শিক্ষকের বিকল্প কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম? - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

শিক্ষকের বিকল্প কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম?

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের শেষ প্রান্তে এসে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শুধু তরুণরাই নয়, বিভিন্ন বয়সীর কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এই মাধ্যমটির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারা পৃথিবীর যে কোনো স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমরা সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি দেখতে পাচ্ছি।  বুধবার (১৩ নভেম্বর) ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়। 

নিবন্ধে আরও জানা যায়, বর্তমানে এটি তথ্য আদান-প্রদানের অন্য যে কোনো মাধ্যমের তুলনায় অধিক শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। এই মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, জ্ঞানের ভাগাভাগি এবং একটি স্বগতোক্তিকে কথোপকথনে রূপান্তর করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। এতে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। আর ব্যবহারকারীরা তা দেখার পাশাপাশি তাদের মতামত দিতে পারছে। এখন সময় এসেছে জনপ্রিয় এই মাধ্যমটিকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় কতটুকু উপযোগী করে ব্যবহার করা যায় সেই বিষয়ে ভাবার।

শিখন-শিক্ষণ হচ্ছে একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। এটি কঠিন এবং সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এখানে শিক্ষার্থীদের উচিত শিক্ষকদের সম্মান করা এবং তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করা। শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা, অনুপ্রাণিত করা এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।

কিন্তু আমরা যদি ইতিহাস দেখি তাহলে দেখতে পাই ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শিক্ষকের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথবা কোনো ভালো কনটেন্ট তৈরি করে সহজ মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে শিক্ষার ব্যয় কমানো।

এখনো অনেকে শুধু শিক্ষার্থীদের রেখে কীভাবে শিখন-শিক্ষণ পরিচালনা করা যায় সেই চেষ্টা করছে। তাদের ধারণা, ভালো ভালো শিক্ষকের লেকচার ভিডিও করে বা অনলাইনে দিয়ে দিলেই শিখন-শিক্ষণ হবে। অথবা ভালো কনটেন্ট দিয়ে দিতে পারলে শিখন-শিক্ষণ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরাসরি শিক্ষকের উপস্থিতি না থাকলে শিখন-শিক্ষণ সেভাবে হবে না।

সেই কারণেই আমরা অনেক সময় বলতে চাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ব্যবহৃত হবে? নাকি আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে? কিন্তু আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হলে শিখন-শিক্ষণটা সেভাবে হবে না।

কারণ শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পরিচালিত হলে সেখানে শিক্ষকের উপস্থিতি থাকে না আর শিক্ষকের উপস্থিতি না থাকলে শিখন-শিক্ষণ সেভাবে হয় না। লেকচার ভিডিও করে বা অনলাইনে দিয়ে দিলে হয়তো একজন শিক্ষার্থী সেখান থেকে শিখতে পারবে কিন্তু ভালোভাবে শিখন-শিক্ষণটা হবে না।

কেননা ভিডিও বা শিক্ষা যেহেতু একটি সামাজিক বিষয় সেহেতু এখানে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া, শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া, শিক্ষার্থী এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের মিথস্ক্রিয়ার প্রয়োজন। আর যদি তা করা সম্ভব না হয় তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করা সহজ হবে না। তবে অবশ্যই আমরা এই মাধ্যমটিকে দক্ষতা উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারি।

আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় একদিক থেকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে এবং অন্যদিক থেকে শিক্ষার্থী ও দৈনন্দিন জীবনের ইভেন্টগুলোর মধ্যে প্রতিদিনের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া প্রয়োজন। যখন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে একটা সামাজিক বন্ধন থাকবে তখনই সত্যিকারের শিখন-শিক্ষণ হবে।

আমাদের ক্লাসরুম এবং বাস্তব বিশ্বের মধ্যে যে ফারাক রয়েছে তার সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে। শিখন-শিক্ষণের একটি তাৎপর্য আছে এটি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি বাস্তব বিশ্বের সিস্টেমে তৈরি করা হয়েছে। আপনি যখন মানুষের সঙ্গে কোনো কিছুর বিনিময় করতে যাবেন তখন তার প্রতি আপনার আস্থা এবং বিশ্বাস থাকতে হবে।

সে যে তথ্যটা আপনাকে দিচ্ছে আপনি ধরে নিচ্ছেন সে তথ্যটা সত্য। কিন্তু অনলাইনে তা ঘটার সম্ভাবনা কম। অনলাইনে একজন মানুষ যখন আপনাকে কোনো তথ্য দিল তখন আপনি জানেন না তথ্যটি সত্য কিনা। কারণ যখন কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দিচ্ছে এটা তার নিজের তৈরি করা কনটেন্ট। যেহেতু এই মাধ্যমটিতে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ নেই, তাই এই তথ্যটি সত্য কিনা বাকিরা তা জানতে পারছে না। সে কারণে তথ্য দাতার প্রতি ব্যবহারকারীদের আস্থা থাকে না, কারণ তারা তাকে চিনে না।

সুতরাং আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার পার্থক্য হচ্ছে এটাই, যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কনটেন্ট দিচ্ছে তার প্রতি আমার আস্থা আছে কিনা। যদি কনটেন্টটা আমি আস্থাশীল জায়গা থেকে আনতে পারি এটা শিক্ষায় সহযোগী হিসেবে কাজে লাগানো যাবে। তাই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রয়োজন।

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মাস এডিসন বলেছিলেন যে মোশন পিকচার আসায় টেক্সট বই উঠে যাবে। সবাই ভিডিওর মাধ্যমে টেক্সট বইয়ের উপাত্তগুলো পেয়ে যাবে। কিন্তু আজকে এত সামাজিক মাধ্যমের যুগেও টেক্সট বই উঠে যায়নি। আমাদের বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি বই আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়।

এটা এমনি এমনি দেয় না, এটার প্রয়োজন আছে বলেই দেয়। এরপর রেডিও দিয়ে, টেলিভিশন দিয়ে শিক্ষকের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন অনলাইন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষকের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই জায়গা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। আরো অনেক চিন্তা-ভাবনার পর আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে।

এখন এই মাধ্যমগুলো পরিণত বয়সের শিক্ষিত মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা পরিবর্তন করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবার জন্য উন্মুক্ত, এখানে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই নেই, সেহেতু এই মাধ্যমে অনুপযুক্ত ছবি, সংবাদ এবং ঘটনা সরবরাহ করতে পারে। তাই এই মাধ্যমে হতাশা, গুজব, ব্ল্যাক মেইলিং, ভুয়া পরিচয়, আসক্তি ব্যাধির মতো ঝুঁকিসহ অন্যান্য ঝুঁকি রয়েছে। এই ঝুঁকির কারণ শিক্ষার্থীদের যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের অধিকাংশের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়া বসবাস করা সম্ভব নয়।

তবে এই মাধ্যমটির রয়েছে বেশকিছু ইতিবাচক দিক। এই মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করে থাকেন তার অর্জিত জ্ঞান সে অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী শিখবে তবে সে যদি আরেকটু অতিরিক্ত শিখতে বা জানতে চায় তাও সম্ভব, কারণ সে যে কোনো বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগাভাগি করলে তার ফলাবর্তন পাবে।

সেখানে সহপাঠী এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারবে, শিক্ষক এবং সহপাঠীদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া গ্রহণের ক্ষমতা এবং আদান-প্রদান হওয়া বার্তাগুলোর প্রতিফলনের সুযোগ থাকে। চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ, আলোচনা করা এবং অন্যের আইডিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা এবং প্রদত্ত সমস্যার একটি গ্রুপ সমাধানের জন্য একসঙ্গে কাজ যায়। সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা বিকাশ করার পাশাপাশি নিজের প্রতিফলিত, জ্ঞান ও অর্থের সহনির্মাণ করার দক্ষতা অর্জন করা যায়।

বর্তমান বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য একটি অংশ। এখন এই মাধ্যমটিকে আর শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে আমাদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত শিক্ষায় একে আমরা কতভাবে কাজে লাগাতে পারি তার নতুন পথের সন্ধান করা।

লেখক: মুনাজ আহমেদ নূর, উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।

করোনায় আরও ২৯ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩ হাজার ২৮৮ - dainik shiksha করোনায় আরও ২৯ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩ হাজার ২৮৮ এমপিওভুক্ত হলেন আরও ৭৩ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হলেন আরও ৭৩ শিক্ষক সরকারি স্কুল-কলেজ কর্মচারীদের অনলাইনে পিডিএস পূরণের নির্দেশ - dainik shiksha সরকারি স্কুল-কলেজ কর্মচারীদের অনলাইনে পিডিএস পূরণের নির্দেশ শ্রান্তি বিনোদন ভাতা তুলতে চাঁদা নেয়ার অভিযোগ তিন শিক্ষক নেতার বিরুদ্ধে - dainik shiksha শ্রান্তি বিনোদন ভাতা তুলতে চাঁদা নেয়ার অভিযোগ তিন শিক্ষক নেতার বিরুদ্ধে শিক্ষা কর্মকর্তার গাফিলতিতে ১৭ স্কুল মেরামতের সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা ফেরত - dainik shiksha শিক্ষা কর্মকর্তার গাফিলতিতে ১৭ স্কুল মেরামতের সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা ফেরত পলিটেকনিকে ভর্তিতে বয়সসীমা থাকছে না - dainik shiksha পলিটেকনিকে ভর্তিতে বয়সসীমা থাকছে না সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদের আবেদন শুরু - dainik shiksha সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদের আবেদন শুরু বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক - dainik shiksha বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে - dainik shiksha শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website