ব্যয় বাড়ছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে - ইংলিশ মিডিয়াম - Dainikshiksha

ব্যয় বাড়ছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে

শরীফুল আলম সুমন ও ফারজানা লাবনী    |

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম বা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিসহ সব ধরনের ফির ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয় চলতি অর্থবছরে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কঠোর আন্দোলনের মুখে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সেই ভ্যাট স্থগিত করা হলেও থেকে যায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। এমনিতেই বছর বছর ফি বাড়ায় অসহায় হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো ভ্যাট আরো বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

অন্য কোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভ্যাট না থাকায় আশা ছিল, আগামী অর্থবছরে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ওপর থেকেও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তা রয়েই গেল। উপরন্তু আমদানি করা সব শিক্ষা উপকরণের ওপর শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলসহ বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখায় খরচ বাড়বে শিক্ষার্থীদের।

জানা যায়, নামিদামি স্কুলে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় একাধিক সহায়ক বই। সেসব বইয়ের মধ্যে বেশ কিছু বিদেশ থেকে আমদানি করা। আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রায় সব শিক্ষা উপকরণই আমদানি করা। সব বই আসে দেশের বাইরে থেকে। প্রতিটি কিন্ডারগার্টেনেও বেশির ভাগ ক্লাসেই বিদেশের কোনো না কোনো বই থাকে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত পেনসিল, রাবার, শার্পনার, রং পেনসিল, খাতাসহ বিভিন্ন উপকরণও আমদানি করা। এসব উপকরণের ওপর শুল্ক বাড়ানোয় পড়ালেখার খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের আমদানি করা বইয়ের ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে  বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। শিশুদের ছবি আঁকার আমদানি করা বইয়ে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে আমদানি করা বইয়ে ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে যেকোনো মাধ্যমে আমদানি করা বই কিনলেই অভিভাবকদের বাড়তি অর্থ গুনতে হবে।

কয়েকজন অভিভাবক জানান, বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এখন আর কেবল উচ্চবিত্তের জন্য নয়। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত পরিবারের। ফলে ভ্যাটের বোঝা একজন অভিভাবকের জন্য বড় ধরনের চাপ। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভ্যাট বহাল রেখে সরকার দ্বৈতনীতি চালু করেছে।

জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট দিয়ে আসছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু চলতি অর্থবছরে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়। একই হারে ভ্যাট আরোপ করা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপরও। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর তাদের ওপর থেকে সেই ভ্যাট প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ভ্যাট রয়েই যায়। আগামী অর্থবছরেও এই ভ্যাট বহাল থাকছে।

তবে সানিডেল ও সানবিম স্কুলের দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকের করা রিটের শুনানি শেষে গত ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের টিউশন ফির ওপর আরোপিত ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে। এই সুযোগে দুই মাস ভ্যাট দিতে হয়নি অভিভাবকদের। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত করেন। ফলে স্কুলগুলো গত অক্টোবর মাস পর্যন্ত ভ্যাট আদায় বন্ধ রাখলেও নভেম্বর মাসেই তা আবারও চালু করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীসহ বিভাগীয় বা জেলা শহরের কিছু স্কুল আছে, যেখানে পড়ালেখার মান ভালো হলেও অধিকাংশ স্কুলেই এখনো মানসম্পন্ন পড়ালেখার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানকে একটু ভালো মানের শিক্ষা দিতে কিন্ডারগার্টেন বা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ালেখা করান। এসব অভিভাবকের সবাই যে ধনী তা নয়। জীবনযাত্রার অনেক খরচ বাঁচিয়ে বাচ্চাদের এসব স্কুলে পড়াচ্ছেন তাঁরা। এসব স্কুলে এত বেশি হারে রাজস্ব আরোপ কোনোমতেই যুক্তিসংগত নয়।’

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অভিভাবকদের একটি সংগঠনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট আমিনা রত্না বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা বয়সে ছোট। তাদের পক্ষে রাস্তায় নেমে গাড়ি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই তাদের ব্যাপারে কোনো খেয়াল নেই সরকারের। এখন তো মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়েরাই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। অনেক কষ্ট করে অভিভাবকরা স্কুলের বেতন দেন। এরপর ভ্যাট নতুন বোঝা সৃষ্টি করছে। এখন যদি আমদানি করা শিক্ষা উপকরণে শুল্ক বাড়ানো হয়, তাহলে অনেক অভিভাবককেই বাচ্চাদের স্কুল থেকে নিয়ে আসতে হবে।’

জানা যায়, অনেক স্কুল বই-খাতাসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ নিজেরাই শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করে থাকে। আবার অনেক স্কুলে নির্ধারিত স্টল থেকে অভিভাবকদের শিক্ষা উপকরণ কিনতে হয়। ফলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভ্যাট ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা। দেশে শিক্ষা বোর্ডের তালিকাভুক্ত ১৫৯টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে। এ ছাড়া প্রায় ৮০ হাজার কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি স্কুল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কোনো না কোনো বিদেশি শিক্ষা উপকরণ ব্যবহৃত হয়। জুলাই থেকে ওই সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের খরচ বাড়ছে।

নাম প্রকাশ না করে ম্যাপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। মাসে বেতন দিতে হয় চার হাজার ৫০১ টাকা। আর এর সঙ্গে প্রতি মাসেই যোগ হয় ৩৩৯ টাকার ভ্যাট। এর পরও যদি বই-খাতার দাম বাড়ে, তাহলে সত্যি বোঝার ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ সানিডেল স্কুলের আরেক অভিভাবক বলেন, ‘আমার দুই বাচ্চার ভ্যাট বাবদ প্রতি মাসে প্রায় দেড় হাজার টাকা বেশি দিতে হয়। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সরকার এই ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পড়ালেখাকে মূলত নিরুৎসাহ করছে।’

কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের একাংশের সংগঠন বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মিজানুর রহমান বলেন, ‘কিন্ডারগার্টেনে পড়ালেখা ভালো বলে শুধু মধ্যবিত্তই নয়, নিম্ন মধ্যবিত্তরাও আমাদের প্রতিষ্ঠানে বাচ্চাদের পড়ায়। আমাদের অনেক বই আছে ভারতের। রং পেনসিলসহ অন্য উপকরণগুলোও বিদেশি। এগুলোর দাম বাড়লে অভিভাবকদের ওপর চাপ পড়বে। কারণ তাঁদেরই বাড়তি টাকা দিয়ে কিনতে হবে। আমরা অবশ্যই জোর দাবি জানাচ্ছি, শিক্ষা উপকরণের ওপর যেন আগের আমদানি শুল্কই বহাল রাখা হয়।’

ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত - dainik shiksha ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website