please click here to view dainikshiksha website

মুক্তির সংগ্রামে দুর্বার এগিয়ে চলা

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী | ডিসেম্বর ১৬, ২০১৬ - ৫:১২ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

জাতি হিসেবে বাঙ্গালির একান্ত নিজস্ব কিছু অর্জন আছে, যা অন্য কারো নেই । দুনিয়ার ক’টা দেশে মাতৃভাষা দিবস আছে ? আমাদের মাতৃভাষা দিবস আজ সারা বিশ্বের । সকল জাতির-সব মানুষের । একান্ত আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ।

মাত্র ন’মাসে শত্রুকে পরাস্ত করে স্বাধীনতা অর্জনের কৃতিত্ব আর কার আছে ? মনে হয়, সে কেবল আমাদেরই । সাত মার্চের ভাষণের মতো এমন তেজোদীপ্ত ভাষণ বিশ্বের আর কোন নেতা দিতে পেরেছিলেন ? আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গের ভাষণকে ও হার মানিয়ে যায় আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাত মার্চের ভাষণ । গেটিসবার্গে আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের অনবদ্য এক সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন ,”Democracy is the form of the government of the people,by the people & for the people.”

বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক সাত মার্চের ভাষণটির পরিসমাপ্ত ঘটান এই বলে, “এবারের সংগ্রাম,মুক্তির সংগ্রাম। এবারে সংগ্রাম,আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম-জয় বাংলা ।”

উভয় নেতার ভাষণে মূখ্যতঃ সাধারণ মানুষের কথাই উঠে এসেছে । উভয়ের বক্তৃতার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘সাধারণ জনগণ’। তদুপরি, বঙ্গবন্ধু যেন তার জনগণের জন্য নিজেকে অনেক অনেক বেশী বিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন ।

বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের শেষাংশটুকু বিশ্লেষণ করলে আমরা তার আন্দোলন-সংগ্রামের রূপরেখায় দু’টি পর্বের অস্তিত্ব খোঁজে পাই । একটি স্বাধীনতার জন্য লড়াই বা সংগ্রাম এবং অপরটি মুক্তির জন্য সংগ্রাম । প্রথমটির জন্য দ্বিতীয় সংগ্রামটি অপরিহার্য ছিল আর প্রথম সংগ্রামটি দ্বিতীয়টিকে স্বার্থক রুপায়নের জন্য । কিন্তু, দ্বিতীয় সংগ্রামটির সফল পরিসমাপ্তি ঘটলে ও দূর্ভাগ্যজনক ভাবে আজো আমরা প্রথম সংগ্রামের সফলতার মুখ দেখিনি । কোন কোন ক্ষেত্রে প্রথম সংগ্রামটি আজো শুরু পর্যন্ত করা যায়নি ।

একটি নিজস্ব ভূ-খণ্ড,পতাকা, সরকার ও সার্বভৌমত্বের জন্য আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনিবার্য ভাবে অপরিহার্য ছিল । সে সংগ্রাম এক সীমিত ও নির্ধারিত সময়ের জন্য । কিন্তু, প্রথম সংগ্রামটি ব্যাপক এক প্রক্রিয়া বিশেষ ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যুগপৎ উভয় সংগ্রামের ঘোষণাই সাত মার্চের ভাষণে প্রদান করেন ।

মূলতঃ বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় পর্বের সংগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের ভূ-খণ্ডটি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন । তার সে আকাংখাটি ন’মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় । এর প্রেক্ষাপট সুদীর্ঘ হলেও চৌকস নেতৃত্বের কারণে তা মাত্র ন’মাসে সম্ভব হয়েছিল । কেবল বঙ্গবন্ধুর ন্যায় একজন ক্যারিসমেটিক নেতা ছিলেন বলে বাঙ্গালি তা করতে পেরেছে । ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙ্গালীর মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ও ঐতিহাসিক বিজয়ের মাহেন্দ্র ক্ষণ । সে বিজয়ের নিত্য আনন্দ ও স্বাদ প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আমরা বাঙ্গালি জাতি নতুন করে উপভোগ করে থাকি।

কিন্তু, স্বাধীনতা অর্জনের পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলে ও আমাদের প্রকৃত মুক্তি কতটুকু অর্জিত হয়েছে ? সে মুক্তির সংগ্রামটি ক্ষুধা, দারিদ্র,রোগ, শোক, অশিক্ষা, কুসংস্কার ইত্যাদির হাত থেকে মুক্তি ।

এ সব থেকে মুক্তি পেতেই সাত মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশাপাশি মুক্তির সংগ্রামের ও আহ্বান জানিয়েছিলেন । সে মুক্তির সংগ্রামটি কতটুকু এগিয়ে যাচ্ছে বা কতটুকু কী অর্জিত হয়েছে-তা খতিয়ে দেখবার সময় এসেছে । বঙ্গবন্ধুর সকল স্বপ্ন পূরণ করতে পারলেই আমাদের বিজয়ের স্বাদ ও আনন্দে আমরা পূর্ণতা খোঁজে পাবো- অন্যথায় নয় ।

স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পর পর জাতির জনক ক্ষুধা, দারিদ্র, অশিক্ষা, রোগ, শোক প্রভৃতির বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন । কিন্তু, দূর্ভাগ্য আমাদের এ জাতির ! মুক্তি যুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি মুক্তির সংগ্রামটিকে এগিয়ে যেতে দেয়নি । বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে জাতিকে তারা ঘোর অমানিশায় ঠেলে দেয় । দৈবক্রমে বেঁচে যান জাতির জনকের রক্তের বহমান দু’টি ধারা,দু’বোন- শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ভাগ্যিস এ জাতির ! না হয়, এতোদিনে মুক্তির সংগ্রামের স্বপ্ন পর্যন্ত ধুলিস্যাত হয়ে যেত ।

বাবার মুক্তির সংগ্রামকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা । বাবা শেখ মুজিব জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়ে পাইয়ে দিয়েছিলেন হাজার বছরের স্বপ্নের স্বাধীনতা । কন্যা শেখ হাসিনা জাতিকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’, ভিশন-২০২১ এবংসর্বোপরি ২০৪১ সালে বাংলা দেশকে উন্নত দেশে পৌঁছার স্বপ্ন দেখিয়ে দূর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন । সে এক অনবদ্য মুক্তির সংগ্রামে দুর্বার এগিয়ে চলা ।

শিক্ষা জাতির চালিকা শক্তি । যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে জাতির জনক সে উপলব্ধি থেকে স্বাধীনতার মাত্র দু’বছরের মাথায় প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে পর্যায়ক্রমে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন । ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’-যে কোন স্বাধীন দেশে কেবল শিক্ষিত নাগরিকমাত্রই এ সত্যটুকু উপলব্ধি করতে পারে ।

আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয়কে পুরোপুরি অর্থবহ করে তুলতে দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে । স্বাধীনতা অর্জন যেমন আমাদের জন্য অপরিহার্য ছিল, তেমনি এ দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে শিক্ষা জাতীয়করণ না করে উপায় নেই । মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি অর্জনের আগে অন্ততঃ শিক্ষার আরেকটি স্তর জাতীয়করণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ‘মুক্তির সংগ্রাম’-এর উদাত্ত সে আহ্বানটি তার স্বপ্নের সোনার সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথ অনেক প্রশস্ত করে দেবে ।

যার শিরায় জাতির জনকের উষ্ণ রক্তের ধারা নিত্য প্রবাহমান , কেবল সেই শেখ হাসিনাই এ কাজটি করতে পারেন । বিজয়ের এ শুভক্ষণে বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রতি সবিনয়ে এ আহ্বান আমাদের সকলের ।

 

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট ও দৈনিকশিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন: