ভাষা আন্দোলনে পিছিয়ে ছিল না স্কুলছাত্ররাও - মতামত - Dainikshiksha

ভাষা আন্দোলনে পিছিয়ে ছিল না স্কুলছাত্ররাও

জেড এ এম খায়রুজ্জামান |

যদিও ভাষা আন্দোলন ব্যাপক অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল তারপরেও দেশব্যাপী জনগণের বিপুল সম্পৃক্ততা সর্বজনবিদিত। প্রসঙ্গত, আমি একটি ছোট্ট উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই যার মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করব কিভাবে বাংলাদেশের (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছোট্ট একটি শহরের স্কুলছাত্ররা তাদের ‘হেডস্যারের’ অনুপ্রেরণায় ভাষা আন্দোলনে অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠেছিল এবং তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা নানাভাবে অত্যাচারিত হয়েছিল।

১৯৫২ সালে নীলফামারী রংপুর জেলার অন্তর্গত একটি ছোট্ট শহর ছিল। শতবর্ষের ঊর্ধ্বে নীলফামারী হাই ইংলিশ স্কুল (বর্তমানে নীলফামারী সরকারি বালক বিদ্যালয়) তখনকার মহকুমা শহরের একমাত্র বালক উচ্চ বিদ্যালয় ছিল। আছির উদ্দিন আহেমদ যিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বিএ৬৯৬৬ ক্যাপ্টেন আর এ এম খায়রুল বাশারের স্বনামখ্যাত পিতা তিনি সেসময় এই স্কুলের প্রথম মুসলিম প্রধান শিক্ষক ছিলেন। একজন শিক্ষাবিদ ছাড়াও তিনি তত্কালীন রাজনীতি বিষয়ে সম্যক অবহিত ছিলেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এই স্কুল থেকেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়। মুসলিম ছাত্রলীগ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার ছাত্রদের ক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং তাদের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল। তিনি ছাত্রদের স্কুলের মাঠে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তদনুযায়ী ছাত্ররা সেখানে সমবেত হন। তিনি যারা ভাষা আন্দোলনে শরিক হতে চায় তাদের হাত তুলে সম্মতি জানাতে বলেন। বেশির ভাগ ছাত্রই হাত তোলেন। কিন্তু বিহারি ছাত্ররা এবং মুসলিম লীগ অনুসারী ছাত্ররা হস্ত উত্তোলন থেকে বিরত থাকে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্ররা বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে নীলফামারীর আকাশ-বাতাশ প্রকম্পিত করে তুলেছিল সেদিন। স্কুলে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। উর্দুভাষী এবং মুসলিম লীগপন্থিরা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় হামলা চালিয়ে আন্দোলন বানচালের চেষ্টা চালায়, কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। মাসব্যাপী উত্তাল বিক্ষোভ উর্দুভাষী মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) মনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। তিনি সর্বসম্মুখে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তিনি সম্ভবত ধারণা করেছিলেন যে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে ছাত্ররা ভীত হয়ে বিক্ষোভ থেকে সরে আসবে। কিন্তু ছাত্ররা তাঁদের প্রাণপ্রিয় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসডিওর কটূক্তির প্রতিবাদে আরও উত্তাল হয়ে ওঠে। বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যুক্ত হয় যখন নীলফামারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও বিক্ষোভে যোগদান করে।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিকের মৃত্যু সংবাদ নীলফামারীতে পৌঁছায়। আন্দোলন মহকুমার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। এই দিন নীলফামারীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। নীলফামারী হাই ইংলিশ স্কুলের ছাত্রাবাসে বৃহত্ জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। বাইশে ফেব্রুয়ারি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে ছাত্ররা মিছিলে অংশগ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে নীলফামারী শহর প্রতিবাদ সভা ও মিছিলের শহরে রূপান্তরিত হয়। নীলফামারী থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য খয়রাত হোসেন গণপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। পুলিশ ২৩ ফেব্রুয়ারি খয়রাত হোসেনকে গ্রেফতার করে। ২৪, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সকল শ্রেণির জনতা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের কণ্ঠে খয়রাত হোসেন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার মুক্তির দাবিতে আগুনঝরা স্লোগানে সারা শহর প্রকম্পিত হতে থাকে। ইতোমধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দবিরউদ্দীন আহমেদ এবং আবু নাজেম মোহাম্মদ আলী ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে গ্রেফতার হন। আন্দোলনরত জনতা স্থানীয় পুলিশ স্টেশনটি দখল করে নেয়। পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতিতে পুলিশ প্রশাসন বেসামাল হয়ে পড়ে। মুসলিম ছাত্রলীগের স্থানীয় সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান যিনি সে সময় ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন তাকে আটক করে। একই সময়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি যুবলীগ আহ্বায়ক শামসুলও আটক হন। জনতা আবারো বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আওয়ামী মুসলিম লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগ এক যৌথ সভায় ২৮ ফেব্রুয়ারি নীলফামারীতে সর্বাত্মক ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়।

যাহোক খয়রাত হোসেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে দুই বত্সর কারাবাসের পর মুক্তিলাভ করেন। দবিরউদ্দীন আহমেদ এবং আবু নাজেম আহম্মদ আলীও ছয় মাস কারাবাসের পর রংপুর জেল থেকে মুক্তি পান। কালক্রমে শফিয়ার রহমান ও শামসুল হকও মুক্তিলাভ করেন। শফিয়ার জেল থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নীলফামারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা কিভাবে তাদের হেডস্যারের অনুপ্রেরণায় ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্টভাষায় পরিণত করে এটা তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস মাত্র। ভিন্ন ছিল না সারা দেশের চিত্রও। আছির উদ্দিন আহেমদসহ অন্য নেতৃবৃন্দ ও প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

লেখক : সাংবাদিক

সূত্র: ইত্তেফাক

ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে বিতর্ক - dainik shiksha ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে বিতর্ক প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ: ৫ দিন আগে অ্যাডমিট না পেলে যা করবেন - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ: ৫ দিন আগে অ্যাডমিট না পেলে যা করবেন নতুন সূচিতে কোন জেলায় কবে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা - dainik shiksha নতুন সূচিতে কোন জেলায় কবে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২৪ মে শুরু - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২৪ মে শুরু সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি - dainik shiksha সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website