শিক্ষকদের অনশন ও টেকসই উন্নয়ন - মতামত - Dainikshiksha

শিক্ষকদের অনশন ও টেকসই উন্নয়ন

আলী ইমাম মজুমদার |

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কিছু শিক্ষক-কর্মচারী জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ২৫ জুন থেকে অনশন ধর্মঘট করছেন। বহুল প্রচলিত শব্দ এমপিও, অর্থাৎ মান্থলি পে-অর্ডার সরকার থেকে পেতে এ আন্দোলন। ২০১৭ সালে বেশ কিছুদিন চলেছিল এ ধরনের একটি কর্মসূচি। তখন সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তার আশ্বাসে তখনকার মতো আন্দোলনের সমাপ্তি টানা হয়।

সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি এবং তা দূর করার কার্যকর পরিকল্পনা না নিলে এমনটা থেকেই যাবে। মাঝেমধ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি ফেলে এখানে এসে জমায়েত হতে হবে কোনো না কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। আন্দোলনরতদের মধ্যে আছেন কলেজ, মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকেরা। তাঁদের দাবি অনেকটা অভিন্ন। বছরের পর বছর তাঁরা পাঠদান করছেন। এগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় দান-অনুদান আর ছাত্র-বেতন থেকে হয়তো কিছু টাকাও দেয়। তবে খুব স্বাভাবিকভাবে সেটা অপ্রতুল।

উল্লেখ্য, তাঁদের প্রায় সবাই মফস্বল শহর বা গ্রাম থেকে এসেছেন। এমপিও–অন্তর্ভুক্তি স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক মর্যাদাও বাড়াবে। আন্দোলনকারীরা বিবেচনা করছেন, এটা তাঁদের অধিকার। একে অসংগত বলার সুযোগও নেই। তবে সরকারের আর্থিক সংগতির দিকটি বিবেচনায় নিতে হবে। এ দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে সমস্যাটির একটি মর্যাদাসম্পন্ন বাস্তবসম্মত সমাধান করা যায়। পাশাপাশি এসব বিষয় সামনের দিনগুলোতে কীভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে, তারও একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সচেষ্ট রয়েছে। এ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য রয়েছে, সব নাগরিকের জন্য গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ অনুচ্ছেদেও প্রত্যেক ব্যক্তির শিক্ষালাভের অধিকার ঘোষিত হয়েছে। এগুলো সবই সরকার করে দেবে, এমন হয়তো নয়। তবে এতে আমাদের মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিতের দেশে এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাই 

গুরুত্বপূর্ণ হবে। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৭ অনুচ্ছেদে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অবশ্য যুগবাহিত রেওয়াজ অনুসারে এ দেশের শিক্ষা অনেকটা সামাজিক দায়িত্বের আওতায় ছিল। সরকার দিত সহায়তা। কিন্তু এখন ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ সে দায়িত্ব খুব বেশি নিতে পারছে না। তবু বেসরকারি, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি সামাজিকভাবে পাওয়া যায়। সূচনার অর্থায়নও হয় সেভাবেই।

অন্যদিকে মফস্বল শহর কিংবা গ্রামের শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সমাজের হতদরিদ্রদের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও উপযুক্ত বেতন দিয়ে মাধ্যমিক বা এর ওপরের স্তরে পড়ানোর সামর্থ্য খুব কম অভিভাবকের আছে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ও শিক্ষকের বেতনের জন্য নির্ভর করতে হয় সরকারের ওপর। উল্লেখ্য, প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব মোটামুটি পুরোটাই সরকার নিয়েছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও ক্রমান্বয়ে চলে যায় সরকারের আওতায়। এগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পান সরকারি নিয়মে।

সমস্যাটি থেকে যায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। এখানে প্রতিষ্ঠানভেদে এমপিওভুক্তির সংখ্যা নির্ধারণ করা আছে। এ ধরনের নিয়ম না থাকলে এর অপব্যবহার হয়তোবা হতো। তবে অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত শিক্ষকের এমপিও মঞ্জুরি পাওয়া একরকম দুষ্কর। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ছাত্র-বেতন বা ভিন্ন কোনো উৎস থেকে সেসব শিক্ষকের বেতনের দায় মেটানোর ব্যবস্থা করে। তবে এখনকার আন্দোলনকারীদের মধ্যে সেই শিক্ষকেরা নেই। তাঁদের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এমপিওর আওতার বাইরে। অথচ তাঁরা ছাত্রদের পড়ান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাফিলিয়েশনও দিয়েছে। আর সেটা পেতে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা, ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যা, শিক্ষকদের যোগ্যতাসহ অনেক কিছুই যাচাই করা হয়। তাই এ ক্ষেত্রে আন্দোলনরত শিক্ষকদের দাবির যৌক্তিকতা সামনে চলে আসে।

সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ বটে। তবে প্রতিবছর বাজেটে অতিরিক্ত একটি সংখ্যায় এমপিওভুক্তির সংস্থান রাখা সংগত ও প্রয়োজনীয়। আর সেটা করতে নিছক রাজনৈতিক বিবেচনায় না গিয়ে প্রকৃত অগ্রাধিকার ক্রমানুসারে ব্যবস্থা নিলে এতটা ক্ষোভ থাকবে না। আর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি যথার্থ হওয়া সংগত। অনাবশ্যক কড়াকড়ি কিংবা ঢিলেঢালা কোনোটাই হওয়া সংগত নয়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকার শতভাগ দেয়, এটা বলা হয় জোর দিয়ে। অসত্যও নয়। তবে সে ‘শতভাগ’ কী, এটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ তলিয়ে দেখে বলে মনে হয় না। মূল বেতনের সূচনাস্তরের সঙ্গে একটি ইনক্রিমেন্ট যুক্ত করেই তা চলে বছরের পর বছর। বাড়িভাড়া ভাতার নামে যা দেওয়া হয়, তা দিয়ে বস্তির ঘরও পাওয়া যায় না। চিকিৎসা বা উৎসব ভাতার পরিমাণও নগণ্য। বলা হয়, যেহেতু তাঁরা সরকারি কর্মচারী নন, তাই পেতে পারেন না তাঁদের মতো সুবিধাদি। তত্ত্বগতভাবে এটা সত্য। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাশিক্ষার চেয়ে বেসরকারি খাতই প্রধান ভূমিকায় রয়েছে।

দেশে ২১ হাজার মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে সরকারি হাজারখানেক। ২ হাজার ৩০০টি বেসরকারি কলেজের বিপরীতে সরকারি কলেজ ৩২৭টি। ১০ হাজার মাদ্রাসার মধ্যে মোটে ১টি সরকারি। তাই এদের শিক্ষক-কর্মচারীদের সমাজে ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি দরকার। ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে চলছে। তাই লেখাপড়ার মানও ক্রমনিম্নমুখী। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও এসব স্কুল-কলেজ থেকে পাস করেই চাকরি পান। তাই গোড়া থেকে দুর্বল ভিতের ওপর শিক্ষার্থী ওপরের দিকে আসছে। বড় শহর কিংবা বিরল কিছু ক্ষেত্রে মফস্বলেও কোনো কোনো স্কুল-কলেজে আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের পড়ানোর মানও ভালো হওয়ার কথা। তা-ই হচ্ছে। এদের সঙ্গে অসংখ্য বেসরকারি, এমনকি কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও প্রতিযোগিতায় আসতে পারে না। পারার কথাও নয়। শুধু বাজেটের সময় এলে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সরকার কিছু বাড়ায়ও। তবে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা সচেতন। তবে শিক্ষাকে অগ্রাধিকারক্রমে নিলে সামাজিক খাতে এই বিনিয়োগের সুফল জাতি পাবে ১৫-২০ বছরেই।

এটা সত্যি, আমাদের সমাজে সব ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। একই সমাজে বসবাস করে শিক্ষকেরা এর বাইরে থাকবেন, এমনটা আশা করা সংগত নয়। তাই এর বিভিন্ন স্তরেও দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। অ্যাফিলিয়েশন ও এমপিওভুক্তির জন্য ধরনার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। আর এরই ফলে শিক্ষার্থী না থাকা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের এমপিও ভোগ করার কথাও শোনা যায়। কোচিং ও সহায়ক বই-বাণিজ্য অনেকটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর মূল বইয়ের সঙ্গে সম্পর্কই নেই। অথচ সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে স্কুল পর্যায়ে সব বই দেওয়ার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রম তদারকির জন্য বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সেটি জনবলে দিন দিন ভারী হলেও ঘুণে ধরেছে সব স্তরে। শিক্ষা কার্যক্রম ফেলে এসব পদ-পদবিতে আসার জন্য প্রতিযোগিতা হয়। ফিরেও যেতে চান না অনেকে। এগুলো সবই সত্যি।

তবে এটা সত্যি, জাতির ভবিষ্যৎ কান্ডারিদের তৈরি করেন শিক্ষকেরাই। সুতরাং চলমান অব্যবস্থাকে দূর করার প্রচেষ্টা নেওয়া সংগত। এখন জরুরি প্রয়োজন আন্দোলনরত বা যাঁরা আন্দোলন করছেন না, তাঁদের এমপিওভুক্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি করা। হতে পারে পর্যায়ক্রমে। তবে তা-ও হতে হবে ন্যায়নীতিভিত্তিক এবং যতটা দ্রুত সম্ভব। আমরা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য নানামুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে এ দিকটি উপেক্ষিত থাকলে উপরিউক্ত প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণ থাকবে।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

 

সৌজন্যে: প্রথম আলো

শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী বেশি চাপ নয়, শিক্ষার্থীদের নিজের পথ বেছে নিতে দিন: শিক্ষা উপমন্ত্রী - dainik shiksha বেশি চাপ নয়, শিক্ষার্থীদের নিজের পথ বেছে নিতে দিন: শিক্ষা উপমন্ত্রী নীতিমালা মেনে ভর্তি ফি আদায়ের নির্দেশ - dainik shiksha নীতিমালা মেনে ভর্তি ফি আদায়ের নির্দেশ এমপিও কমিটির সভা ২০ জানুয়ারি - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২০ জানুয়ারি ২৬ জানুয়ারি স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন - dainik shiksha ২৬ জানুয়ারি স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন ৩৫ উত্তীর্ণ ইনডেক্সধারী কর্মচারীরা শিক্ষক পদে নিয়োগ পাবেন না - dainik shiksha ৩৫ উত্তীর্ণ ইনডেক্সধারী কর্মচারীরা শিক্ষক পদে নিয়োগ পাবেন না উপবৃত্তি : ডাচ-বাংলার অদক্ষতায় গাইবান্ধায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি - dainik shiksha উপবৃত্তি : ডাচ-বাংলার অদক্ষতায় গাইবান্ধায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ শুরু ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha শিক্ষার খবর সবার আগে পেতে ‘দৈনিক শিক্ষা ব্রেকিং নিউজ’ ফেসবুক পেজে লাইক দিন please click here to view dainikshiksha website