বাংলা শিখছে জাপানের নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা - বিবিধ - দৈনিকশিক্ষা

বাংলা শিখছে জাপানের নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

হাগিওয়ারা আইয়াকা ও রিমি ওকুয়ামা। দু'জনই জাপানের নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী। আইয়াকা পড়েন চতুর্থ বর্ষে, রিমি দ্বিতীয় বর্ষে। তাদের কাছে প্রশ্ন ছিল- আরও অনেক জনপ্রিয় ভাষার কোর্স ছেড়ে কেন বাংলা বেছে নিলেন? সোজাসাপ্টা উত্তরে তারা বললেন, বাংলা অক্ষরের গঠনাকৃতি প্রথমেই দৃষ্টি কাড়ে। অক্ষরগুলো দেখতে আসলেই চমৎকার। এ কারণেই ভাষাটি শেখার সিদ্ধান্ত নেয়া। শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন সোহেল রানা।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, আইয়াকা ও রিমি জানালেন, বাংলা শেখা ও পড়া শুরুর পর ভাষাটির প্রতি তাদের ভালোবাসা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বাংলা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও প্রাণবন্ত ভাষা। তারা আরও জানান, বাংলা শেখার মধ্য দিয়ে শুধু বাংলাদেশকেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমাজ, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ও জানার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। কারণ এ ভাষার জন্যই ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের রক্ত দিয়েছে দামাল ছেলেরা। ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার ইতিহাস শুধু বাঙালি জাতিরই রয়েছে।

শুধু আইয়াকা-রিমিই নন; গৌরবময় বাংলা শিখছেন নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অনেক শিক্ষার্থী। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ছাড়াও দেশের ইতিহাস জাপান তথা বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কোর্সটি চালু করেছেন বাংলাদেশেরই সন্তান ড. মোহাম্মদ শাহ আলম। তিনি ছিলেন নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। লেখাপড়া শেষে সেখানে শিক্ষকতা শুরু করেন। তার নিরলস চেষ্টায় অন্যান্য ভাষা কোর্সের সঙ্গে বাংলাও যুক্ত হয়। এটি ছিল বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের জন্য অনন্য অর্জন। রক্ত দিয়ে বাঙালি রক্ষা করেছে যে ভাষা, সেই ভাষা আজ বিদেশে উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠে শিখছেন শিক্ষার্থীরা; জানছেন বাংলাদেশকে।

বাংলা ভাষা কোর্সের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন কোবায়আশি হারুকা। তিনি অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়েন। হারুকা বলেন, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষক শাহ আলমের সঙ্গে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখা বাংলার প্রয়োগও করেছি। তিনি বলেন, বাংলা খুব পছন্দ করি। বিশ্বের মাঝে এমন শ্রদ্ধাবোধমূলক ভাষা আর নেই। বাংলা নিয়ে রিমি ওকুয়ামার ইচ্ছাটা আরও এক ধাপ এগিয়ে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গিয়ে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার করে দেশটির সমাজ, মানুষের জীবনযাপনের ধরনসহ নানা বিষয়ে আরও জানতে চাই।

রুকা কুরাহাশির ভাষায়, বাংলার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার কোর্স শুরুর কারণে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এ সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তার আশা, ভবিষ্যতে বাংলা জাপানের গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে, যা দু'দেশের সম্পর্কোন্নয়নে মাইলফলক হবে।

বাংলার শিক্ষক ড. শাহ আলমের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দির উজিয়ারায়। তার বাবা প্রয়াত মোহাম্মদ এলাহি বক্স প্রধান ও মা জয় বাহার প্রধান। প্রাথমিক পর্যন্ত পড়েছেন দাউদকান্দিতে। এর পর চলে যান নরসিংদীর পলাশে। সেখানকার স্কুল ও কলেজে লেখাপড়া শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য যান জাপানে।

নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার কোর্স চালু ও বাংলাদেশের শিক্ষার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে ড. শাহ আলম সম্প্রতি কথা বলেন। তিনি জানান, একমাত্র বাঙালি জাতিই মাতৃভাষা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছে। এ ভাষার ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ- বিশ্বের অনেকেই তা হয়তো জানেন না। তার মতে, একটি দেশ-জাতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার অনেক উপায় রয়েছে। তবে সেই দেশের ভাষা জানা থাকলে বিষয়গুলো দ্রুত বোঝা যায়।

ড. শাহ আলম বলেন, কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা নানাভাবে বাংলা ভাষার প্রয়োগ করবে। বাংলায় তারা নানা কিছু লিখবে। এর মধ্য দিয়ে তারা মূলত বাংলাদেশকেই তুলে ধরবে। এভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে বাংলা, বাংলাদেশ ও তার ইতিহাস। নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সিনিয়র লেকচারার বলেন, কোর্সের আওতায় শুধু বাংলা ভাষাই শেখানো হয় না। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ সর্বোপরি দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্য, সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ও তুলে ধরা হয়।

নিহন বিশ্ববিদ্যালয় জাপানের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে ভর্তির স্মৃতিচারণ করেন ড. শাহ আলম। তিনি বলেন, অনার্সে ভর্তির জন্য মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় এক শিক্ষক বলেছিলেন- তুমি সম্ভবত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ছাত্র হতে যাচ্ছ। পরে এখান থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষকের সহকারী হিসেবে যোগ দিই। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে লেকচারার পদে পদোন্নতি হয়। দুই বছর পর আরও একটি পদোন্নতি পেয়ে এখন সিনিয়র লেকচারার।

বাংলা ভাষার কোর্স চালুর বিষয়টি কীভাবে মাথায় এলো- এমন প্রশ্নে ড. শাহ আলম বলেন, এখানে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, মালয়, ইন্দোনেশিয়ান, মঙ্গোলিয়ান, রুশ, আরবিসহ বেশকিছু ভাষার ওপর কোর্স চালু রয়েছে। হঠাৎ একদিন মনে হলো, যদি বাংলা ভাষাটাও থাকত! শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনুষদে বাংলা ভাষার কোর্স যুক্ত করার জন্য চেষ্টা শুরু করি। অবশেষে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে সফলতা আসে। স্পেশাল ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স হিসেবে বাংলার কোর্স চালু হয়। বেসরকারিভাবে এটাই প্রথম জাপানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স হিসেবে স্থান পায় বাংলা ভাষা।

জাপানে সরকারিভাবে বাংলা ভাষা শেখার কোনো সুযোগ আছে কি-না জানতে চাইলে ড. শাহ আলম বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে 'টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ'-এ বাংলা ভাষা কোর্স চালু রয়েছে। সেখানে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স পদ্ধতিতেই বাংলা শেখানো হয়। তিনি বলেন, নিহন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা কোর্সটি চালুর ফলে বাংলাদেশ-ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

দীর্ঘ চেষ্টার পর নিজের ক্যাম্পাসে বাংলা ভাষার কোর্স চালু হওয়ায় উৎফুল্ল ড. শাহ আলম। তিনি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর বেশকিছু শিক্ষার্থী বাংলা ভাষার কোর্স সম্পন্ন করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় ফিল্ডওয়ার্কে যাচ্ছে। এটি দেশগুলোর জন্য খুবই ইতিবাচক।

বাংলাদেশের শিক্ষার মানোন্নয়নে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরেন ড. শাহ আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের সহযোগিতা পেলে 'লাইসেন্স এক্সামিনেশন সিস্টেম ইন বাংলা' ও 'এক্সচেঞ্জ এডুকেশন' সিস্টেম চালু করতে চাই। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নেও কাজ করতে চাই। তার মতে, বিশ্বের সব দেশেই শিক্ষার মান দিন দিন উন্নত হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের শিক্ষার ব্যবহার বা মানের ক্ষেত্রে আরও দৃষ্টি দিতে হবে।

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website