মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য চাই আদর্শ বিদ্যালয় - মতামত - Dainikshiksha

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য চাই আদর্শ বিদ্যালয়

মোহাম্মদ আবদুল মোতালেব |

এরিস্টটলের মতে ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা।’ আর একটি শিশুর সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জায়গা হল একটি নান্দনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়। শৈশবে একটি শিশুর আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে একটি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার পদচারণার মাধ্যমে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) এর ৪নং ধারায় শিক্ষাকে মানসম্মত, সমতাভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে সবার আগে প্রয়োজন আদর্শ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। যদিও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বর্তমান সময়ে শতভাগ শিশু ভর্তি, ঝরেপড়া রোধ, উপবৃত্তি কার্যক্রম, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্প, একীভূত শিক্ষার এই কার্যক্রমগুলো আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয় বলতে এমন একটি বিদ্যালয় বুঝায়- যেখানে সত্যিকারের শিশুবান্ধব পরিবেশ থাকবে। যার মাধ্যমে একটি শিশু তার সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলনের সর্বোচ্চ সুযোগ খুঁজে পাবে। স্থানীয় জনবল, এসএমসি, অভিভাবক, শিক্ষকবৃন্দ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ অনেকগুলো মানুষের আন্তরিকতার ফসল হচ্ছে একটি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর এজন্য যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে সেবিষয়ে আলোকপাত করা হলো:-

আকর্ষণীয় বিদ্যালয়: একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন কোমলমতি শিশুদেরকে বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ এবং আকর্ষণ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে। আকর্ষনীয় ভবনে যদি আধুনিক ও সুসজ্জিত শ্রেণিকক্ষ থাকে কিংবা শিশুবান্ধব অনুকূল পরিবেশ থাকে তাহলে সেটি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য অনেক বেশি ফলপ্রসূ ও কার্যকর হবে।

শিক্ষার পরিবেশ: একজন অভিভাবক সব সময়ই চান তার শিশুটি পরিবারের মতই বিদ্যালয়েও একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে জ্ঞান অর্জন করুক। আর তাইতো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্লোগান- ‘শিখবে শিশু হেসে খেলে, শাস্তিমুক্ত পরিবেশ পেলে।’

খেলার মাঠ ও ফুলের বাগান: খেলাধুলা একটি শিশুর সুস্থ দেহ গঠনে সবচেয়ে কার্যকরী। একটি চমৎকার ও নান্দনিক ফুলের বাগান বিদ্যালয়ের পরিবেশকে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং ওই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকগণের রুচিশীলতারও পরিচয় বহন করে।

শিক্ষকদের অফিস: বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা সমৃদ্ধ অফিসরুম থাকতে হবে। একটি বিদ্যালয়ের শিখন-শেখানো থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয়ের খোঁজ পাওয়া যাবে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে পা রাখলে। একটি স্মার্ট অফিসরুম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যকে চিত্তাকর্ষক করে তোলে। অভিভাবকগণও ওই বিদ্যালয় সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে থাকেন। 

নিরাপত্তা ব্যবস্থা: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সীমানা প্রচীর থাকা দরকার। কোমলমতি শিশুরা ইদানীং নানা রকম দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে। সীমানা প্রাচীর থাকার অর্থই হল একটি শিশু নিরাপদে বিদ্যালয়ে অবস্থান করছে। অভিভাবকগণও এতে অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করে থাকেন। 

এসএমসি, পিটিএ কমিটি ও মাদার্স ক্লাব: বিদ্যালয়ের এসএমসি, পিটিএ কমিটি কিংবা মাদার্স ক্লাবের একটি গঠনমূলক ও অর্থবহ ভূমিকা থাকতে হবে। এসএমসির সদস্যদের হতে হবে শিক্ষিত মার্জিত এবং বিদ্যালয়ের প্রতি শতভাগ আন্তরিক। একটি কার্যকরী মাদার্স ক্লাবও বিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

স্থানীয়দের সাথে সম্পর্ক: স্থানীয় জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হলো একটি বিদ্যালয়। তাই বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকার জনগণ, স্থানীয় প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি: প্রাথমিক বিদ্যালয় শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ওয়াশব্লক এবং টিউবওয়েলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ পানি পানও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজ: বিদ্যালয়ে নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকলে সহজেই তার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সাময়িক পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি কার্যক্রমসহ যে কোনো প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি কিংবা ঘোষণা দেয়া যায়। তাছাড়া নানা সমালোচনা থাকলেও বর্তমান যুগে ফেসবুক একটি শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম। বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী এই পেইজের মাধ্যমে পোস্ট কিংবা শেয়ার করা যেতে পারে। 

ড্রেস ও মিড-ডে মিল: একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের স্মার্ট, রুচিশীল করে তোলার জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ড্রেস অত্যন্ত জরুরি। মিড-ডে মিল চালু ও যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্কুল পালানোর প্রবণতা রোধ এবং শিশুর সুস্বাস্থ্য রক্ষায় মিড-ডে মিল সবচেয়ে কার্যকরী। 

শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত: গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত ১:২৫ (২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক) যুক্তিযুক্ত। তাহলেই কেবল প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রান্তিক যোগ্যতাসমূহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।

সুযোগ্য প্রধান শিক্ষক: বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে দক্ষ, যোগ্য ও চৌকস হতে হবে। যার হাত ধরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হবে শিশুর নিজস্ব আবাসস্থল। 

সৎ ও চৌকস শিক্ষা কর্মকর্তা: শিক্ষা কর্মকর্তাদের সৎ হতে হবে। শিক্ষকদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষক বদলিতে, প্রশ্নপত্র তৈরি এবং উপবৃত্তিতে কোনও রকমের দুর্নীতিকে প্রশয় দেয়া যাবে না। কর্মকর্তারা চৌকস না হলে শিক্ষকদের মনিটরিং করতে পারবেন না। 

আধুনিক প্রযুক্তি: সরকার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ও মডেম সরবরাহ করেছে, যাতে শিক্ষকগণ শিখন শেখানো কার্যাবলী ফলপ্রসূ ও প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। তাই ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার করে পাঠ উপস্থাপন অত্যন্ত জরুরি।
 
প্রশিক্ষিত শিক্ষক: স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক ভিন্ন চিত্র। আর তাই কোমলমতি শিশুর মূল ভিত্তি মজবুত করার জন্য এবং মানসম্পন্ন স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষকের বিকল্প কিছু হতে পারে না। 

শ্রেণিকক্ষ: শিক্ষার্থীদের শিখন-শেখানো কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার জন্য শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষাপোকরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একটি শিশুর নিকট পাঠকে আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করে উপস্থাপন করতে না পারলে বিদ্যালয় কখনো মানসম্পন্ন হবে না। 

একাডেমিক সুপারভিশন: প্রধান শিক্ষক ক্লাস পরিদর্শন ও মনিটরিং করে যথাযথ পরামর্শমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। যা শিখন-শেখানো কার্যাবলীর জন্য অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

সরকার মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ও মানসম্পন্ন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে পিইডিপি-৪ এ প্রাথমিক শিক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে। অর্থাৎ একটি বিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন করার জন্য মাইনর মেরামত, রুটিন মেইনটেন্যান্স, স্লিপ বরাদ্দ, ওয়াশ ব্লক বরাদ্দ, প্লেয়িং এক্সেসরিজ, প্রাক-প্রাথমিক বরাদ্দসহ, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। স্বপ্নের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের পাশাপাশি এই কার্যক্রমগুলোর সঙ্গে জড়িত সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে শতভাগ আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

লেখক: সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

শোক দিবস পালনের চিঠিতে অনুপস্থিত ‘জাতির পিতা’ - dainik shiksha শোক দিবস পালনের চিঠিতে অনুপস্থিত ‘জাতির পিতা’ শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কমিটির প্রস্তাব - dainik shiksha শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কমিটির প্রস্তাব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ১৮ অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা নিয়োগ - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ১৮ অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা নিয়োগ শিক্ষা ভবনে জামাতপন্থি কর্মকর্তা, ছাত্রলীগের তোপের মুখে মহাপরিচালক - dainik shiksha শিক্ষা ভবনে জামাতপন্থি কর্মকর্তা, ছাত্রলীগের তোপের মুখে মহাপরিচালক প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার রুটিন - dainik shiksha প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার রুটিন এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর - dainik shiksha এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ৪ অক্টোবর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website