মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষার হাল কী - মতামত - Dainikshiksha

মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষার হাল কী

মাছুম বিল্লাহ |

বিজ্ঞান ও বিশেষ করে ডিজিটাল এই যুগে একটি সংবাদ দেখে অবাক হলাম। আমাদের দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলোতে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোয় পাঠদান করা হলেও হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখানোর জন্য স্থাপন করা হয়নি কোনো বিজ্ঞানাগার। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর ২৯ শতাংশেই কোনো বিজ্ঞানাগার স্থাপন করা হয়নি অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কোনো বিজ্ঞানাগার নেই। আঁতকে ওঠার মতো সংবাদ!

আমরা জানি, বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান—দুটিই সমান অপরিহার্য। শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বীয় বিষয়ে পাঠদান করা গেলেও ব্যবহারিক জ্ঞানার্জনের জন্য বিজ্ঞানাগার থাকাটা আবশ্যক। সে হিসাবে বলা যায়, শুধু বিজ্ঞানাগারের অভাবে বিজ্ঞান শিক্ষায় ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব থেকে যাচ্ছে দেশের ২৯ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। শুধু কি তাই? যেসব বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার আছে সেগুলোতে কী ধরনের যন্ত্রপাতি আছে, থাকলেও কতটা ব্যবহার করা হয় তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করছি। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির বিজ্ঞান ইউনিট কয়েক বছর ধরে একটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানাগার আছে, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিও আছে; কিন্তু কেউ ব্যবহার করছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করতে করতে একেবারে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। আবার এমনও অনেক বিদ্যালয় আছে, যেগুলোতে যন্ত্রপাতি আছে; কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী তো দূরের কথা, শিক্ষকই ওই সব যন্ত্রপাতির নামও জানেন না। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিগুলোর সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন করে পরিচয় ঘটানো, অব্যবহৃত যন্ত্রগুলোকে কীভাবে, কখন ব্যবহার করতে হয়, এর সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং মরিচা ধরা বা অন্যভাবে অকেজো হয়ে যাওয়া যন্ত্রগুলোকে কীভাবে সচল ও কার্যকর করা যায় এ বিষয়গুলো সামনে রেখে ওই ইউনিট বিভিন্ন গ্রামীণ বিদ্যালয়ে কাজ করছে।

অবকাঠামো দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিষয়ে অতি সামান্য ধারণা লাভ করে থাকে। তাদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি হয় মূলত মাধ্যমিক স্তরে গিয়ে। কিন্তু এ স্তরে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর অনেক কারণের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং পর্যাপ্ত ভৌত কাঠামো না থাকা একটি বড় কারণ। এবার জানা গেল আরো একটি কারণ, আর সেটি হচ্ছে বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকা। বিজ্ঞানাগার না থাকা মানে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে এবং বাস্তব জ্ঞান অর্জন ও ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে বিজ্ঞান শিক্ষায় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

ব্যানবেইসের সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস ২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে (নবম ও দশম) বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ৮১ হাজারেরও বেশি। কিন্তু বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকায় এর বড় একটি অংশই ব্যবহারিক বিজ্ঞান শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই চিত্র নিশ্চয়ই হতাশাব্যঞ্জক। আমরা একদিকে বলছি বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব; অন্যদিকে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন করছি না।

বিজ্ঞান শিক্ষার দুরবস্থার কথা ‘সেভ দ্য চিলড্রেনের’ এক গবেষণায়ও উঠে এসেছে। বেসরকারি এই উন্নয়ন সংস্থার  অর্থায়নে পরিচালিত ‘চাইল্ড পার্লামেন্ট’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকা এবং ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞানের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জরিপের আওতাধীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৬১.৭ শতাংশ বলেছে, তাদের কোনো ব্যবহারিক ক্লাস হয় না। এ ছাড়া ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলছে, বিজ্ঞানাগারের জন্য তাদের অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করতে হয়।

সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিজ্ঞানাগার স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানালেও তা পূরণ হচ্ছে না। গত দুই দশকে বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমতে দেখা গেছে। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থী ছিল মোট শিক্ষার্থীর ৪২.৮১ শতাংশ। অথচ ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৮.৯৭ শতাংশে। দুই যুগ সময়ের ব্যবধানে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি এ অনাগ্রহের প্রভাব পড়ছে পরবর্তী ধাপগুলোতেও। পরের ধাপগুলোতে তা ক্রমাগত হারে কমছেই। সে তুলনায় বাণিজ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্নাতক পর্যায়ে ২০১৩ সালে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী কমেছে আগের বছরের তুলনায় ০.২ শতাংশ। চিকিৎসায় কমেছে ১৮.২৭ শতাংশ। প্রকৌশলে উত্তীর্ণের হার এ সময় বাড়লেও তা খুব বেশি নয়, মাত্র ৮.৮১ শতাংশ। অথচ এ সময়ে সামাজিক বিজ্ঞানে স্নাতক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৯.৪২ শতাংশ। একইভাবে ২০১৩ সালে মানবিকে স্নাতক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী বেড়েছে ২১, ব্যবসায় প্রশাসনে ৭২.৭৫ এবং আইনে ৩১.৮ শতাংশ। ইউজিসি আরো বলছে, ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল ১৭ শতাংশ, বর্তমানে তা ১১ শতাংশ।

আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছি। অথচ গোড়াতেই এমন বড় গলদ থাকলে তা কতটা কার্যকর হবে? দেশে যদি আমরা বিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক তৈরি করতে না পারি, তাহলে কারা বাস্তবায়ন করবেন আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন? তাই আবারও বলতে হয়, বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন কখন ও কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে পাঠিয়ে আনন্দের সঙ্গে বিজ্ঞান পড়ানোর কৌশল অবলম্বন করা হয়, যা আমাদের দেশে বেশি বেশি প্রয়োজন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একদিকে দেশপ্রেমের চর্চা হবে; অন্যদিকে অর্থ উপার্জন এবং সর্বোপরি শিক্ষাজীবনেই দেশের সমস্যা দূর করা ও দেশগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করার সুযোগ পাবে। অবহেলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে উঠবে।

বিজ্ঞান মেলা আগের দিনগুলোতে যেভাবে সাড়া ফেলত, এখন কিন্তু সেভাবে দেশের সর্বত্র হচ্ছে না। ব্যক্তিপর্যায়ে বা ছোট ছোট প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড বা অন্যান্য কাজ হচ্ছে; কিন্তু দেশব্যাপী সরকারি পর্যায়ে বিজ্ঞান বিষয়কে সহজ, আনন্দময়, ব্যবহারিক চর্চা ও আকর্ষণীয় করার কোনো কর্মসূচি নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল থাকা উচিত, যা বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করবে, সব বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও সঠিকভাবে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নিশ্চিত করবে এবং যেসব বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার নেই সেসব বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতা নিয়ে।

 

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি করা মার্কেট অপসারণের নির্দেশ - dainik shiksha শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি করা মার্কেট অপসারণের নির্দেশ নীতিমালা সংশোধন কমিটির দ্বিতীয় সভায় এমপিওভুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা - dainik shiksha নীতিমালা সংশোধন কমিটির দ্বিতীয় সভায় এমপিওভুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা এমপিও পুনর্বিবেচনা কমিটির সভা ১৫ ডিসেম্বর - dainik shiksha এমপিও পুনর্বিবেচনা কমিটির সভা ১৫ ডিসেম্বর সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায়ে ৩ শিক্ষক বরখাস্ত - dainik shiksha সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায়ে ৩ শিক্ষক বরখাস্ত ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে খোঁজ রাখেন’ - dainik shiksha ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে খোঁজ রাখেন’ এইচএসসি-আলিমের ফরম পূরণ শুরু - dainik shiksha এইচএসসি-আলিমের ফরম পূরণ শুরু জেএসসি-জেডিসির ফল ৩১ ডিসেম্বর - dainik shiksha জেএসসি-জেডিসির ফল ৩১ ডিসেম্বর লিফলেট ছড়িয়ে সরকারি স্কুল শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, ভর্তির গ্যারান্টি! - dainik shiksha লিফলেট ছড়িয়ে সরকারি স্কুল শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, ভর্তির গ্যারান্টি! এমপিওভুক্তিতে কর্তৃত্ব কমলো ডিডিদের, বাড়লো শিক্ষা ক্যাডারের - dainik shiksha এমপিওভুক্তিতে কর্তৃত্ব কমলো ডিডিদের, বাড়লো শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষামন্ত্রীকে লেখা এমপিদের চিঠিতে এমপিও কেলেঙ্কারি - dainik shiksha শিক্ষামন্ত্রীকে লেখা এমপিদের চিঠিতে এমপিও কেলেঙ্কারি ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা প্রাথমিক-ইবতেদায়ি সমাপনীর ফল বছরের শেষ দিনে - dainik shiksha প্রাথমিক-ইবতেদায়ি সমাপনীর ফল বছরের শেষ দিনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া দৈনিকশিক্ষার ফেসবুক লাইভ দেখতে আমাদের সাথে থাকুন প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮ টায় - dainik shiksha দৈনিকশিক্ষার ফেসবুক লাইভ দেখতে আমাদের সাথে থাকুন প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮ টায় শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন please click here to view dainikshiksha website