকতে হবে। পরীক্ষা পদ্ধতির বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল করণীয় নির্ধারণ করবেন। এর আগে পঠন-পাঠনের উদ্যোগটি যত দ্রæত টিভি ও অ্যাপসের মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে ততই মঙ্গল। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে একটি অস্বস্তি রয়েছে। তবে করোনা সংক্রমণটি বিশেষজ্ঞ দ্বারা নির্ধারিত হলে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে শহরগুলোর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। সবকিছু নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর। দুই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এখন করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের - dainik shiksha জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি - dainik shiksha জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website