বোনাস চাই ষোলো আনা - মতামত - Dainikshiksha

বোনাস চাই ষোলো আনা

মুজম্মিল আলী |

আজকের লেখার শিরোনামের বিষয়ে একটু পরে আলোকপাত করা যাক। এর আগে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের উচ্চতর বেতন গ্রেড ও বদলির বিষয়ে কিছু কথা বলে নিতে চাই। গত সপ্তাহে উচ্চতর বেতন গ্রেড নিয়ে আমার একটি লেখা দৈনিক শিক্ষায় প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটির শিরোনাম  ছিল- 'উচ্চতর গ্রেড ও আমার দু’টো কথা'। 

লেখাটি পড়ে অনেকে উচ্ছ্বাসিত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ বিরক্তও হয়েছেন। জনৈক পাঠক দৈনিক শিক্ষার ফেসবুক পেজে আমাকে উদ্দেশ করে তার কমেন্টে লিখেছেন-'তোমাকে এ নিয়ে দু’টো কথা বলতে কে বলেছে? দু’টো কথা বলতে গিয়ে তুমি তো কিছুই বলতে পারোনি। রাখো তোমার আজেবাজে লেখা'।
 
আমি তাৎক্ষণিক তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি এবং টাইমলাইনে লিখে দিয়েছি- 'নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো'। ভদ্রলোকের ক্ষোভের কারণ আমি বুঝতে পেরেছি। তার ক্ষোভ এই জন্য যে, আট বছরের পরিবর্তে ১০ বছর অর্থাৎ আগের চেয়ে আরো দু' বছর পরে একটা উচ্চতর গ্রেড এবং একটা পর্যায়ে অনেকে দ্বিতীয় গ্রেডে ২২ হাজার টাকার স্কেল থেকে মাত্র ২৩ হাজার টাকা স্কেল প্রাপ্য হবেন। এই দু'টো স্কেলের তফাত একেবারে যৎসামান্য। তাই তিনি উচ্চতর গ্রেডে বেতন উন্নীত হবার মাঝে নতুন কিছু খুঁজে পাননি।
 
অন্যদিন, আরেক সুহৃদ পাঠক যে ভাষায় গালাগাল করেছিলেন সেটি আজ না হয় না ই বললাম। অনেকের মনে হয়তো কষ্ট আসবে। আমার কিন্তু কোনো কষ্ট লাগেনি। আমার কাছে মাঝে মাঝে এ জাতীয় মন্তব্যগুলো প্রেরণাদায়কই মনে হয়। এসব তীর্যক মন্তব্য আমাকে লেখালেখি করতে উৎসাহিত করে। দৈনিক শিক্ষার লাখ লাখ পাঠকের মধ্যে এক-দু' জনে গালাগাল দিলেও অন্যদের ভালোবাসার কারণে এসব তেমন গায়ে লাগে না।
 
এসব কথা থাক এখন। আসল বিষয়ে যাবার আগে উচ্চতর গ্রেড ও বদলি নিয়ে দু'টো কথা বলে নেই। আসলে ইদানিং বেসরকারি শিক্ষা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাগ্যাকাশে একটি সুবাতাস বইতে শুরু করেছে বলে মনে হয়। এই তো মাত্র ক'দিন আগে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীগণ পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হাতে পেয়েছেন। সাথে কিছু বকেয়ার টাকাও। আর ক'দিন পর প্রথমবারের মতো বৈশাখী ভাতা পেতে যাচ্ছেন। বৈশাখী ভাতার জন্য তাদের কতই না লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। এবার এটি এখন হাতের নাগালে। তবে বৈশাখী ভাতা যাতে আগে শিক্ষক-কর্মচারীগণের হাতে পৌঁছে সে বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। 

অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বলি- প্রথম যখন বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীগণ ইদ বোনাস প্রাপ্য হন তখন কিন্তু ইদের পরে টাকাটা তাদের হাতে আসত। বেশ কয়েক ইদে সে রকমই হয়েছে। সে কারণে বলি, বৈশাখী ভাতার টাকা যেন সময় মতো তারা হাতে পান। আসল বাঙালিয়ানার স্বাদ এবারের ১ বৈশাখে তারা প্রথম উপভোগ করবেন। অধিকার আদায়ে এ তাদের এক বড় অর্জন। বিরাট এক সাফল্য। ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা ২০১৫ থেকে তাদের প্রাপ্য হলেও ২০১৯ এ এসে তারা পেয়েছেন। অধিকার আদায়ে আপোষহীন মনোভাব ও নিরলস প্রচেষ্টায় তারা এ দু'টো ন্যায্য অধিকার অর্জন করতে পেরেছেন। এ রকম ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় একসাথে জাতীয়করণের সুফল পেতে শিক্ষক নেতাদের উদ্যোগী ও উদ্যমী-দু'টোই হতে হবে।

এখন শিক্ষক নিয়োগের বন্ধ্যাত্বটাও কেটেছে। অতি সম্প্রতি একটা বড় ধরনের নিয়োগ দেবার কারণে শিক্ষক স্বল্পতা বহুলাংশে কমে এসেছে। এনটিআরসিএ চলতি বছর আরো দু' তিন দফা নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। পিয়ন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের সব নিয়োগ তাদের হাতে নিয়ে নেবার চিন্তা করছে। এসব নিঃসন্দেহে শুভ লক্ষণ। বেসরকারি শিক্ষায় সরকারের সাম্প্রতিক কর্মতৎপরতা সকলকে আশান্বিত করে তুলেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সরকারের এসব কার্যক্রমকে সব স্কুল-কলেজ একত্রে জাতীয়করণের পথে এগিয়ে যাবার আলামত বলেই মনে করি। জাতীয়করণ ত্বরান্বিত হলে এর সুফল কেবল শিক্ষক সমাজ নয় সারা দেশের মানুষ পেতে থাকবেন। 

তারপরও কথা থেকে যায়। কথার পেছনে কথা। ১০ বছরের পরিবর্তে আট বছরের মাথায় প্রথম উচ্চতর গ্রেডটি দেয়া হলে আপত্তির কিছু থাকত না। দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডটি ১৫-১৬ বছরের মাথায় দিলেও তেমন কিছু আসে যায় না। ২২ হাজার টাকা স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর ধাপ ২৩ হাজার টাকা একেবারে নগন্য মনে হয়। তাই ২২ হাজার টাকা স্কেলে কর্মরত শিক্ষকগণ দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের জন্য ২৩ হাজার টাকা তেমন পছন্দ করছেন না। তারা মনে করেন এক্ষেত্রে দ্বিতীয় গ্রেডের জন্য ২৯ হাজার টাকা স্কেল নির্ধারিত হওয়াই সমীচীন হয়।

এছাড়া প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানগণের বেলায় উচ্চতর গ্রেড প্রযোজ্য না হলে বেতন বৈষম্য দেখা দেবে। অনেক সময় প্রধানের চেয়ে অধস্তনের বেতন বেশি হবে। তাতে চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।

এবার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি বিষয়ে সামান্য একটু আলোকপাত করে মূল বিষয়ে চলে যাব। বদলির জন্য একটি নীতিমালা হচ্ছে বলে আমরা সকলে জেনেছি। এটি একটি পুরনো দাবি। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বদলি নীতিমালাটি যেন শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণে আসে সেটি আমরা চাই। প্রয়োজনে দূর-দূরান্তের শিক্ষক-কর্মচারী যাতে বদলি হয়ে নিজের জেলা, থানা কিংবা এলাকায় যেতে পারেন সে সুযোগটা অবারিত করা দরকার। এনটিআরসিএ কিংবা মাউশির হাতে বদলির বিষয়টি ন্যস্ত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটি ও গভার্নিং বডির হাত থাকলে শিক্ষক-কর্মচারীগণ বদলির কোনো সুফল পাবেন বলে মনে হয় না। এদের যাঁতাকলে পড়ে অনেকের বদলির স্বপ্নটি দুঃস্বপ্ন থেকে যাবে। নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ শিক্ষক বাছাই করে আর এমপিও দেয় মাউশি। সেক্ষেত্রে নিয়োগ ও বদলির সব ক্ষমতা এনটিআরসিএ কিংবা মাউশির হাতে ন্যস্ত করা সময়োপযোগী কাজ হবে। ডিজিটালাইজেশনের এ যুগে ম্যানেজিং কমিটি ও গভানিং বডির আসলে কোনো দরকার পড়ে না। অনেক জায়গায় এরা অযথা ঝামেলা সৃষ্টি করে। শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর মাতব্বরি জাহির করতে চায়। তাই একাডেমিক কাউন্সিলের আদলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি ছোট্ট কমিটি রেখে ম্যানেজিং কমিটি ও গভার্নিং বডি একেবারে বিলুপ্ত করা প্রয়োজন।                       

যে শিরোনাম দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করেছিলাম এবার সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করে লেখাটি শেষ করতে চাই। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীগণ এক সময় কোনো বোনাস পেতেন না। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করে অবশেষে তারা ইদ বোনাস প্রাপ্য হন। আজ কয়েক বছর ধরে তারা সেটি পেয়ে আসছেন। শিক্ষকরা বেতন স্কেলের ২৫% এবং কর্মচারীগণ ৫০% বোনাস পেয়ে থাকেন। বোনাসের যে টাকা তারা পান তা দিয়ে তাদের উৎসবের খরচ চলা তো দূরের কথা সিকি ভাগ ব্যয়ও নির্বাহ হয় না। বছরে পাঁচটি কিংবা ১০টি ইদ নয়। দু'টো মাত্র ইদ। এ দু'টো ইদ যদি পরিবার-পরিজন নিয়ে আমোদে উৎসবে কাটানো না যায় তবে এর চেয়ে বড় দুঃখ কিংবা কষ্ট আর কী হতে পারে? সে কষ্টটাই দেশের পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী আজ ক' বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। 

ইদ উৎসব অনাবিল খুশির। কোনো কারণে সেটি যদি দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তবে তা দুর্ভাগ্য ছাড়া কিছু নয়। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেলায় তা-ই হয়ে আসছে। এর অবসান হওয়া চাই। গত ক'টি বছর পহেলা বৈশাখ নিয়ে তাদের অনেক কষ্ট ছিল। সে কষ্টের আপাত অবসান হয়েছে। এখন ইদের কষ্টটা দূর হওয়া চাই। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীগণ কত টাকা বোনাস পান সে খবরটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানেন কিনা কে জানে? জানা না থাকলে যে করে হোক তাকে সে কথাটি জানাতে হবে। শিক্ষক নেতাদের সম্মিলিতভাবে সে উদ্যোগটি নেয়া দরকার। দ্রব্য মূল্যের দুর্দিনের সময়ে সিকি আনা বোনাসে চলে না। ষোলো আনা বোনাস এখন সময়ের দাবি। এ দাবিটি যত তাড়াতাড়ি মানা যাবে ততই সুনাম হবে। প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে পারলে একটা কিছু আশা করা যায়। পাঁচ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী সে আশায়ই পথ চেয়ে বসে আছেন।                                 

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট এবং দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র - dainik shiksha তিন শর্তে অস্থায়ী এমপিও পাচ্ছে ১৭৬৩ প্রতিষ্ঠান, আলাদা পরিপত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি করতে হবে চর এলাকায়, আসছে চর ভাতা ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট - dainik shiksha ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত ২২ আগস্ট বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে - dainik shiksha বিএড ৩য়-৫ম সেমিস্টারের ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ২৫ আগস্ট থেকে সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha সাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তির আবেদন শুরু ১০ সেপ্টেম্বর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর - dainik shiksha এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ঢাবিতে ১ম বর্ষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website