বাজেটে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার চ্যালেঞ্জ - মতামত - Dainikshiksha

বাজেটে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার চ্যালেঞ্জ

সিদ্দিকুর রহমান |

বাংলাদেশের তৃণমূল গরিব মানুষের সন্তানদের শিক্ষালাভের একমাত্র আশ্রয়স্থল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধু ও তারঁই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গরিব মানুষদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেন। বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানা উদ্যোগের জন্য বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এবারও ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতার পর যে দেশ তলাবিহীন ঝুড়ি বলে বিশ্ব ব্যঙ্গ করত, সে দেশের বিশাল বাজেট। অথচ বিশ্বে দেশসমূহের মধ্যে শিক্ষাখাতে আমাদের বাজেটের বরাদ্দের অপ্রতুলতা শিক্ষাবান্ধব সরকারের খ্যাতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাড়িয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে ৫৩ হাজার ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে ২২ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এ বরাদ্দের মধ্যে বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ১ হাজার বিদ্যালয় স্থাপন, উপবৃত্তি, পাঠ্যপুস্তক শিক্ষা, উপকরণ বিতরণ, স্কুল ডিডিং কার্যক্রম, ছেলে মেয়েদের জন্য পৃথক ওয়াশব্লক, ৬৫ হাজার শ্রেণিকক্ষ, ১০ হাজার ৫০০ শিক্ষক কক্ষ, ৫ হাজার বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও ৩০ হাজার খেলার সামগ্রী বিতরণ করার কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। যে সব চ্যালেঞ্জগুলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে অন্তরায় সেগুলার বিষয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে বাজেটে উল্লেখ করেননি।

বর্তমান সরকারের বিনামূল্যে বই বিতরণের বিশাল অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে নোট গাইড ও কোচিং বাণিজ্য। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট এ অপবাণিজ্য প্রসারের অন্যতম কারণ। শিক্ষক সংকটকে শূন্যের কোঠায় রাখার কোন প্রতিশ্রুতি  ও বরাদ্দ প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। শিক্ষকদের পাঠদান বর্হিভূত কাজ থেকে অব্যহতিদানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর জরুরি প্রয়োজন। ৫ম শ্রেণির পরীক্ষা বিশাল কর্মযজ্ঞ উপজেলা শিক্ষা অফিসে অতিরিক্ত লোক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষকেরা পাঠদান ব্যাহত করে সমাপনী পরীক্ষা কর্মযজ্ঞে সময় দিচ্ছেন। এতে গরিব মানুষের সন্তানরা শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত হয়। জনসাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান নিয়ে নানা অপবাদ দেয়। গরিব মানুষেরও তাদের সন্তানদের শিক্ষাদানের বিষয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

প্রাথমিকে ৩ টা পরীক্ষা ছাড়াও মডেল টেস্ট নামে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জায়েজ করে দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও কমপক্ষে ২০০ টাকা ফিস দিয়ে গরিব মানুষের সন্তানদের পরীক্ষা দিতে হয়। পাশাপাশি বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা নোট, গাইড কোচিং বাণিজ্য থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। প্রতিটি উপজেলায় বছরে কমপক্ষে ২-৩ লাখ টাকা পরীক্ষা বাবদ উদ্বৃত্ত থাকে। কর্তৃপক্ষ নানাভাবে ভাউচার দেখিয়ে উক্ত টাকা নিঃশেষ করে দিচ্ছে। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি জেনেও নিরবতা পালন করছেন। এ নিরবতা কেন? এ মনে হয় নোট , গাইড, কোচিং বাণিজ্য ও পরীক্ষার উদ্বৃত্ত টাকার সাথে তাদের রয়েছে গভীর মিতালী।

প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের ১১ তম গ্রেড নিয়ে তাদের যৌক্তিক দাবি, মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী সকলে নানা সময় বৈঠকে বিষয়টি সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত রাখেন অথচ প্রাথমিকের সহকারীদের বেতন বৈষম্য সৃষ্টি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে হিংসা, বিবেধ সৃষ্টি করে রেখেছেন। এতে প্রধান শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজ বিঘ্ন হচ্ছে। মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় প্রাথমিকের সহকারীদের নেতাদের জুস খাইয়ে বেহুঁশ করে সময়ক্ষেপণ করে চলেছেন। নেতাদের বেহুঁশ হওয়া ও সময়ক্ষেপণ নিয়ে সকলের প্রতি আমার বক্তব্য গানের কলি দিয়ে উপস্থাপন করছি: “এ দিন দিন নয় আরো দিন আছে”

প্রাথমিক শিক্ষক সমাজ বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করছেন, সময়ক্ষেপণ না করে প্রাথমিকে সকল বৈষম্যের অবসানের জন্য এবারের বাজেটের বরাদ্দ অর্ন্তভুক্তির জন্য শিক্ষাবন্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি। সারা বিশ্বে সকলের কর্ম ৮ ঘন্টা অথচ সারা বিশ্বের মে দিবসের অঙ্গীকারকে উপেক্ষা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরীদেরও ২৪ ঘণ্টা ডিউটিতে নিয়োজিত রাখা হচ্ছে। অপরদিকে তাদের চাকরি হলো ছুটিবিহীন। প্রাথমিকে শিক্ষকেরা সরকারি, অথচ একই ভবনের দপ্তরি কাম প্রহরীরা অনেকটা প্রাচীনকালের ক্রীতদাসর সমতুল্য। স্বাধীন ও সভ্যদেশে বিষয়টি অনেকটা স্পর্শকাতর ও হৃদয়বিদারক। প্রাথমিকের দপ্তরি কাম প্রহরীদের চাকরি জাতীয়করণ মানবিক ও যৌক্তিক দাবি।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার জন্য বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন। কিন্তু শিক্ষায় বিনিয়োগে ঘাটতি উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। আগামী প্রজম্মও দেশের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষার বিনিয়োগ। মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার প্রসারের বিকল্প নেই।

একটি দেশের শিক্ষাখাতে মোট জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। অথচ বাংলাদেশ জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশেরও বাজেটের ১২ শতংশের কম বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ বাজেটে অন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলছে। অথচ আমাদের শিক্ষা বাজেটের প্রতি তেমন গুরুত্ব না দিয়ে দেশের অগ্রগতির মূলে অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে। মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষক গড়ার লক্ষ্যে স্বাধীনতার চার দশক পর বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে।   

অথচ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে জাতীয় শিক্ষানীতির অন্যতম অঙ্গীকার প্রাথমিকে শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত করার উদ্যোগ। এতে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের সন্তানরা বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ পেত। সরকার এ অঙ্গীকার ও বাজেটে বরাদ্দ না রেখে পিছু হটছেন। শিক্ষায় বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় এহেন মনোভাব মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা নিরসনে বাজেটে বরাদ্দ আজকের প্রত্যাশা।   


 মো. সিদ্দিকুর রহমান:  আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম ও দৈনিক শিক্ষার সম্পাদকীয় উপদেষ্টা

স্কুল-কলেজে চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর - dainik shiksha স্কুল-কলেজে চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি - dainik shiksha এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি চতুর্দশ শিক্ষক নিবন্ধনের মৌখিক পরীক্ষা ২৪ জুন - dainik shiksha চতুর্দশ শিক্ষক নিবন্ধনের মৌখিক পরীক্ষা ২৪ জুন নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তথ্য চেয়ে গণবিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তথ্য চেয়ে গণবিজ্ঞপ্তি দাখিল-২০২০ পরীক্ষার মানবণ্টন প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল-২০২০ পরীক্ষার মানবণ্টন প্রকাশ ইবতেদায়ি সমাপনীর মানবণ্টন প্রকাশ - dainik shiksha ইবতেদায়ি সমাপনীর মানবণ্টন প্রকাশ জেএসসির চূড়ান্ত সিলেবাস ও মানবণ্টন প্রকাশ - dainik shiksha জেএসসির চূড়ান্ত সিলেবাস ও মানবণ্টন প্রকাশ জেএসসির বাংলা নমুনা প্রশ্ন প্রকাশ - dainik shiksha জেএসসির বাংলা নমুনা প্রশ্ন প্রকাশ একাদশে ভর্তির আবেদন ও ফল প্রকাশের সময়সূচি - dainik shiksha একাদশে ভর্তির আবেদন ও ফল প্রকাশের সময়সূচি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website