যদি আমরা সত্যিকারভাবে তরুণবান্ধব দেশ হওয়ার শপথ নিতে পারি - মতামত - Dainikshiksha

যদি আমরা সত্যিকারভাবে তরুণবান্ধব দেশ হওয়ার শপথ নিতে পারি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম |

আমরা সবাই জানি, ২০১৮ সালটি হবে নির্বাচনী বছর। আর দশটা নির্বাচনী বছরের মতো এ বছরেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ থাকবে, দলে দলে, দলের ভেতরের নানা উপদলে হানাহানি হবে। নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে দৌড়-ঝাঁপ শুরু হবে। টাকা উড়বে দুর্নীতি বাড়বে। পাশাপাশি, আশ্বাসের, প্রতিশ্রুতির ফানুস উড়বে। আরো যা এই বছর হবে—হাজার দাবি-দাওয়া নিয়ে মানুষ পথে নামবে। বছরটার একটা মাসও পার হয়নি—এর মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছে বছরটা সত্যি নির্বাচনী বছর। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হতে না হতে প্রার্থীরা মাঠে নামলেন। দুই বড় দল মনোনয়ন দিল— না, কোনো পরীক্ষিত মাঠকর্মীকে নয়, ব্যবসায়ীকে। সেই নির্বাচন নিয়ে মামলা হলো, নির্বাচন স্থগিতও হয়ে গেল। প্রথমে শুনলাম তিন মাসের জন্য, পরে শুনলাম ছয় মাসের জন্য। অর্থাত্ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কা অনেকের মধ্যে আছে, তার ছায়া দেখা গেল ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে।

এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হয়েছে। সাত অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা ইত্যাদির দাবিতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ওই অধিভুক্তি বাতিলের জন্য। এ নিয়ে সহিংসতা হলো। ছাত্রলীগ নামল পুলিশের ভূমিকায়। নির্বাচনের বছরে দেখা যাবে, যেসব সমস্যার খুব সহজ সমাধান আছে, সেগুলো সহিংসতা ডেকে আনবে। আমাদের অর্থনীতি দ্রুতই মজবুত হচ্ছে, কিন্তু এর কাঠামোতে ঘুণপোকা ঢুকেছে। এই ঘুণ পোকাগুলো ব্যাংক খাতের, স্টক মার্কেটের, নানা সিন্ডিকেটের। অথচ এসব নিয়ে সমালোচনা হলে ক্ষমতাসীনরা রেগে যাচ্ছেন। নির্বাচনী বছরে সহজে কোনো কিছুই বরদাস্ত করা হয় না।

তারপরও দেশের মানুষ চায় সুখ-শান্তিতে থাকতে। এটি বোধ হয় বাংলাদেশের মানুষের একটা সমস্যা। অশান্ত সময়েও তারা শান্তি খোঁজে। মানুষ আরো আশা করে সন্ত্রাস থাকবে না। সুনীতি চর্চা বাড়বে, উগ্রবাদ থাকবে না, পরার্থপরতা বাড়বে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে— পুঁজিবাদের প্রভাবে এটিই হওয়ার কথা, তারপরও মানুষ আশা করে অর্থনীতি জনবান্ধব হবে।

এসব যে একেবারে অলীক চাওয়া, তা নয়। এসব যে হবেও না কোনোদিন তা নয়; কিন্তু এগুলো হওয়ার পেছনে কিছু কারণ থাকতে হবে, কিছু শর্তও থাকতে হবে। যেমন, আমাদের শিক্ষাটাকে হতে হবে প্রকৃত মানসম্পন্ন, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রাগ্রসর। আমাদের পরিবারগুলোকে হতে হবে সংস্কৃতিবান্ধব, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে হতে হবে উন্মুক্ত—বদ্ধ নয়।

শিক্ষা নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে, পরিবেশ নিয়ে আমরা যদি কিছু উদ্যোগ নেই ২০১৮ সালে, তবে এক প্রজন্মের মধ্যেই ভালো কিছু ফল আমরা আশা করতে পারি।

এ পর্যন্ত বলে অবশ্য আমাদের থামতে হয়, কারণ ২০১৭ সালের শুরুতেও আমরা এই প্রত্যাশাটি ব্যক্ত করেছিলাম, কিন্তু বছর শেষে এসে দেখা গেল, কোনো উদ্যোগ তো নেওয়া হয়ই নি, বরং বিরাজমান শিক্ষা কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলল শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা, যার সুযোগ নিয়ে কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নকলের ব্যাপ্তি বাড়ল।

গত বছরের সবচেয়ে লজ্জাজনক খবর ছিল, দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। আমাদের শিক্ষার বিস্তার বাড়ছে, সন্দেহ নেই, কিন্তু মান রয়ে গেছে তলানিতে। প্রশ্ন ফাঁস, মুখস্থ নির্ভর, সনদমুখি জিপিএ-৫-এর স্বপ্ন দেখে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা যেসব শিক্ষার্থী তৈরি করছে, তারা কখনো আত্মবিশ্বাসী হবে না, আত্মশক্তিতে জেগে উঠবে না।

তারপরও ২০১৮ সালের প্রত্যাশায় পুরনো প্রত্যাশাটাই বস্তুত আমরা পুনর্ব্যক্ত করব, এবং আশা করব নতুন বাস্তবতার তাগিদে প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো নেওয়া শুরু হবে।

নতুন বাস্তবতাটা কী? একটি হচ্ছে জাতি হিসেবে, দেশ হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ। আমাদের অর্থনীতির জন্য ২০১৮ সাল একটি কঠিন বছর হবে। আমরা যদি আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে পৌঁছাতে চাই, যদি উগ্রবাদ মোকাবিলা করে আমরা এগিয়ে যেতে চাই, যদি দেশের সকলের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চাই, যদি শিক্ষাকে প্রকৃত মানবসম্পদ করতে চাই, যদি নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে চাই, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র-জাতিসত্তার মানুষজনকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে চাই, তাহলে ২০১৭ সালের বাস্তবতায় সমর্পিত থাকলে চলবে না। নতুন বাস্তবতা হচ্ছে নতুন হিসাব-নিকাশ, যাতে দেশের ও মানুষের কল্যাণের সবগুলো বিষয় প্রাধান্য পাবে।

নতুন বাস্তবতার আরেকটি দিক হচ্ছে, বাংলাদেশের তারুণ্যচিত্র। যদি তরুণদের সুশিক্ষা দিয়ে, তাদের দক্ষতা তৈরি করে এবং তাদের সৃজনশীলতা চর্চার সকল পথ উন্মুক্ত করে তাদেরকে দেশগড়ার কাজে সম্পৃক্ত করতে পারি, তাহলেই এই বছরটি এবং আগামী সবগুলো বছর আমাদের হবে। না হলে না। কিন্তু আমাদের তারুণ্যচিত্রটি খুব কি আশাবাদী করে আমাদের? একদিকে তরুণেরা প্রত্যাশিত মানের এবং মাত্রার শিক্ষা পাচ্ছে না। অন্যদিকে মাদক, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা, জঙ্গিবাদ এবং বেকারত্বের ফাঁদে পড়ে তাদের জীবনীশক্তি এবং অনেকের জীবন ধ্বংস হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর যেসব দেশ দ্রুত উন্নতির পথে যাচ্ছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া অথবা চীন, তারা তরুণদের পেছনে বিশাল বিনিয়োগ করছে, তাদের সকল জাতীয় কর্মকাণ্ডের ও মনোযোগের কেন্দ্রে তরুণদের রেখেছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ। তাদের দিকে আমাদের সকল মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। ২০১৮ সালে যদি আমরা সত্যিকারভাবে তরুণবান্ধব দেশ হওয়ার একটি শপথ নিতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের এগিয়ে যাওয়া শুরু হবে।

২০১৮ সালে নতুন কিছু প্রত্যাশাও আমাদের তালিকায় যুক্ত হবে। আমরা জানি, এ বছরটি হবে নির্বাচনের বছর। নির্বাচনে বলতে আমাদের চোখে যে প্রত্যাশার ছবিটি ভেসে ওঠে তা হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উত্সবমুখর একটা পরিবেশের— যেখানে প্রত্যেক ভোটার নিশ্চিন্তে তার ভোটের অধিকার প্রয়োগ করবেন এবং সংখ্যাগুরুর পছন্দের প্রার্থীই বিজয়ী হবেন। কিন্তু বাস্তবের ছবিটি খুবই ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীত। নির্বাচন মানে হানাহানি, রক্তপাত, ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালটবাক্স ছিনতাই। নির্বাচন হচ্ছে সহিংসতার এক উত্কট প্রকাশ। এর ফলে গণতন্ত্র কখনো তার কাঙ্ক্ষিতরূপে আত্মপ্রকাশ করে না। অথচ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন যে আমরা করিনি, তা নয়।

২০১৮ সালে আমাদের বড় একটি প্রত্যাশা, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক, গণতান্ত্রিক হোক, স্বচ্ছ হোক। এবং জনগণের পছন্দের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাক।

২০১৮ সালে আমাদের আরো প্রত্যাশা থাকবে, আমাদের অর্থনীতি তার অগ্রযাত্রার পথেই থাকবে, আমাদের সংস্কৃতিচর্চা উন্মুক্ত থাকবে। আমাদের খেলাধুলায় অর্জনের পাল্লাটি আরো ভারী হবে।

তবে এ বছর আমাদের উদ্বেগ, ভয় এবং অস্বস্তির ভাগটাও কম নয়। গত বছর মিয়ানমার থেকে সেদেশের সেনাবাহিনী এবং উগ্রবাদী জনগোষ্ঠীর অত্যাচারে প্রায় দশ লক্ষের মতো যে উদ্বাস্তু আমাদের দেশে আশ্রয় নিল, তাদের আমরা ফেরত পাঠাতে কি পারব? না, পুশব্যাক ধরনের ফেরত পাঠানো নয়, বরং তারা যাকে জীবন ও জীবিকার নিশ্চিত অধিকারসহ সকল নাগরিক এবং মানবাধিকারের সবগুলি যাতে নিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারে সেই নিশ্চয়তাসহ ফেরত পাঠানো। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে বড় এক বিপর্যয়ের উদ্বেগ থেকেই যাবে। একে তো দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে সামাজিক ভারসাম্যে একটা জটিলতা সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা শুধুই বাড়বে।

পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রশ্নে বড় আরেকটি উদ্বেগের বিষয় আমাদের চিন্তায় প্রাধান্য পায়। আমাদের শহরগুলিতে এবং তাদের আশেপাশে জলাশয় এবং জলাভূমি নিরুদ্দেশ হচ্ছে, গ্রামগুলিতে হারিয়ে যাচ্ছে খালবিল নদী, হাওরগুলিতে পলি জমে ভরাট হচ্ছে, নদীগুলি ভীষণরকম দূষণে পড়েছে, অরণ্য-জঙ্গল হারিয়ে যাচ্ছে, খেলার মাঠ দ্রুত উধাও হচ্ছে। সবুজভুক এবং মাঠপ্রান্তর খেকো হিসেবে নদীর প্রতিপক্ষ হিসেবে আমরাই বোধ হয় পৃথিবীর শীর্ষে। ২০১৮ সালের পরিবেশ কি থাকবে আমাদের কুঠার আর কেমিক্যালের নানা মারণাস্ত্রের নিচে?

২০১৮ সালে কি অনেক মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফিরবে না? গুম হয়ে যাবেন কিছু মানুষ যারা ভিন্নমতের অথবা রাজনীতির চর্চা করেন? শিশুরা নির্যাতিত হতে থাকবে, নারীরা লাঞ্ছিত হতে থাকবেন? নাকি এসব ঘটনার লাগামে টান পড়বে, অতীতের বিষয় হবে গুম-অপহরণ ইত্যাদি, ২০১৮ সালে?

উদ্বেগ আছে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে, নানান নতুন রোগ-বালাইয়ের বিস্তার নিয়ে (২০১৭ সালের চিকুনগুনিয়া কি আবার ফিরবে এ বছর?) দারিদ্র্যের বিস্তার নিয়ে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশাগুলি একটু একটু দূর করতে পারি, তাহলে উদ্বেগগুলো দূর করার ক্ষেত্রটাও প্রস্তুত করতে পারি। সে লক্ষ্যেই এগুতে হবে আমাদের ২০১৮ সালে।

লেখক :কথাশিল্পী ও অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সৌজন্যে: ইত্তেফাক

ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় ঠেকাতে ১০ কমিটি এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন স্কুল-কলেজের ১১২৪ শিক্ষক নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি - dainik shiksha নভেম্বরের এমপিওতেই ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মিলাদুন্নবী উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের নির্দেশ - dainik shiksha মিলাদুন্নবী উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের নির্দেশ ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর - dainik shiksha ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ - dainik shiksha শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন মাদরাসার ২০৭ শিক্ষক বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত - dainik shiksha ২৮৮ তৃতীয় শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website