মির্জা সাহেবের অশ্রুবর্ষণ ও তীরহারা জাহাজের কথা: অধ্যক্ষ শরীফ সাদী - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

মির্জা সাহেবের অশ্রুবর্ষণ ও তীরহারা জাহাজের কথা: অধ্যক্ষ শরীফ সাদী

অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী |

কিছুদিন পূর্বে বিএনপির মহাসচিব ও সাবেক শিক্ষক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি অনুষ্ঠানে আলোচনা করিতে গিয়া ব্যাপক কান্নাকাটি করিয়াছেন। সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে সহজেই অতি দুঃখে ভারাক্রান্ত হইয়া যাইতেছেন। বিএনপির উচ্চপদাধিকারীগণের এহেন অশ্রুপাত, পারস্পরিক দোষারোপ, দিগ্বিদিক বিভিন্নমুখী কথপোকথন, লন্ডনের বিষাক্ত রিমোটের অস্থিতিশীল সিদ্ধান্তের কার্যকারণ উদঘাটন এবং বিএনপি তৃণমূলের বিপুল অনুসারীবৃন্দ কেন আগ্নেয়গিরির বিধ্বংসীরূপ লইয়া সরকারের বিরুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িতেছে না ইহার হেতু অনুসন্ধানর্পূবক একটি পর্যবেক্ষণ –

দলীয় নির্বাহী প্রধানের এই বারিবর্ষণ কি কেবল চেয়ারপারসনের জামিন না পাওয়া এবং সুদীর্ঘ কারাবাসের কারণে? নহে। এই শুভ্রাংশুবদন মির্জা সাহেবের মোহময়ী ব্যক্তিত্বের মায়াবী অশ্রুপাত কি কেবল তাহার ওপরে ন্যস্ত মহাসচিবের সুবিশাল দায়িত্ব তদীয় পুত্রতুল্য উগ্রপন্থি তারেকের নির্দেশনাবলী পালনে অপরিসীম অপারগতার কারণে? তাহাও নহে। 

তাহা হইলে, সুদর্শন মির্জা ফখরুল মহোদয়ের এইরূপ দুর্দশাগ্রস্থ মায়া-জাগানীয়া মুখাবয়বের অন্তরালের হেতুবাদ কী? অন্য কিছুই নহে। ইহা মর্ম-যাতনা, তাঁহার মর্ম-পীড়া। ইহা তাহার নিজ অন্তঃকরণপ্রসুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অনুগামী হইতে না পারার অন্তর্জালা। উপরন্তু উদ্ধতস্বভাবের এক দুর্বিনীত তরুণ গ্যাং-পলিটিশিয়ানের বাধ্যগত অনুগামী হইয়া আত্মদহনের দুঃসহ যন্ত্রণায় তিনি দগ্ধ। সেইহেতু সুলোচন মির্জার এইরূপ শিশুসুলভ ক্রন্দনরত মুখশ্রী। নিজস্ব অভিমত ও মনন-মেধাকে ভারী পাথরের তলদেশে চাপা দিয়া তিনি কতক্ষণ পারেন উন্মাতাল অপরিণামদর্শী উত্তপ্ত মস্তিষ্কযুবরাজের উদগ্র রাজনৈতিক বাসনার যূপকাষ্ঠে নিজ ব্যক্তিসত্ত্বাকে বলিদান করিতে?

সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সংসদের অভ্যন্তরে তাঁহার অবস্থান থাকিলে নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী গঠনমূলক বিরোধিতার কন্ঠস্বর হিসাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আবির্ভূত হইতে পারিতেন। দেশ-বিদেশে সকলের প্রত্যাশা ছিলো সংখ্যাতত্ত্বের দিক দিয়া নহে, বিএনপির স্বল্পসংখ্যক সংসদ সদস্য হইলেও মির্জা ফখরুল তাহার বাকপটুতায় সংসদের ভেতরে-বাহিরে তুমুল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জনগণ-গ্রহণযোগ্য বিরোধী দলের বীরোচিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে পারিতেন। কিন্তু তাঁহার সতীর্থ সমবয়সী জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ, মধ্যবয়সী ও তরুণ নেতৃবৃন্দের কেহই তাঁহার সংসদে যোগদানের পক্ষে নয় বরং ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া মির্জা সাহেবকে ‘না-ঘরকা না-ঘাটকা’ অবস্থায় বিলক্ষণ মানসিক চরম দুর্দশায় নিপতিত করাইয়া রাখিতেছেন। নয়নবর্ষণে রুমালসিক্ত হইবার ইহা অন্যতম কারণ। 

"ভুল সবই ভুল এই জীবনের পাতায় পাতায় সবই ভুল"

পঁচাত্তর-উত্তর প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্রের বধ্যভূমির ভিত্তিমূলে জন্ম লওয়া এবং ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শনগত ভূলের ওপর জন্ম লওয়া একটি প্লাটফর্ম বিএনপি। বিএনপি নামক এই প্লাটফর্মখানা ইহার জন্মলগ্ন হইতে "দোদুল্যমানতা ও সিদ্ধান্তহীনতা" রোগে  নিরন্তরভাবে আক্রান্ত। এই সংগঠনের অসংখ্য নিদর্শন রহিয়াছে "দোদুল্যমানতা ও সিদ্ধান্তহীনতার" নীতি আদর্শ ও কার্যক্রমে। যেমন:

১.মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস প্রশ্নে তাহারা দ্বিধান্বিত, পেয়ারের পাকিস্তানী আদর্শ ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দর্শন লালন, আবার মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কথাও বলন, দুই বৈপরীত্যকে একাধারে ধারণ করিয়া চলিবার নাম বিএনপি।
২. মুক্তিযুদ্ধের জাতীয়তাবোধ অবশ্যম্ভাবীরূপে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ভিত্তিভূমে প্রোথিত, ইহার সহিত ইসলামী মূল্যবোধের রাজনৈতিক দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটানোর লেশমাত্র অবকাশ নাই।
কিন্তু এই দলটি কোন্ বিষয়টিকে ধারণ ও লালন করে তাহা স্পষ্ট নহে। এইরূপ দোদুল্যমানতা বিএনপি রাজনীতির অগ্রসরমানতার অন্তরায়।
৩. ঐক্যফ্রন্টে মহামহিম হোয়াইট কালার পণ্ডিতবর্গ রহিয়াছেন যাহারা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাহ্যিক পরিধানে আচ্ছাদিত, সেই শ্বেতশুভ্রদের(?) সহিত মিলিত হইয়া সংসদ বৈতরণী পাড়ি দিতে হইবে, ইহা বিএনপির একাংশের অভিমত। অপর অংশের কথা হইলো,
এই দলের জন্মের সূতিকাগৃহে চরম ডানপন্থী (জামাত ও অন্যান্য) উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সহিত সৃষ্ট সখ্যতার বন্ধনকে কোনক্রমেই ছিন্ন করা যাইবে না। এইক্ষেত্রে বিএনপি কোন্ নির্দেশনায় কোন্ লাইনে পরিচালিত হইবে, তাহাও অস্পষ্ট। এই প্লাটফর্মটির সেই দ্বন্দ্ব আঁতুড়ঘর হইতেই বহমান।

ভাষাভিত্তিক, ভৌগলিক সীমারেখাভিত্তিক, নৃতাত্ত্বিক প্রকৃত জাতীয়তাবাদ কখনোই ধর্ম অথবা সাম্প্রদায়িকতা-নির্ভর রাজনীতির সহগামী হয়না। এইটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিরুদ্ধ অদ্ভূত রাজনীতি যাহা বাংলাদেশে বিএনপি করে। এই কারণে বিএনপি সকল সময় সকল বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। দুরন্ত দুর্বিনীত তরুণের অধীনতা মেনে মির্জা সাহেবের মতো মার্জিত ও সাবেক শিক্ষক শেষাবধি ঐ প্লাটফর্মে থাকিতে পারিবেন না। নিগৃহীত, অপদস্থ ও চূড়ান্তভাবে পরাস্ত হওয়ার পূর্বে বিএনপি নামক (আওয়ামী বিরোধী) প্লাটফর্ম যাহা বর্তমনে অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত এক ডুবন্ত জাহাজ। সেই জাহাজখানা হইতে শমশের মবিন ও আরও কতিপয়ের মত সুশীল সুবচনগণ লাফাইয়া ঝাঁপাইয়া ও সাঁতরাইয়া অতিদ্রুত তীরে উঠুন।

 

লেখক: অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী, সদস্য-সচিব বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড।

[মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়]   

মাদরাসা শিক্ষকদের জুন মাসের এমপিওর চেক ছাড় - dainik shiksha মাদরাসা শিক্ষকদের জুন মাসের এমপিওর চেক ছাড় স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের জুনের এমপিওর চেক ছাড় - dainik shiksha স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের জুনের এমপিওর চেক ছাড় শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে স্কুলের তথ্য চেয়েছে অধিদপ্তর - dainik shiksha শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে স্কুলের তথ্য চেয়েছে অধিদপ্তর আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে বন্যা দুর্গত এলাকায় স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার নির্দেশ - dainik shiksha আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে বন্যা দুর্গত এলাকায় স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার নির্দেশ তিন শিক্ষকের ডাবল এমপিও : দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর অধ্যক্ষকে শোকজ - dainik shiksha তিন শিক্ষকের ডাবল এমপিও : দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর অধ্যক্ষকে শোকজ দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর : তথ্য গোপন করে নেয়া অনুদানের টাকা ফেরত - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর : তথ্য গোপন করে নেয়া অনুদানের টাকা ফেরত জটিলতার দ্রুত সমাধান চান এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকরা - dainik shiksha জটিলতার দ্রুত সমাধান চান এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকরা প্রভাষকের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরির অভিযোগ - dainik shiksha প্রভাষকের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরির অভিযোগ শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান - dainik shiksha শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক - dainik shiksha বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে - dainik shiksha শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website