শিক্ষক কেন কর্মকর্তা হবেন? - 1


শিক্ষক কেন কর্মকর্তা হবেন?

সায়র আলমগীর আহমেদ |

আমেরিকান বিজনেস ম্যাগনেট হেনরি ফোর্ড একদা বলেছিলেন-‘কথায় কথায় নিজের বড়ত্ব জাহির করার অর্থ, অন্যের কাছে নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করা।’ বাংলাদেশে ২৮৩ কলেজ আত্তীকরণের বিষয়ে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কিছু শিক্ষকের অহঙ্কারী মন্তব্যে এমন অনেক উক্তিই হয়তো আপনার মনে চলে আসবে। তবু তাদের বক্তব্য এমনই।
কোনও রাষ্ট্র তখনই সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে যখন তার জনগণ সম্পদে রূপান্তরিত হয়। আর জনগণ তখনই সম্পদ যখন তারা শিক্ষিত এবং কর্মমুখী। রাষ্ট্রের দুর্বলতায় ধর্মীয় গোড়ামি, কুসংস্কার, মৌলবাদী- ধ্যান-ধারণা দানা বাধে। মানুষের মধ্যে অন্ধবিশ্বাসের জন্ম দেয়, অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মতো একটি সাধারণ অর্থনীতি ও নিম্নমধ্য আয়ের দেশের পক্ষে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একক দায়িত্বে হঠাৎ করেই জনগণকে সচেতন ও শিক্ষিত করা একটি দূরহ কাজ। তাই এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার এগোয়। শিক্ষাকে প্রান্তিক জনগণের কাছ সহজলভ্য করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষায় একটি সমবন্টন নীতি গ্রহণে বিশ্বাসী হয়েছেন। দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দেন। কিন্তু ক্যাডার, নন-ক্যাডার দ্বন্দ্ব কিছু কর্মতার বৈষম্যমূলক মানসিকতা, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির অন্যায় আন্দোলন, অধ্যক্ষদের স্বার্থপরতা ও নীতিমালার সীমাবদ্ধতা (একটি তৃতীয় শ্রেণি ও পাসকোর্সধারীদের আত্তীকরণ থেকে বিরত রাখা)সহ নানা কারণে বিষয়টি সমস্যার আবর্তে নিপতিত হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রীর একটি মহতি উদ্যোগ গন্তব্যহীন হয়ে যাচ্ছে।
সমস্যাসংকুল এদেশে কোন ভালো কাজই প্রশংসা পায় না। বরং নানা বাধার আবর্তে ঘুরপাক খায়। প্রতিটি উপজেলায় একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলে এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ছেলেমেয়েরা হয়তো কম খরচে পড়াশুনার সুযোগ পেত, এটা তো অনেক বড় পাওয়া- অথচ এমন একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ কিনা একটি মহলের ষড়যন্ত্র আর কলোনি মানসিকতার দাবানলে পড়ে সমস্যার আবর্তে নিপতিত হল।
একটু পেছন ফিরে দেখি। যতদূর জানা যায় দেশ বিভাগের সময় তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হয় সাতটি সরকারি কলেজ নিয়ে। তারমধ্যে প্রথম সরকারি কলেজ- ঢাকা কলেজ, দ্বিতীয় চট্টগ্রাম কলেজ, তৃতীয় রাজশাহী কলেজ । তবে এ কলেজগুলো যাত্রা শুরু করেছিল মূলত সরকারি স্কুল হিসেবে তারপর বেসরকারি উদ্যোগে এগুলো সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হয়। সে হিসেবে এদেশে কলেজ শিক্ষার গোড়াপত্তন বেসরকারি পর্যায় থেকে। পরবর্তিতে বেশকিছু বেসরকারি কলেজ সরকারি করা হয়। যেমন: ঢাকার জগন্নাথ কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ ইত্যাদি। কলেজ শিক্ষার সার্বিক চিত্রে ফিরে তাকালে দেখা যায় সেই ব্রিটিশ ভারত থেকে বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় সব কলেজই বেসরকারি থেকে সরকারি হয়েছে (অবশ্য সম্প্রতিককালে হাতেগোনা কয়েকটি কলেজ সরকারিভাবেই নির্মিত হয়েছে)।
আজকে বিসিএস শিক্ষা সমিতির সদস্যরা যে কলেজের ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে ক্যাডারের অহংকার করছেন এটাও একসময় বেসরকারি ছিল। সম্মানীত বিসিএস শিক্ষকরা পায়ের নিচে মাটির দিকে তাকালে তা নিশ্চয়ই অনুভব করবেন। বিসিএস শিক্ষকদের যোগ্যতা অবশ্যই সম্মানের, অনেক মেধা আর পরিশ্রমের পর তারা এ অবস্থানে এসেছেন সবই সত্য। এসব সত্যের বিনিময়ে তারা সরকারের কাছে সিনিয়রিটি (সম্মানসহ) দাবি করতে পারেন, অর্থনৈতিক প্রটেকশন দাবি করতে পারেন কিন্তু নিজের অন্ধ স্বার্থের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্যের পথ রুদ্ধ করতে পারেন না, এটা অনৈতিকতা। এটা মনে রাখতে হবে, একটি গণতান্ত্রিক সরকার তার জনগণকে দেয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পালনের পথকে কোন সরকারি কর্মকর্তা বাধাগ্রস্থ করতে পারেন না, এটা গণতান্ত্রিক এবং সরকারি কর্মকতার আচরণ-বিধির পরিপন্থী।
প্রথমে সরাসরি সরকারিকরণে বাধা, পরে সেটাকে ক্যাডারের মোড়কে (যদিও এটা এখন আইনি প্রক্রিয়ায় চলে গেছে)বাধা, সবই সরকারের কর্মপরিকল্পনায় প্রতিবন্ধকতা। এগুলো কাম্য নয়। বিষয়টিকে যদি সচেতন ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় তবে কিছু সমাধান হয়তো নৈতিকভাবেই চলে আসে।
প্রথমত, সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রায় তিনশত (২৮৩টি) উপজেলায় একটি স্কুল ও একটি কলেজ (প্রায় ছয়শত) সরকারিভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণ করা কতটা সম্ভব? নিশ্চয়ই সময় সাপেক্ষ? ততদিনে জনগণকে দেয়া সরকারের প্রতিশ্রুতির কী হবে? আবার যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ করাই হয় তবে এতগুলো স্কুল-কলেজে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার এতবড় কর্মযজ্ঞ কিভাবে হবে? তাছাড়া এরজন্য যে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন তার যোগান কিভাবে হবে?
দ্বিতীয়ত. আপনারা নিশ্চয়ই জানেন সরকারি কলেজ পর্যায়ে নন-ক্যাডার বলে কোন পদ নেই। যদি নির্বাচিত কলেজগুলোর পদগুলো নন-ক্যাডার করা হয় তবে এসব কলেজে ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডারভূক্ত শিক্ষকরা কি পদায়ণ হবেন না? যদি না হয় তবে কলেজ শিক্ষায় আরেকটি নতুন ধারা তৈরি হবে যা শিক্ষানীতির পরিপন্থী। আর যদি হতে হয় তবে, কিভাবে একটা নন-ক্যাডার পদে একটি ক্যাডার পদের শিক্ষক যুক্ত হবেন? এসব নন-ক্যাডার পদে ভবিষ্যতে নিয়োগ প্রক্রিয়াটা কিভাবে হবে? আবার যদি একই কলেজে ক্যাডার, নন-ক্যাডার দু’ধরনের পদ সৃষ্টি হয় তখন ক্যাডার এবং নন-ক্যাডারের একটি অদৃশ্য দ্বন্দ্ব কি হবে না? তখন একজন নন-ক্যাডারের পাশের চেয়ারে বসতে ক্যাডারদের তো আত্মসম্মানে লাগার কথা? নাকি ক্যাডারদের জন্য আলাদা বসার জায়গা তৈরির দাবি উঠবে? আত্তীকৃতরা নন-ক্যাডার হলে এসব কলেজের প্রিন্সিপালও নন-ক্যাডার হবেন তখন ক্যাডার হয়ে একজন নন-ক্যাডারে অধীনে চাকরি করতে ক্যাডারদের তথাকথিক অহঙ্কারে লাগবে না? বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
আসলে শিক্ষায় ক্যাডার তথাকথিত অহংকার, নাক সিটকানো মনোভাব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিতর্কিত এবং জটিল করে দেয়। যেখানে প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা হবে একধারার, সেখানে নতুন করে কলেজ পর্যায়ে দ্বৈত শিক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টির পায়তারা একটি জটিল সমস্যার সৃষ্টি করবে। বৈষম্য তৈরি করার অধিকার জনগণ কাউকে দেয়নি। মনে রাখতে হবে কলেজগুলো সরকারি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব চিন্তা থেকে এর বিরোধিতা করা মানে, প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করা। যা করা হচ্ছে ভেবে করা হচ্ছে তো? নিজেকে ব্রাহ্মণ ভেবে আর সবাইকে নমশূদ্র ভাবার মানসিকতা যত বাদ দেয়া যায় ততই মঙ্গল।
আসলে একটি সার্বজনীন শিক্ষা নীতির আলোকে দেশের কলেজ শিক্ষাকে একটি ধারায় নিয়ে আসা জরুরী। শিক্ষায় কোন বিভাজন না রাখাই শ্রেয়। সে ক্ষেত্রে কতিপয় প্রস্তাবনা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।

এক. শিক্ষায় কোন ক্যাডার থাকবে না। প্রয়োজনে পাবলিক সার্ভিস রুলস পরিবর্তন করে কলেজ পর্যায়ের সমস্ত শিক্ষক পদগুলোকে পূর্বের মতো নন-ক্যাডার ঘোষণা করা হোক। কারণ বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় কোন ক্যাডার পদ নেই, মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে ক্যাডার নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষরাও ক্যাডার নন, তাহলে শুধু কলেজ পর্যায়ে কেন ক্যাডার, নন-ক্যাডারের মতো দুটো ধারা বহমান থাকবে। সুতরাং কলেজ শিক্ষাকে পুরোপুরি নন ক্যাডার করে দেয়া হোক।
দুই. শিক্ষকরা শুধু শিক্ষক, কোন কর্মকর্তা হবেন না। সেক্ষেত্রে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ডিজি, এনসিটিবি, নায়েম, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ক্যাডার শিক্ষকদের সরিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হোক। শিক্ষকদের মধ্যে কোন কর্মকর্তা থাকবে না- শিক্ষক তো শিক্ষাদান করার জন্য, গবেষণা করার জন্য, তিনি কর্মকর্তা হবেন কেন? কর্মকর্তা হবেন প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োজিত কর্মকর্তারা।
শেষ করার আগে সম্মানীত শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের স্মরণ করাতে চাই- পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আটাশটা ক্যাডারের মধ্যে সাধারণভাবে সর্বশেষ পছন্দের (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) ক্যাডারটা কিন্তু শিক্ষা ক্যাডার। যারা উপরের ক্যাডারগুলোতে যোগ্য বিবেচিত হন না সাধারণভাবে তারাই শিক্ষা ক্যাডারের জন্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ক্যাডার নিয়েই যাদের এত অহংকার তারা প্রশাসন, পররাষ্ট্রের মতো ক্যাডার পেলে কী করতেন ভেবেছেন? তাই শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন, অহংকার দূর করতে শিক্ষকতায় কোন ক্যাডার পদ পরিহার করাই হবে যুক্তিযুক্ত। শিক্ষকরা শুধু শিক্ষক হবেন ক্যাডার বা কর্মকর্তা নয়।
বিষয়গুলোকে এভাবে ব্যাখা করলে অনেকের কাছেই হয়তো ভালো লাগবে না। কারণ বিতর্ক তৈরি করার মধ্যে কোন মৌলিকত্ব বা কৃতিত্ব নেই। এতে বিভাজন বাড়ে- যা কারো কাম্য নয়। তাই নিজেকে ব্রাহ্মণ ভেবে আর সবাইকে নমশূদ্র ভাবার জঘন্য মানসিকতা যত বাদ দেয়া যায় ততই মঙ্গল।

লেখক: গবেষক,প্রাবন্ধিক
শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, মুড়াপাড়া কলেজ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন]

পাঠকের মন্তব্য দেখুন
চতুর্দশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ২০ হাজার - dainik shiksha চতুর্দশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ২০ হাজার ১০১০ শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha ১০১০ শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষা ২৭ জুন - dainik shiksha ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষা ২৭ জুন প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১১ মে - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১১ মে প্রাথমিকে আরও আট হাজার শিক্ষক নিয়োগ শিগগিরই - dainik shiksha প্রাথমিকে আরও আট হাজার শিক্ষক নিয়োগ শিগগিরই এসএসসির ফল প্রকাশ ৬ মে - dainik shiksha এসএসসির ফল প্রকাশ ৬ মে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান পরীক্ষা স্থগিত - dainik shiksha গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান পরীক্ষা স্থগিত please click here to view dainikshiksha website Execution time: 0.0076620578765869