please click here to view dainikshiksha website

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবরুদ্ধ ভিসি পালালেন

নিজস্ব প্রতিবেদক | আগস্ট ৩, ২০১৭ - ১:১০ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদ ও তিন দফা দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে আরও দুই দফা দাবি যোগ করে শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে তিন দিন ধরে তারা রাজধানীর মহাখালীতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও রেজিস্ট্রারকে অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পেছনের দরজা দিয়ে এক প্রকার পালিয়ে যান ভিসি। এর আগে রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতাহাতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সন্ধ্যার দিকে রেজিস্ট্রারকে বাদ দিয়ে শুধু ভিসিকে অবরুদ্ধ করলে রেজিস্ট্রার ওই সময় বেরিয়ে যান। আইন বিভাগের প্রভাষক ফারহান উদ্দিন আহমেদকে জোরপূর্বক চাকরিচ্যুত করায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে আগে থেকে জিইয়ে থাকা নানা অসন্তোষ যুক্ত হয়েছে। যে কারণে আইন বিভাগের পাশাপাশি অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ও দুই নম্বর ভবনের সামনের গেট বন্ধ করে রেখে বিক্ষোভ প্রকাশ করছে শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল। এর মধ্যে আছে ‘ফারহান স্যারের পুনর্বহাল চাই’, ‘রেজিস্ট্রারকে বরখাস্ত করতে হবে।’ এ সময় শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা রোববার থেকে আন্দোলন করে আসছে। আন্দোলন বন্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করছে। এ সময় এক ছাত্র বলেন, ‘সামনে আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা। কর্তৃপক্ষ মনে করছে, আন্দোলন বিলম্বিত হলে আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। কেননা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তাই এবার একটা বিহিত করে ছাড়ব।’ ইশতিয়াক আহমেদ নামের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘এটি শুধু আইন বিভাগের ইস্যু নয়। একজন শিক্ষককে যেভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, যে প্রক্রিয়ায় ছাঁটাই করতে চেয়েছিল প্রশাসন তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। এজন্যই আমরা মাঠে নেমেছি।’
নাম প্রকাশ না করে আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘সেমিস্টারের টাকা বাকি থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন একজন শিক্ষার্থীকে ক্লাসরুম থেকে বের করে দেয়, তখন ওই শিক্ষার্থীর মনের অবস্থা তারা বোঝার চেষ্টা করে না। এভাবে চলতে চলতেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফারহান স্যারের এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের স্বৈরাচারী আচরণের নিন্দা জানাতেই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি।’


শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলাকালে বেলা পৌনে ১টার দিকে হঠাৎ খবর রটে যে, রেজিস্ট্রার সহুল আফজাল নিজের দফতর থেকে বের হয়েছেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ১ ও ২ নম্বর ভবনের সামনে থেকে দৌড়ে চলে যান পাশের সিদ্দিক টাওয়ারের রেজিস্ট্রার ভবনে। রেজিস্ট্রার ভেবে তারা এক কর্মকর্তাকে ঘিরে ধরেন। সেখানে তখন ছুটে যান লাঞ্ছিত শিক্ষক ফারহান উদ্দিন। তিনি ছাত্রছাত্রীদের নিবৃত্ত করার পাশাপাশি বলেন, ‘কারও গায়ে হাত তুলতে পারি না আমরা।’

তখন তিনি ওই কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফের আগের অবস্থানে যান। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে লাঞ্ছিত শিক্ষক ফারহান উদ্দিন বলেন, ‘অন্যায়ভাবে শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার বিচার না হলে এটি খারাপ নজির হয়ে থাকবে।’ এ সময় শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, আজকের মধ্যে তাদের দাবি আদায় না হলে ভিসিকে ভবন থেকে বের হতে দেবেন না। এরপর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ ও ২ নম্বর ভবন থেকে বের হওয়ার পথে অবস্থান নেন।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে পেছনের দরজা দিয়ে ভিসি ৫০-৬০ জন নিরাপত্তা প্রহরীর সহযোগিতায় এক প্রকার পালিয়ে যান। একই সময় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পাঁচ জন শিক্ষকের একটি প্রতিনিধি দল সমঝোতামূলক আলোচনা করছিল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। ১০টা ১০ মিনিটে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আলোচনা শুরু হয়ে পৌনে ১১টার দিকে শেষ হয়। এ আলোচনায় ছাত্রছাত্রীদের পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।

আগের তিন দফা দাবির সঙ্গে মঙ্গলবার আরও দুই দফা দাবি তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা। মোট পাঁচ দফা দাবি হচ্ছে- লাঞ্ছিত শিক্ষকের পুনর্বহাল, যারা ফারহান স্যারকে লাঞ্ছিত করেছেন সেসব অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পরবর্তীকালে কোনো ধরনের হয়রানি না করা, কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটি ভেঙে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে ও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়ানো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিদায় করতে হবে।
ছাত্রদের প্রস্তাব অনুযায়ী তদন্ত কমিটি পুনর্গঠনের দাবি মেনে নেয়া হয়। এতে ছাত্রদের পছন্দের চারজন সদস্য থাকবে। পঞ্চম সদস্য দেবেন ভিসি। ছাত্রদের পছন্দের চার সদস্য হলেন- অধ্যাপক আফসান চৌধুরী, অ্যালামোনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য অ্যাডভোকেট সাবিক ইলাইহি রহমান, ছাত্র প্রতিনিধি কামরুন নাহার ডানা এবং প্রক্টর সামিয়া। ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষদের ৩৫ মিনিট আলোচনার বেশিরভাগ জুড়ে ছিল তদন্ত কমিটির সময় নিয়ে। কর্তৃপক্ষ সাতদিন সময় দিলেও ছাত্ররা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করার দাবি করে। শেষে আলোচনায় আশা শিক্ষকরা বিকল্প প্রস্তাব দেন। সেটি হল- ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে প্রতিদিনের জন্য ছাত্রছাত্রীরা শোকজ নেটিশ দেবে। সব শেষে আজ বেলা ১১টায় ক্যাম্পাসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে মঙ্গলবারের কর্মসূচি শেষ করা হয়।

মঙ্গলবার দুপুরে আন্দোলন চলাকালে এক নম্বর ভবনের সামনে প্রায় কয়েকশ’ শিক্ষার্থীর মাঝে বসেছিলেন আইন বিভাগের প্রভাষক ফারহান উদ্দিন আহমেদ। তাকেই ৩০ জুলাই চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জানতে চাইলে শিক্ষক ফারহান উদ্দিন বলেন, ‘রোববার দুপুরে রেজিস্ট্রার অফিস থেকে আমাকে ফোন করে মানবসম্পদ বিভাগে যাওয়ার কথা বলে। আমি তাদের কথা অনুযায়ী সহকারী রেজিস্ট্রার মাহিউদ্দিন ও জাভেদ রাসেলের সঙ্গে মানবসম্পদ বিভাগে যাই। মানবসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা আমাকে একটি চেক এবং কিছু নথি দেয়ার চেষ্টা করেন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে অব্যাহতি দেয়ার একটি পত্র ছিল। তবে আমি এ নথিগুলো গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাই।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘ওই সময়েই রেজিস্ট্রার মাহমুদ শাহুল আফজাল রুমে প্রবেশ করে জোর করে আমার আইডি নেয়ার চেষ্টা করেন।

তিনি মাহিউদ্দিন ও জাভেদ রাসেলকে আমার হাত ধরে রাখতে বলেন এবং জোরপূর্বক আমার আইডি নিতে চান। এ সময় রেজিস্ট্রার আমার আইডি কার্ড এতটাই জোরে টান দেন যে, আমার পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যায় এবং তাদের জোড়াজুড়িতে আমি আহত হই। আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদেই শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছি। শিক্ষার্থীরা নিজ আগ্রহেই এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।’
এ ব্যাপারে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহেল ইকবালও ফোন ধরেননি। তবে মঙ্গলবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানায়। কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একজন প্রতিনিধি, একজন অ্যালামনাই সদস্য ও তিনজন শিক্ষককে রাখা হয়েছে। শিক্ষকরা হলেন- অধ্যাপক এএফএম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক আদনান মোর্শেদ ও অধ্যাপক মালাবিকা সরকার। কমিটি ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউসুফ হায়দার  বলেন, ‘একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আমাকে তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে আমি শুনেছি। কাল (আজ) বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বিস্তারিত না জেনে কিছু মন্তব্য করতে পারব না।’

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন