মুজিববর্ষে শিক্ষক সমাজের ঐক্য চাই - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

মুজিববর্ষে শিক্ষক সমাজের ঐক্য চাই

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

ঐক্যের আরেক নাম শক্তি। ‘একতাই বল’ এ কথাটি গুরুজন ও শিক্ষকদের কাছে বহু শুনেছি। ছোটবেলা হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য হস্তলিপির খাতায় ‘একতাই বল’ বার বার লিখেছি। লেখার সময় মুখে মুখে জপেছি। এ নিয়ে গল্প পড়েছি। ছাত্রদের পড়িয়েছি। বৃদ্ধ কৃষক ও তার ছেলেদের গল্প। ছেলেদের মাঝে ঐক্য গড়ে তোলার জন্য বৃদ্ধ কৃষক চমৎকার দৃশ্যকল্প তৈরি করেন। ছেলেদের ঐক্যের সুফল শিখিয়ে দেন। অনৈক্যের কারণে যা হয়, তাও দেখিয়ে দেন। বৃদ্ধ মানুষটি কৃষক হলে কী হবে অসাধারণ জ্ঞানী ছিলেন! বুদ্ধিমান তো বটে! ছেলেরা বাবার মৃত্যুর পর ঐক্যবদ্ধ থেকেছে কি না, কে জানে? যদি থেকে থাকে, তবে তারা সুখে দিনাতিপাত করেছে। না হয় তাদের দুর্ভোগের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। অশিক্ষিত বৃদ্ধ কৃষক ও তার ছেলেদের ঐক্যের এই কেচ্ছাটি সব শিক্ষিত লোক মাত্র জানে। কিন্তু নিজের জীবনে এর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে অনেকে উদাসীন। কৃষকের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা যদি একতাবদ্ধ না থেকে থাকে তবে তারা নিশ্চয় দুর্দশা ও দুর্গতির মধ্যে দিন কাটিয়েছে। তাদের দুর্দশাটিকে বর্তমানে দেশের শিক্ষক সমাজ বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের দুঃখ-দুর্দশার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। মূলত শিক্ষক সমাজ, বিশেষত বেসরকারি শিক্ষকদের দুর্গতির জন্য তাদের ঐক্যহীনতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

অনৈক্যই সর্বনাশ ও দুর্গতির অন্যতম কারণ। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস কোনোদিন ব্যর্থ হয় না। আমাদের দেশে প্রাথমিকের শিক্ষকরা বরাবর ঐক্যবদ্ধ ছিলেন বলে তারা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পেরেছেন। তবে গত কয়েক বছর থেকে তাদের মধ্যে কিছুটা অনৈক্য দেখা যায় বলে এখন আর তাদের দাবি-দাওয়া সহসা পূরণ হয় না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি নিয়ে অসন্তোষ আছে। জানি না তারা এ বিষয়ে কত দূর কী করতে পেরেছেন? প্রবীন শিক্ষক নেতা ও দৈনিক শিক্ষার সম্পাদকীয় উপদেষ্টা মো: সিদ্দিকুর রহমান ছাড়া আর কাউকে এ বিষয়ে ততটা সোচ্চার দেখি না। তাদের মধ্যে বেতন বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ আছে। সম্মিলিত প্রয়াস তেমন একটা নেই। জায়গায় জায়গায় নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল। কে নেতা হবেন- এ নিয়ে বিরোধ। কোথাও কোথাও নোট-গাইডের পার্সেন্টেজ নিয়ে বিরোধে সমিতি ভেঙ্গে টুকরো হয়ে যাচ্ছে। নোট-গাইড ব্যবসায়ীরা কোনো কোনো জায়গায় প্রলোভনে ফেলে কোনো কোনো শিক্ষককে হাত করে নিজেদের ফায়দা লুটছে। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে এই ঘটনা ঘটে চলেছে। ফলশ্রুতিতে অনেক জায়গায় শিক্ষক সমিতি দ্বিধা কিংবা ত্রিধা বিভক্ত। নিজেদের মধ্যে মনস্তাত্তিক বিরোধ দিন দিন বেড়ে চলেছে। এই সুযোগে তাদের ন্যায্য অধিকার ও দাবি-দাওয়া থেকে আমলারা দূরে ঠেলে রাখার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।

আমলাদের একটি প্রধান কাজ এই, যেটুকু পারা যায় শিক্ষকদের বঞ্চিত করে রাখা। ভাবসাব দেখে মনে হয়, এরা কোনোদিন কোনো শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করেনি। তারা স্বশিক্ষিত! শিক্ষকরা তাদের দুশমন। কেউ কেউ এমন ভাব দেখায় যে, শিক্ষক তার চক্ষুশূল। শিক্ষকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে মনে শান্তি খুঁজে। দু’ আনা দু’ পয়সার দাম দিতে চায় না। শিক্ষকদের কাছে লেখাপড়া শিখে শিক্ষকদের প্রতি এহেন মনোভাবের কারণ খুঁজে পাই না। বেসরকারি শিক্ষকদের তারা কী যে মনে করে, তার উত্তর জানা নেই।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের ঐক্য আবুল কালাম আজাদের একক নেতৃত্বে ছিল বলে বঙবন্ধু এক রকম শূন্য হস্তে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর সরকারিকরণ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আজকের মতো বিভক্তি থাকলে সেদিন তা হতো কিনা সন্দেহ থেকে যায়। প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদ মর্যাদা ও বেতন, সহকারীদের প্রধানদের এক ধাপ নিচে বেতন নির্ধারণ, বিদ্যালয়ের সময়সূচি ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে যে অসন্তোষ আছে, তা কেবল ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে সমাধান করা যায়। আজ একজন আবুল কালাম আজাদের মতো নেতা কিংবা নিজেদের মধ্যে ঐক্যের একান্ত অভাব বলেই প্রাথমিকের শিক্ষকদের উল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধানের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যায় না।

একতার সুফল অনেকেই নিজেদের ঘরে তুলতে পেরেছেন। এখনো অনেকে তুলছেন। কেবল বেসরকারি শিক্ষকদের সে পথে হাঁটা চলা কম। উদাহরণস্বরূপ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের বিষয়টি এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। এক সময় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বলে কোনো পদ ছিল না। এরা প্রথমে টিপিও বা থানা প্রজেক্ট অফিসার (থানা প্রকল্প কর্মকর্তা) হিসেবে নিয়োগ পান। মূলত এরা উপবৃত্তি প্রকল্প দেখভাল করার জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে এখন তারা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে নিজের পদ মর্যাদা, সম্মান ও জীবন মান বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। একতার কারণে নিজেদের একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে পেরেছেন। এভাবে আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি শিক্ষকরা ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে নিজেদের অনেক দাবি দাওয়া আদায় করে জীবন মান উন্নত করতে পেরেছেন। সরকারি চাকরি কিংবা অন্য যে কোনো কারণে তাদের মধ্যে বিভক্তি কিংবা নেতৃত্বের কোন্দল তেমন একটা দেখা যায় না। এদিক থেকে বেসরকারি শিক্ষকরা অনেক পিছিয়ে। তাদের যেমন নেতার অভাব নেই, তেমনি বিভক্তি ও বিভাজনের শেষ নেই। তাদের কোনো কোনো উপজেলা ও জেলায় তিন চারটে সমিতি। কোথাও আরও বেশি। তাদের কেন্দ্রে কয়টি সমিতি আছে, কেউ সঠিক করে বলতে পারে না। আজকাল কর্মীর বড় অভাব। সকলে নেতা। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে তাদের কোনো অর্জন নেই-এমন কথা বলি না। সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে তারা আজ শত ভাগ বেতন অর্জন করতে পেরেছেন। বৈশাখি ভাতা পেয়েছেন। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য ও একক নেতৃত্বের অভাবে হাস্যকর ও লজ্জাজনকভাবে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব বোনাস পেয়ে চলেছেন। জীবনে বদলি কিংবা পদোন্নতির মুখ দেখেননি। অতিরিক্ত ৪ শতাংশ কর্তন প্রতিহত করতে পারেননি। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট সুবিধার টাকা পাওয়ার সময় সীমার কোনো গ্যারান্টি আদায় করতে পারেননি।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের তিনদিনের মধ্যে পেনশন হাতে পৌঁছার উদ্যোগ নেয়া হলেও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের তিন বছরের ভেতরে পাবার গ্যারান্টিও কেউ দেয়নি। এর কারণ কী? একমাত্র ঐক্যের অভাবে দুর্দশা ও দুর্গতি বেসরকারি শিক্ষকদের পিছু ছাড়ে না। সম্মিলিত প্রয়াসে এসব সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। কমন ইস্যুতে এক হওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়। আগে নেতাদের এক হতে হবে। সাধারণ শিক্ষকদের এক হতে আপত্তি নেই। নেতারা এক হতে পারলে সাধারণ শিক্ষকেরা সহজেই এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। সেদিন জনৈক শিক্ষক নেতার ফেসবুক ওয়ালে লেখা দেখলাম- ‘সংগঠন যার যার, জাতীয়করণ সবার’। এ কেমন কথা? সংগঠন যার যার রেখে কী করে জাতীয়করণ হওয়া যাবে? এ রকম প্রশ্ন যে কারো মাথায় ঘুরপাক খাওয়া স্বাভাবিক।

নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত বলেই বেসরকারি শিক্ষক সমাজ আজ শোষিত। তাদের কমিটি শোষণ করে, আমলারা শোষণ করে। সমাজে নানাভাবে শোষিত হন তারা। কাউকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখার নামই শোষণ। শোষণের বিরুদ্ধে বঙবন্ধু সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। একবার আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনের বক্তব্য দানকালে তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক শ্রেণি, আরেক দিকে শোষিত শ্রেণি। আমি শোষিত জনগণের পক্ষে’। বঙবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশে আজ বেসরকারি শিক্ষকরাই প্রকৃত অর্থে শোষিত জনগণ। শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে অন্তত বেসরকারি শিক্ষকদের ‘শোষিত জনগণের’ উদাহরণ হিসেবে বেঁচে থাকতে হতো না।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে শিক্ষক সমাজ বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক সোনালী দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বঙবন্ধুর ঐতিহাসিক জন্ম শততম দিনটির ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। আর মাত্র ২১ দিন বাকি। সেই ঐতিহাসিক ক্ষণটির আগে মুজিববর্ষকে চিরস্মরণীয় করার একটিমাত্র পথ, সকল স্কুল-কলেজ একসাথে সরকারি করে দেয়া। জাতির জনক তনয়া শেখ হাসিনা চাইলেই সেটি করতে পারেন। তার আগে সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষকদের এক হওয়া দরকার। শিক্ষক নেতারা সে কাজটি করবেন কী? এ কাজটি করতে পারলে তারাও চিরদিন নেতার মর্যাদায় স্মরনীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন। যেমন প্রাথমিকের শিক্ষকরা তাদের চাকরি সরকারিকরণের মহানায়ক আবুল কালাম আজাদকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন।

লেখক : অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট এবং দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক। 

প্যানেলে শিক্ষক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি - dainik shiksha প্যানেলে শিক্ষক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি ‘টেনশনে’ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আহমদ শফীর মৃত্যু, দাবি ছেলের - dainik shiksha ‘টেনশনে’ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আহমদ শফীর মৃত্যু, দাবি ছেলের শিক্ষা জাতীয়করণে কার বেশি লাভ? - dainik shiksha শিক্ষা জাতীয়করণে কার বেশি লাভ? ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে ডিপ্লোমা-ভোকেশনাল ক্লাসের রুটিন - dainik shiksha ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদ টিভিতে ডিপ্লোমা-ভোকেশনাল ক্লাসের রুটিন চাকরি সরকারি অবসর বেসরকারি: সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের বোবাকান্না - dainik shiksha চাকরি সরকারি অবসর বেসরকারি: সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের বোবাকান্না হাটহাজারী মাদরাসা পরিচালনায় সিনিয়র ৩ শিক্ষক - dainik shiksha হাটহাজারী মাদরাসা পরিচালনায় সিনিয়র ৩ শিক্ষক শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে বিশেষ প্রকল্প - dainik shiksha শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে বিশেষ প্রকল্প please click here to view dainikshiksha website