মাধ্যমিক ভোকেশনাল এমপিও নীতিমালা অসঙ্গতি - মতামত - Dainikshiksha

মাধ্যমিক ভোকেশনাল এমপিও নীতিমালা অসঙ্গতি

প্রকৌশলী রিপন কুমার দাস |

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ১৩ ভাগ কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন। সরকার ২০২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই সংখ্যাকে ২০ ভাগ ও ২০৪০ খ্রিস্টাব্দের  মধ্যে ৬০ ভাগে উন্নীত করতে চায়। তাই দেশের সকল মাধ্যমিক পর্যায়ের ভোকেশনাল সমূহের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু নীতিমালায় দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ার প্রতি লক্ষ্য না রেখে ট্রেড বিষয়ের শিক্ষকদের প্রাধান্যের পরির্বতে অনেক বেশি সাধারণীকরণ করা হয়েছে । এছাড়া প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের আরো কিছু অসঙ্গতি নিয়ে নিচে আলোকপাত করা হলো।

বর্তমানে সাধারণ শাখায় মাধ্যমিক স্তরে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা প্রায় একেবারেই বন্ধ রয়েছে। পক্ষান্তরে দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করার জন্য বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ মাধ্যমিক স্তরে প্রতিবছর প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পাঠদানের অনুমতি দিচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সদ্যস্থাপিত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের কোন বিধান বর্তমান প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন এবং প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) অথবা বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে। পূর্বে স্থাপিত ননএমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষকদের ১০ থেকে ১২ বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার পর এমপিওভুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকছে কিন্তু ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমের নতুন স্থাপনকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষক নিয়োগের কোন ব্যবস্থাই না থাকে, তাহলে কাদের মাধ্যমে পাঠদান করিয়ে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে। এছাড়া শিক্ষক ছাড়া কীভাবে এমপিও নীতিমালার শর্তসমূুহের শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাশের সংখ্যার চাহিদা প্রতিষ্ঠানসমূহ পূরণ করতে পাববে। ফলে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করা তো দুরের কথা, প্রতিষ্ঠিত নতুন ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানগুরো অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে নতুন স্থাপনকৃত প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুরূপে পরিচালনার জন্য সকল নিয়োগের ক্ষমতা সাংগঠনিক কমিটির হাতে প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বে নিবন্ধনকৃত শিক্ষার্থীরা যাতে অগ্রাধিকার পেতে পারে, সে বিষয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সুপারিন্ডেন্টেন্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম বিভাগে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পাসের কথা উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু সèাতক ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির কথা উল্লেখ রয়েছে, যা দ্বিচারিতার শামিল। 

৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০-এর এমপিও নীতিমালায়ও অনুরূপভাব ছিল, কিন্তু সকলের দাবির প্রতি লক্ষ্য রেখে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চের সংশোধিত এমপিও নীতিমালায় সকলের জন্য দ্বিতীয় বিভাগ অর্থাৎ ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় বিভাগ করা হয়। তাই বর্তমান নীতিমালায় ভোকেশনাল শাখার সকল স্তরে পুনরায় প্রথম বিভাগের পরিবর্তে দ্বিতীয় বিভাগে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পাসের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এছাড়া একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর ঘঞঠছঋ লেবেল ৬ এর মানের ও এসএসসি ভোকেশনাল পাস শিক্ষার্থীরা ঘঞঠছঋ লেবেল ৩ মানের কিন্তু সেখানে কীভাবে সুপারিনটেনডেন্ট পদে বিজ্ঞান বিভাগে সèাতক পাসসহ কীভাবে ঘঞঠছঋ লেবেল ২ পাস মান চাওয়া হয়, যেখানে তার শিক্ষার্থীর ঘঞঠছঋ লেবেল ৩ মানের। তাই এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগে সèাতক পাসসহ সর্বনি¤œ ঘঞঠছঋ লেবেল ৪ পাস মান হওয়া দরকার।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুলাই মাধ্যমিক স্তরের ভোকেশনাল শাখার খসড়া নীতিমালায় এবং চলতি বছরের২৫ এপ্রিলে প্রকাশিত কারিগরি ও বৃত্তিমুলক শিক্ষা প্রশিক্ষণের উন্নয়নে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনায় সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক (কারিগরি) পদের কথা উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে ঘোষিত নীতিমালায় বাদ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। খসড়া নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনার কথা চিন্তা করেও সংযুক্ত ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভোকেশনল) পদটি পুনরায় সৃজন করা একান্ত প্রয়োজন । 

ভোকেশনাল শাখার ট্রেড সমুহের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসসমূহ সঠিক ভাবে পরিচলনার জন্য প্রতিটি ট্রেড একজন করে নবম গ্রেডের ট্রেড হেড পদ সৃজন করা একান্ত প্রয়োজন ছিল।

ভোকেশনাল শাখায় সাধারণ বিষয়ে শিক্ষক সংখ্যা না বাড়িয়ে কারিগরি বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও হাতে কলমে শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রতিটি ট্রেডে নবম ও দশম শ্রেণির ৪০+৪০=৮০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৫ ঃ ১ অনুপাতে কমপক্ষে ৬ জন ট্রেড ইন্সট্রাক্টরের পদ সৃজন করা প্রয়োজন অথবা নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ৪০ এর পরির্বতে ১৫ এ নামিয়ে আনা প্রয়োজন।

যেহেতু মাদ্রাসায় সহকারী গ্রন্থাগারিক পদের ক্ষেত্রে সাধারণ শাখার সèাতকের পরিবর্তে কামিলসহ লাইব্রেরি সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজিতে এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা চাওয়া হয়েছে। তাই কারিগরি শাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড হইতে লাইব্রেরি সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজির উপর ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

সাধারণ শাখার নীতিমালায় সহকারী শিক্ষকদের বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ভোকেশনাল শাখার ক্ষেত্রে ট্রেড ইন্সট্রাক্টর বা সরকারী শিক্ষকদের বিষয় নির্ধারণ করা হয়নি, ফলে নানাবিধ সমস্যার তৈরি হতে পারে।

সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম সুন্দর ভাবে পরিচালনার জন্য বিগত ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুলাই মাধ্যমিক স্তরের ভোকেশনাল শাখার খসড়া নীতিমালার আলোকে  প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একজন করে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার আপারেটর,  পরিচ্ছন্নকর্মী ও আয়ার পদ সৃজন করা প্রয়োজন ছিল। 

নীতিমালার ১৫.১ এর আলোকে বলা হয়েছে একজন শিক্ষক বা কর্মচারী লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। কিন্তু একজন চিকিৎসক শিক্ষক যদি তার অধ্যাপনার পাশাপাশি ক্লিনিক বা চেম্বারে রোগীর ব্যবস্থাপত্র প্রদান করে আর্থিক ভাবে লাভবান হতে পারে, এক্ষেত্রে যদি বাধা না হয়। তবে কেন একজন ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি প্রকৌশলী ট্রেড ইন্সট্রাক্টর বা ইন্সট্রাক্টর তার ক্লাসের বাহিরে জনসাধারণকে বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়ে আর্থিক ভাবে লাভবান হতে বাধা কোথায়। এর ফলে তার ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আরও লাভবান করতে পারবে।

বেসরকারি মাদ্রাসা এমপিও নীতিমালার ১১.১৩ ধারা অনুযায়ী দাখিল মাদ্রাসা আলিম স্তরে উন্নীত হওয়ার পরে দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট ও সহকারী সুপারিনটেনডেন্টগণ যথাক্রমে আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে সমন্বিত হবেন এবং অভিজ্ঞতা পূরণ হওয়ার পর অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের বেতনভাতাদি প্রাপ্য হবেন । কিন্তু মাধ্যমিক স্তরের ভোকেশনাল শাখা যদি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয় তবে প্রতিষ্ঠান প্রধান স্বপদে নিয়োজিত থাকবেন অর্থাৎ তিনি সুপারিনটেনডেন্টই থাকবেন এইচএসসি ভোকেশনাল বা এইচএসসি ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শাখার অধ্যক্ষ পদে সমন্বিত হবেন না। একই বিভাগের দুিিট প্রতিষ্ঠানে দু’ধরনের নিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বিমাতাসূলভ আচরণের শামিল। তাই মাদ্রাসার মতো ভোকেশনাল শাখায় মাধ্যমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হওয়ার পরে মাধ্যমিক ভোকেশনালের সুপারিনটেনডেন্ট উচ্চ মাধ্যমিক  স্তরে অধ্যক্ষ পদে সমন্বিত হবেন এবং অভিজ্ঞতা পুরণ হওয়ার পর অধ্যক্ষর বেতনভাতাদি প্রাপ্য হবেন মর্মে সংশোধন করা প্রয়োজন । 

বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) এমপিও নীতিমালার ২.০ ধারা অনুযায়ী স্কুল ম্যাপিংয়ের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ অতিরিক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহ একীভূত করণ। মাধ্যমিক স্তরের ভোকেশনাল নীতিমালায় একধরনের কোন সুযোগ রাখা হয়নি। বর্তমান দেখা যাচ্ছে, কিছু কিছু এলাকায় ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান নেই--অথবা কিছু ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে ৪ থেকে ৫টি ট্রেড আছে। কিন্তু ওই সকল ট্রেডে কাম্যসংখ্যক শিক্ষার্থী পাচ্ছে না  বা একটি বা দুটি ট্রেডের কোটা পুরণ করতে পারছে। তাই স্কুল ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মূল প্রতিষ্ঠানে প্রথম দুটি ট্রেড রেখে অতিরিক্ত ট্রেডগুরো যে সকল ইউনিয়নে ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান নেই, সেখানে ভোকেশনাল নেই এমন বিদ্যালয়ের সাথে সমন্বয় করা যেতে পারে।

মাদ্রাসাগুলোতে এসএসসি ভোকেশনালের পরিবর্তে দাখিল ভোকেশনাল প্রবর্তন করা প্রয়োজন এবং যে সকল মাদ্রাসায় এসএসসি ভোকেশনাল আছে, তা দাখিল ভোকেশনালে রুপান্তরকরণ। এসএসসি ভোকেশনাল শুধু স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান, কারিগরি অথবা মাধ্যমিক স্তরের সাথে চালু করা প্রয়োজন।

কারিগরি শাখায় সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে ডিপ্লোমা ইন কৃষি / ডিপ্লোমা ইন মৎস্য/ডিপ্লোমা ইন ফরেষ্ট্রি/ডিপ্লোমা ইন এনিমেল হেলথ এন্ড হাজবেন্ডারি পাসকরাদের নিয়োগ প্রদানের ব্যবস্থা করা দরকার।

 লেখক : ট্রেড ইন্সট্রাক্টর, ডোনাভান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পটুয়াখালী। 

ডিগ্রি ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু আজ - dainik shiksha ডিগ্রি ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু আজ বৈশাখী ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট কার্যকর জুলাই থেকেই - dainik shiksha বৈশাখী ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট কার্যকর জুলাই থেকেই সরকারি হলো আরও ৪ মাধ্যমিক বিদ্যালয় - dainik shiksha সরকারি হলো আরও ৪ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা - dainik shiksha ২০ হাজার টাকায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বিক্রি করতেন তারা অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha অকৃতকার্য ছাত্রীকে ফের পরীক্ষায় বসতে দেয়ার নির্দেশ আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু - dainik shiksha আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি - dainik shiksha নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি শিক্ষকদের অন্ধকারে রেখে দেড় লাখ কোটি টাকার প্রকল্প! - dainik shiksha শিক্ষকদের অন্ধকারে রেখে দেড় লাখ কোটি টাকার প্রকল্প! একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৪৭ প্রতিষ্ঠান - dainik shiksha একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৪৭ প্রতিষ্ঠান দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website