please click here to view dainikshiksha website

যাহা বরাদ্দ তাহাই ব্যয় কিন্তু কাজ কম

রাকিব উদ্দিন | নভেম্বর ৩, ২০১৬ - ৮:৩৫ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

বরাদ্দের সমান ব্যয় দেখানো হলেও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের নীতিমালা উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন ৩৮টি প্রকল্পের অধিকাংশেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৩৬টি বিনিয়োগ ও দু’টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প।

মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে প্রকল্পগুলোর অনুকূলে চলতি অর্থবছরে মোট বরাদ্দ রয়েছে এক হাজার ৩৭৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে জিওবির (বাংলাদেশ সরকার) এক হাজার ১২৩ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য (বৈদেশিক অনুদান) ২৫৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্প খাতে ইউজিসির অনুকূলে অবমুক্ত করা হয় ৬৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ব্যয়ও দেখানো হয়েছে ৬৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ব্যয়িত অর্থ মঞ্জুরি কমিশনের অনুকূলে মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশ।

কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বরাদ্দকৃত ও ব্যয়িত অর্থ কখনো শতভাগ সমান হয় না। সমান হলে নিশ্চয়ই হিসাবে কারসাজি থাকে।’

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার প্রধান ‘চিফ প্ল্যানিং’ কাজী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘একেকটি প্রকল্পের ন্যাচার (ধরন) একেক ধরনের, বাস্তবায়নও করতে হয় ভিন্ন ভিন্ন ন্যাচারে। এর মধ্যে হেকেপ প্রকল্প মূলত গবেষণাধর্মী। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণাধর্মী সাবমিট (জমা) করবেন, আর তা যাচাই-বাছাই করে গ্রহণযোগ্য হলে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের পক্ষ থেকে টাকা দেয়া হয়। কিন্তু গবেষণার জন্য ভালো ভালো প্রস্তাব না আসলে টাকা পড়ে থাকে। এজন্য কাজে ধীরগতি হয়।’

তিনি জানান, ‘টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের ড্রইং ও ডিজাইন করার কথা বুয়েটের। তারা সেখানে ভুল ডিজাইন করেছে। এজন্য ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ধীরগতি হচ্ছে।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনসমূহ সুন্দর, দর্শনীয় ও নান্দনিকভাবে তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনসমূহ দেখলে সেটাকে যেন একটি ফ্ল্যাট বাড়ি বলে মনে না হয়। সেদিকে সকলের নজর রাখা দরকার। প্রয়োজনে ভালো স্থপতি দিয়ে সুন্দর ডিজাইন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ করতে হবে।’

প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিমালা না মেনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের ডিজাইন পরিবর্তন না করা, প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরুর আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়ন, ৫০ কোটি টাকার ঊধর্ব ব্যয় সম্বলিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, সরকারি ক্রয়-সংগ্রহ, সংগ্রহ আইন ও বিধিমালা অনুসরণ এবং প্রকল্প পরিচালকের প্রকল্প এলাকায় অবস্থান ইত্যাদি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখার এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের বিধিবিধান অনুসরণ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন অনুসরণ করেন, যা নিয়মবহির্ভূত।

এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ মাসিক সভায় বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। এ ধরনের সংস্থার নিজস্ব অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এক ধরনের বিধি প্রচলিত আছে। তবে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিধিবিধান পালন করা আবশ্যক। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিয়মকানুন অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। প্রকল্পের ক্ষেত্রে কোন বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ন্যায় কার্যক্রম গ্রহণ করলে তা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে তা ব্যক্তি বিশেষের দায়িত্ব হিসাবে গণ্য করা হতে পারে।’

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও ধীরগতি

জানা যায়, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে বাস্তবায়নাধীন সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো- ‘হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’ (হেকেপ)। ২০০৯ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া এ প্রকল্পের এখন তৃতীয় পেইজ বাস্তবায়ন হচ্ছে যা ২০১৮ সাল নাগাদ চলবে। এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় দুই হাজার ৫৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যার ৮৭ শতাংশ অর্থের জোগান দিয়েছে বিশ্বব্যাংক এবং বাকি ১৩ শতাংশ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইউজিসি’র কর্মকর্তারা দেশের উচ্চশিক্ষার বিকাশে যথাযথ গুরুত্বারোপ না করে প্রশিক্ষণ লাভের নামে ‘হেকেপ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত। মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তাও এ প্রকল্পের টাকায় ভ্রমণ বিলাসের সুবিধা নিচ্ছেন।’

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন

জানা গেছে, মাটির টিলা কাটার জন্য পরিবেশ সংক্রান্ত হাইকোর্টের একটি স্থগিতাদেশ থাকায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক ভবনের উন্নয়ন কার্যক্রম তেমন এগোয়নি। পরবর্তীতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলেও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ছাড়পত্র প্রয়োজন রয়েছে কী না সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াও ঝুলে রয়েছে। এজন্য সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ স্থগিত রয়েছে।

টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পরামর্শক সংস্থার সহায়তা গ্রহণ করে ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে’ একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ করার কথা ইইডি’র। ওই ভবনের ড্রইং ও ডিজাইন পরামর্শক সংস্থার প্রণয়ন করার কথা। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠান (বুয়েট) ভবনের ভুল ড্রইং ও ডিজাইন করেছিল। কিন্তু এটি সংশোধনের কথা বলা হলে পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠান আর ড্রইং ও ডিজাইন জমা দেয়নি। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ এগুচ্ছে না।

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে। এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক বদলি হওয়ায় জমি অধিগ্রহণ কাজে বিলম্ব হচ্ছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা এই বছরে সমাপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু মসজিদের জন্য জায়গা মিলছে না। মসজিদ নির্মাণের জন্য কর্তৃপক্ষ এখনও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরকে (ইইডি) জমি বুঝিয়ে দিচ্ছে না। কারণ কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মসজিদ নির্মাণ না করে ক্যাম্পাসের বাইরে অন্য একটি মসজিদের পাশে তা নির্মাণ করতে চাচ্ছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করতে হবে। কোন অবস্থাতেই প্রকল্পের মাস্টার প্ল্যানের বাইরে কাজ করা সমীচীন হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন: