মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার সাফল্য পরীক্ষিত - মতামত - Dainikshiksha

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার সাফল্য পরীক্ষিত

ড. মো. নাছিম আখতার |

বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তা হলো— যে জাতি যত উন্নত তার দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ ও মমত্ববোধ তত বেশি। জার্মান, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, চীন, জাপান, কোরিয়ার মতো দেশগুলো শিল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়েছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, তারা তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজের ভাষাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তারা কিন্তু পিছিয়ে পড়েনি বরং বৈশ্বিক শিল্প বিপ্লবের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বিশ্বের নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সাথে সাথে তা নিজের ভাষায় রূপান্তরের জন্য তারা বিশ্বের নামকরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর শরণাপন্ন হয়। এসব দেশে পৃথিবীর বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অনুমোদিত শাখা অফিস আছে। ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষায় যখন একটি ভালো বই মুদ্রিত হয় তখন ঐ বইয়ের কপি উল্লেখিত দেশগুলোর মাতৃভাষায় প্রকাশিত হয় এদের মাধ্যমে। ফলে বিজ্ঞানের যেকোনো মূল্যবান জ্ঞান ও তথ্য তারা খুব অল্প সময়ে সহজে পড়তে পারে। এতে তাদের জ্ঞানের উত্কর্ষ সাধিত হয় এবং তারা বিজ্ঞানের ঐ বিষয়ে নতুন জ্ঞান সহজেই আয়ত্ত করতে পারে।

উচ্চশিক্ষার জন্য আমাকে জীবনের বেশ খানিকটা সময় ব্যয় করতে হয়েছে অন্য ভাষা শিক্ষার নিমিত্তে। অন্য ভাষা শিখতে গিয়ে বাংলা ভাষার বর্ণমালার যে জৌলুস আমি দেখেছি তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। পৃথক উচ্চারণের জন্য পৃথক বর্ণের সমারোহে বাংলা ভাষা অনন্য। এই ভাষায় কথা বলতে পেরে আমরা গর্বিত। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ববাংলার জনসাধারণের প্রথম সংঘাত সৃষ্টি হয়েছিল রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে। আমরাই একমাত্র জাতি যারা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে জীবন দিয়েছি।

আমাদের দেশের সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যম বাংলা। এছাড়াও রয়েছে ইংরেজি মাধ্যম বা ভার্সন। মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ইংরেজি ভার্সন বা মিডিয়ামে পড়াটা বেশ ব্যয়বহুল। তাছাড়া দেশের সর্বত্র ইংরেজি মিডিয়ামের মানসম্মত স্কুল নেই। তাই মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় শতভাগ ছাত্রই বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা করে। আমাদের সামাজিক পরিবেশে সমগ্র পরিবেশ ভাব, আবেগ, অনুভূতি ইত্যাদি প্রকাশের মাধ্যম বাংলা হওয়ায় ইংরেজি ভার্সন বা মিডিয়ামে পড়া ছাত্র-ছাত্রীরা একটি দ্বৈত সংস্কৃতির মধ্যে গড়ে ওঠে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে তারা শেখে ইংলিশ সংস্কৃতিই শ্রেষ্ঠ, আবার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে জানে বাংলা সংস্কৃতিই সমৃদ্ধ। ফলে কোমলমতি সন্তানদের সঠিকটি বেছে নিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়তে হয়। নিজের ভাষায় বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়ন, গণিত ইত্যাদি শিক্ষা মানুষের মধ্যে যে প্রত্যয়, দৃঢ়তা এবং সৃজনশীলতার জন্ম দেয় তা অন্য ভাষায় সম্ভব নয়। কারণ অন্য ভাষায় পড়ার জন্য মস্তিষ্কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একধরনের অনুবাদক ব্যবহূত হয়—যা শেখার ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে।

পৃথিবীতে সংঘটিত প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে আমরা অংশগ্রহণ করতে পারিনি সংগত কারণে। সেই সময়ে আমরা ছিলাম ঔপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ। ইচ্ছা থাকলেও স্বাধীনভাবে কাজ করার শক্তি বা সুযোগ কোনোটাই আমাদের ছিল না। বর্তমানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঘটেছে তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে। এই বিপ্লবের সফল অংশীদারিত্বের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা আমাদের রয়েছে। কারণ আমাদেরই আছে সর্বাধিক তরুণ জনশক্তি যাদেরকে আমরা উপযুক্ত কাজ দিতে পারছি না। সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয় মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করছে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রচলন আছে কিন্তু যা নেই তা হলো মানসম্মত প্রযুক্তি বিষয়ক বাংলা বই। বাজারে যা দু’একটা বই পাওয়া যায় তাও খুব একটা মানসম্মত নয়। তাই সরকারের পক্ষ থেকে যদি বিশ্বের নামকরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সাথে এমন চুক্তি থাকে যে তারা ইংরেজি ভাষার বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার বাংলা ভার্সনও ছাপাবে, তাহলে সর্বসাধারণের জন্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে প্রবেশ অনেক সহজ হয়ে যাবে এবং আমরা সফলকাম হবোই হবো। একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরি। পৃথিবীর প্রোগ্রামিং পারদর্শী এক থেকে দশ অবস্থানে থাকা দেশগুলো হলো— চীন, রাশিয়া, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জাপান, তাইওয়ান, ফ্রান্স, চেক রিপাবলিক ও ইতালি। এই দেশগুলোর পড়াশোনার মাধ্যম তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষা। গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে নিজ ভাষায় পঠনের মাধ্যমে তারা বিষয়টিকে এমনভাবে হূদয়ঙ্গম করতে পেরেছে যে তাদের জন্যে পাঠ্য বিষয়বস্তু অনেক সহজবোধ্য এবং আনন্দের হয়েছে।

আমি যে প্রস্তাবটি রাখছি তা কিন্তু অধিক মেধাবীদের জন্য নয়, কারণ অধিক মেধাবী যারা তাদের জন্যে ভাষা কোনো সমস্যা নয়। আমরা যদি এই পদক্ষেপটি গ্রহণ করতে পারি তাহলে আমাদের সাধারণ ছাত্ররাও বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানার্জনে পিছিয়ে থাকবে না। গ্রামগঞ্জের মেধাবী ছাত্র যারা হয়তো ইংরেজি মাধ্যমে লেখা তথ্য বা জ্ঞান অর্জনে অনেক সময় ব্যয় করবে। ঐ একই বই বাংলা মাধ্যমে পেলে সহজেই পড়ে শেষ করবে এবং জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটাতে পারবে অনেক দ্রুত।

সাত শ পৃষ্ঠার একটি ইংরেজি বই পড়ে, বুঝে সেই জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটাতে যে সময় লাগবে, বাংলা ভাষায় ঐ একই বই পড়ে প্রায়োগিক সুফল পেতে তার দশ ভাগের একভাগ সময় লাগার কথা। মাতৃভাষায় একটি সুন্দর মানসম্মত বই নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশিত হলে জ্ঞানের অনুধাবন ও প্রয়োগে শুধু একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর (যারা ইংরেজিতে ভালো) সম্পৃক্ততা থাকবে না বরং সমগ্র জাতিই অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। ঘুমের মধ্যে মানুষের অবচেতন মন যে স্বপ্ন দেখে সেটাও কিন্তু সে দেখে তার মাতৃভাষায়। তাই স্বপ্ন বুনন ও বাস্তবায়নের জন্য কাঙ্ক্ষিত জ্ঞানার্জন হতে হবে নিজের মাতৃভাষায়। তবেই আমরা পারবো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অগ্রসরমান দেশের শীর্ষে অবস্থান করতে। দেশের আপামর জনসাধারণকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নত ধারায় সম্পৃক্ত করতে মাতৃভাষায় জ্ঞানার্জনের কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য শুধু দরকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও জ্ঞান অন্বেষণে জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

 

সৌজন্যে: ইত্তেফাক

বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন আরও ২২৮ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন আরও ২২৮ শিক্ষক পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার আদেশ জারি - dainik shiksha পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার আদেশ জারি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ  বাতিল - dainik shiksha প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ বাতিল স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website