মন্দ দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি চাই না - মতামত - Dainikshiksha

মন্দ দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি চাই না

বিমল সরকার |

আমরা বাঙালিরা যে কত আত্মঘাতী ও অপরিণামদর্শী তা সহজে এবং কম কথায় বলে শেষ করা যাবে না। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা সেই পাকিস্তান আমল থেকেই সময় সময় আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন। বেতন-ভাতাদি নিয়ে তারা অনেকবারই হয়েছেন সোচ্চার ও উচ্চকণ্ঠ। ১৯৮৬ সালে শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন চলাকালে তাদের পরিবর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে এসএসসি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। ১৯৯৩ সালে লক্ষ করা যায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সেবার শিক্ষক আন্দোলন চলাকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রি (পাস, সাবসিডিয়ারি ও সার্টিফিকেট কোর্স) পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পাবলিক পরীক্ষাকে কীভাবে প্রহসনে পরিণত করা হয় সেই দুঃসহ স্মৃতি বোধকরি এখনও অনেককেই তাড়া করে বেড়ায়। এমনকি পাকিস্তান আমলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে কোনো পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের দৃষ্টান্ত আছে বলে জানা যায় না।

১ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে একযোগে শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ১৫ লাখ। পরীক্ষা শুরুর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে ২৭ হাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ধর্মঘট ও আমরণ অনশন করছিলেন। তারা এসএসসি পরীক্ষা বর্জন করবেন বলেও শোনা গিয়েছিল। স্বস্তির বিষয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের সেই ধর্মঘটের অবসান হয়েছে। ফলে কিশোর-কিশোরী পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের উদ্বেগ আপাতত দূর হয়েছে। কথায় আছে- ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’। বিশৃঙ্খলার মাঝে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে সাধারণ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সমূহ ক্ষতি ও বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতেন। কোনো মন্দ দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি যেন আমাদের দেশে আর না ঘটে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রেখে শিক্ষকরা আন্দোলনে নেমে খালি হাতে ঘরে ফিরে গেছেন এমন দৃষ্টান্ত বলতে গেলে নেই। ১৯৮৬ সালের আন্দোলনের ফলে বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি অনুদানের পরিমাণ যার যার বেতন স্কেলের ৫০ ভাগ থেকে ৭০ ভাগে উন্নীত করা হয়। আর ১৯৯৩ সালের আন্দোলনের ফলে ৭০ ভাগ থেকে তা ৮০ ভাগে উন্নীত করা হয়। অবশ্য ধাপে ধাপে তা আরও বাড়ানো হয়। তবে শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের ফলে শিক্ষার্থীদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বরাবরই অপরিমেয়।

গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের একশ’ ভাগ বেতন (মেডিকেল ও বাড়িভাড়া হিসেবে সামান্য ভাতাসহ) সরকারি কোষাগার থেকে দেয়া হচ্ছে। এ জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের অনেক পথ হাঁটতে হয়েছে। যেভাবেই হোক, বেতনবৈষম্যের অনুপাতটি এখন আর আগের মতো নেই।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে সত্যিকার অর্থে একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে। আমাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমনই একটি রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্বভার কাঁধে নেন। দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ এবং নয় মাসের বর্বর তাণ্ডবে বিধ্বস্ত একটি দেশকে তিনি সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে গেলেও তার মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনকাল মূলত দেশি-বিদেশি দান-অনুদান গ্রহণ-বিতরণ-বণ্টন এবং স্থাপন-পুনঃস্থাপন ও পুনর্বাসন কাজেই অতিবাহিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক ও যুগান্তকারী কোনো কর্মসূচির বাস্তবায়ন সে সময় সম্ভব হয়নি।

১৯৮০ সালে বেসরকারি শিক্ষকদের প্রথমবারের মতো জাতীয় বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্ত করে জিয়াউর রহমান সরকার। এ সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি তিন মাস অন্তর তাদের যার যার স্কেল অনুযায়ী ৫০ ভাগ অর্থ দেয়া শুরু হয়। পরবর্তীকালে এরশাদ সরকার (১৯৮২-১৯৯০) ২০ ভাগ বাড়িয়ে তা ৭০ ভাগে উন্নীত করে। খালেদা জিয়া সরকার তার প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৬) বেতনের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে ৮০ ভাগ করে। শেখ হাসিনা সরকার তার প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) আরও ১০ ভাগ বাড়ালে তা ৯০ ভাগে গিয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ খালেদা জিয়া সরকার (২০০১-২০০৬) সব ভগ্নাংশ উঠিয়ে দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন স্কেলের ১০০ ভাগ অর্থ প্রদান নিশ্চিত করে। এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে কল্যাণ তহবিল সুবিধা এবং এককালীন অবসর ভাতার বন্দোবন্ত।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ব্যাপারে বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারীদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়। শিক্ষা সচিবের পদ থেকে দুই বছর আগে অবসরে যাওয়া নজরুল ইসলাম খান ২৯ নভেম্বর ২০১৫ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দফতরে দেখা করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী একপর্যায়ে দেশে মোট কয়টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা রয়েছে এবং এগুলো জাতীয়করণ করতে সরকারের অতিরিক্ত সর্বমোট কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা তার কাছে জানতে চান। জবাবে সচিব জানান, ‘খরচ হতে পারে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। আর প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩০ হাজারের মতো।’ সব শুনে প্রধানমন্ত্রী সম্মত হন এবং জাতীয়করণের লক্ষ্যে কাজ শুরু করার দৃঢ় আগ্রহ ব্যক্ত করেন বলে নজরুল ইসলাম খান এক সংবাদ মাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন।

অস্বীকার করার অবকাশ নেই, সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বেসরকারি শিক্ষকরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছেন। পেশাগত সুবিধাদির ক্ষেত্রে সত্তর, আশি, এমনকি নব্বইয়ের দশকেও তারা কেমন এবং কোন অবস্থানে ছিলেন- অতীতের সেসব কথা স্মরণ করলে বোধকরি অনেকটাই স্বস্তি পাবেন। পাশাপাশি সরকারকেও মনে রাখতে হবে, আর্থসামাজিক দিক বিবেচনায় আমরা এখন আর আগের অবস্থায় নেই। দিন দিন অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অনেক সামর্থ্য বেড়েছে। এখন আমাদের আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অপবাদ দেয়ার সুযোগ নেই।

শিক্ষকরা শ্রেষ্ঠ, মহান। আর সরকার ক্ষমতাবান। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট সবাই খোলা মন নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করুক। অশান্ত শিক্ষকদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সরকারের পক্ষে কোনো অসাধ্য ব্যাপার নয়। সবার মনে শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। তাহলেই শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সবার মনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূরীভূত হবে। ঘটবে না কোনো মন্দ দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি।

বিমল সরকার : সহকারী অধ্যাপক, বাজিতপুর কলেজ; কিশোরগঞ্জ

 

সৌজন্যে: যুগান্তর

নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওর সাথেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হতে পারে এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর - dainik shiksha এমপিও বাতিল হচ্ছে ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন কারিগরির ২২৮ শিক্ষক বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website