শিক্ষক আমদানির মেইজি মডেল - মতামত - Dainikshiksha

শিক্ষক আমদানির মেইজি মডেল

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরঅ্যান্ডডি) কথাটি উন্নত ও উন্নত হতে আগ্রহী রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারকদের কাছে খুবই পরিচিত। কারণ, তারা তাদের বাজেট এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে একে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম বা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও এখানে গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়টি আদৌ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এ তথ্য আমাদের আরও হতাশ করে যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের উচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোও গবেষণায় নিরাসক্ত এবং এই খাতে তাদের ব্যয় অব্যাহতভাবে কমছে। শনিবার (১৩ জুলাই) প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ তথ্য জানা যায়। নিবন্ধটি লিখেছেন মিজানুর রহমান খান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে জায়গা পায় না, তা নিয়ে আমরা তর্ক করি। কিন্ত এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আত্মসমালোচনা করা এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে নিরুৎসাহিত থাকি। ২০১৭ সালে দেশের মোট ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৭টিতে কোনো গবেষণা প্রকল্পই চলেনি। অন্যদিকে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবণতাটিও হতাশাজনক। সেখানেও গবেষণায় ব্যয় ও রবাদ্দ কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় বিষয়টিতে আলোকপাত প্রত্যাশিত ছিল। তিনি তাঁর বক্তৃতায় প্রয়োজনে বিদেশ থেকে শিক্ষক আমদানি করে হলেও মানবসম্পদ গড়ায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। 

এটা সত্যি যে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বায়নের যুগে সুশিক্ষা এবং জ্ঞানে-বিজ্ঞানে মানসম্পন্ন জাতি হওয়ার বিকল্প নেই। আমরা তাঁর সঙ্গে একমত যে প্রয়োজনে আমরা প্রাচীন জাপানের সম্রাট মেইজির মতোই বিদেশ থেকে শিক্ষক আমদানি করব। 

কিন্তু হঠাৎ বিদেশ থেকে শিক্ষক আমদানির প্রতিই যে জোরটা দেওয়া হলো, সেটা তো মৌলিক কতগুলো আনুষঙ্গিক পদক্ষেপের প্রতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আগে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ তো নিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাতে সাধারণভাবে এবং উল্লেখযোগ্য সংস্থাগুলো যাতে গবেষণাকে সমৃদ্ধ করতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করে, সেটা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কিন্তু এসবের কিছুই না করে যখন জাপানি সম্রাটের উদাহরণ দেওয়া হবে, তখন বিষয়টির উদ্দেশ্য নিয়ে একটা ধূম্রজাল তৈরি হবে কিংবা কিছুটা হলেও বিসদৃশ ঠেকবে। তা ছাড়া যখন অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট কক্তৃতায় মেইজির প্রসঙ্গ তুললেন, তখন তার প্রেক্ষাপট এবং মেইজি যুগে জাপানের শিক্ষা খাতে কী ধরনের সংস্কার আনা হয়েছিল, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে। 

জাপানে ১৮৬৮ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত ছিল সম্রাট মেইজির শাসন ছিল। আধুনিক জাপানের রূপকার হিসেবে সম্রাট মেইজি নন্দিত। ১৯১২ সালে মেইজির মৃত্যুর আগে জাপান অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামোসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রভূত উন্নতি সাধন করে। আড়াই শ বছরের সমান্ততান্ত্রিক যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি আধুনিক রাষ্ট্র এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে জাপানের উন্মেষ ঘটে। কিন্তু তাঁর  শাসনামলের রাজতৈনিক ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিকাশ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কম বিতর্ক নেই। মেইজির উন্নয়নভাবনা যত সহজে গ্রহণ করা যাবে, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ততটা যাবে না। পাশ্চাত্য তাকে মহান নেতা নন, স্বৈরশাসক হিসেবে দেখেছে। তাঁর আমলে জাপানে সংসদ ছিল ক্ষমতাহীন। ক্ষমতার সবটাই ছিল নিরঙ্কুশভাবে সম্রাটের হাতে। রাজধানী টোকিও বিনির্মাণসহ উদযাপনযোগ্য বহু মেগা প্রকল্পের  রুপকার সম্রাট মেইজি চীন ও রাশিয়াকে যুদ্ধে হারিয়েছেন। কোরিয়াকে করতলগত করে জাপানকে উন্নীত করেছেন গ্রেট পাওয়ারে। কিন্তু আমাদের কবিগুরু জাপানিদের শিক্ষাচেতনায় ঘাটতি দেখতে পেয়েছিলেন। 

মেইজির মৃত্যুর মাত্র চার বছর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে জাপানিদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছিল।

কবিগুরু মেইজি শাসনের উগ্র জাতীয়তাবাদ উম্মাদনা একদম মেনে নিতে পারেননি। উম্মদনার সেই ভূত যে আমাদের আশপাশে এখনো তাড়া করে ফিরছে না, তা কিন্ত নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং কবুল করেছেন, ‘এর আগেও জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের কথা বলেই বিজেপি লোকসভা ভোটে জিতেছিল। ক্ষমতা ধরে রাখতে ওই আদর্শের চ্যুতি ঘটলে রক্ষা নেই।’ রবীন্দ্রনাথ ১৯০৮ সালে এক বন্ধুকে লিখেছিলেন: ‘ হিরের দামে ঠুনকো কাচ কিনতে আমি নারাজ। জীবদ্দশায় মানবতার ওপর দেশপ্রেমকে তাই ঠাঁই দিতে চাই না।’ সেই কাচ আর হিরের তফাত শেখাতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আদৌ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করি না। 

যাক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। 

জাপান ও কোরিয়ার মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোর বেসরকারি খাতও আরঅ্যান্ডডিতে বিনিয়োগ দারুণভাবে বাড়িয়ে চলেছে। জাপান এই খাতে বছরে ১২ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন (১০৮ ইয়েন ১ মার্কিন ডলারের সমান) খরচ করে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইচিরো সাকাতার মতে, কোম্পানিগুলো ভীত, তারা মনে করে এখানে বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে তার টিকবে না। ভারতের একটি শীর্ষ বেসরকারি কোম্পানি এই খাতে তার বাজেট ১৫ বছরের ব্যবধানে ২৬ গুণ বাড়িয়েছে। এটাই বৈশ্বিক  প্রবণতা। অথচ আমরা এখনো মুখ গুঁজে পড়ে আছি। অর্থমন্ত্রী ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ব্লাকচেইন টেকনোলজি প্রসঙ্গেই শিক্ষক আমদানির কথা বলেছেন। কিন্তু বিনিয়োগ কোথায়। শিক্ষা বাজেটের রূপপুর মডেল (রূপপুরের বরাদ্দ শিক্ষায় ঢুকিয়ে বাজেট স্ফীত করা) কি আশাবাদের জম্ম দেয়?

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ইউনেসকো ইনিস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিসটিকস এই খাতে ১০০টি দেশ, যারা বছরে অন্তত ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করে তাদের পর্যবেক্ষণ করে। সেই তালিকায় মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ থাকলেও বাংলাদেশ নেই। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার  প্রতি ১০ লাখ মানুষের যথাক্রমে ৬ হাজার ৭২৯ ও ২ হাজার ১৯ জন গবেষক। আমাদের কত, তা জানা নেই। তৃতীয় শিল্পবিপ্লব থেকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে উত্তরণের এই সময়ে গুগল স্কলাসটিকায় কার কত উদ্ধৃতি, সেটা আরঅ্যান্ডডির মান নির্দেশক। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ডিন জসীম উদ্দিন আহমদ, গুগলস স্কলাসটিকায় যার ৪০০ উদ্ধৃতি রয়েছে, বললেন এই মানদণ্ডে বাংলাদেশ অনেক নিচে। 

আশা করব, অর্থমন্ত্রী জিডিপির অন্তত ১ শতাংশ আরঅ্যান্ডডিতে বরাদ্দ রেখে বাংলাদেশে মেইজি যুগের সূচনা করবেন।


লেখক : প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website