শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য মনোবিজ্ঞানী : প্রাক্তন ক্যাডেটের মিশ্র চিন্তা - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য মনোবিজ্ঞানী : প্রাক্তন ক্যাডেটের মিশ্র চিন্তা

ইকরাম কবীর |

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ফলের দিক থেকে এখনও ক্যাডেট কলেজগুলো প্রথম সারিতে থাকে। সত্তরের দশকে ক্যাডেট কলেজগুলোই ছিল সবচেয়ে এগিয়ে। তখন এমন কোনো মাতা-পিতা ছিলেন না, যারা সন্তানদের ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করানোর কথা ভাবেননি। এখন অবশ্য আমাদের জাতীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেকেই ছেলেমেয়েদের এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াতে চান না।

অনেক দশক ধরেই এই কলেজগুলো সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষ পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, চৌকস সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা এবং সফল ব্যবসায়ী তৈরি করেছে। যদিও আমাদের হাতে কোনো সমীক্ষা নেই, তবুও ধারণা করা যায়, প্রাক্তন ক্যাডেটরা অন্যদের চেয়ে জাগতিক দৌড়ে অনেকটা বেশি সফল।

হাঁ, দৌড়ই। ক্যাডেটদের শেখানো হয়, কেমন করে যে কোনো দৌড়ে জিততে হয়। সব সময়ই প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে হবে এমন এক মানস তাদের মধ্যে রোপণ করা হয়। ক্যাডেট কলেজগুলো প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সামরিক বাহিনীতে সাহসী, মেধাবী ও কৌশলী ছেলেমেয়েদের জোগান দেওয়ার জন্য। কিন্তু বেশিরভাগ ক্যাডেটই সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন না। বড় অংশটি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ী হন। সে কারণে যে দেশের ক্ষতি হয়েছে তাও নয়। হাজার হাজার দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হয়েছে।

ক্যাডেটরা সাধারণত তাদের কলেজের স্মৃতি আঁকড়ে সারাজীবন কাটিয়ে দেন। নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন। কারণ তাদের প্রতিষ্ঠান তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে শিখিয়ে দেয়। তবে ক্যাডেট কলেজ নিয়ে আমার কিছু মিশ্র চিন্তা আছে। বলি তাহলে।

বারো বছরের এক বালক বা বালিকা, মাতা-পিতাকে ছেড়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করতে দূরে চলে যাচ্ছে। তাদের জীবন খুব যে সহজ হবে, তা আশা করা যায় না। তাদের প্রতিষ্ঠানের কাজই হচ্ছে এই ছোট্ট বাচ্চাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে এতই শক্তিশালী করা, যেন তারা চলার পথে সব ঘাত-প্রতিঘাত উতরে যেতে পারে। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে।

কোনো প্রতিষ্ঠানের নীতি এমন হতেই পারে। তবে তিনশ ছেলে বা মেয়ের শরীরের রসায়ন ও মনের বিস্তার এক নয়। কেউ বেশি পড়ে, কেউ কম। কারও শরীরে অনেক শক্তি, কারও কম। কারও আগ্রহ বেশি, কারও কম। কেউ অনেক পারে, কেউ কম পারে। দুষ্টুমিই বারো বছর বয়েসের ধর্ম। তো দুষ্টুমি করলেই যদি একজন ছেলে বা মেয়ে 'খারাপ ক্যাডেট' বলে পরিগণিত হয়, তাহলে বাকি কলেজ জীবন কেমন কাটবে? তখন সে স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা থেকে বঞ্চিত হয়। তারপর পুরো ছ'বছর 'ভালো' হওয়ার চেষ্টা করলেও একজন 'খারাপ' ছেলে বা মেয়ে সহজে 'ভালো' হতে পারে না।

এই প্রক্রিয়া একজন শিশুকে মানসিক নিগ্রহের দিকে ঠেলে দেয় কিনা চিন্তা করে দেখা যেতে পারে। এই শিশুরা এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করতে গিয়ে অনেক কষ্টের মুখোমুখি হয়। না বলা অনেক কথা থাকে। শোনার মতো কেউ থাকেন না। কেউ তাদের না বলা কথাটি শুনলেই কিন্তু কষ্ট অনেকটা দূর হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ যদি ক্যাডেট কলেজগুলোতে কয়েকজন মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দিত, তাহলে শিশুগুলোর ভবিষ্যতের চলার পথ অনেকটা সহজ হতো।

শুধু ক্যাডেটরা নন, পঁচিশ-ত্রিশজন শিক্ষক যারা তিনশ ছেলেমেয়েকে শিক্ষা দিচ্ছেন, তাদেরও মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলা বাঞ্ছনীয়। ক্যাডেটদের যারা শিক্ষা দেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ওই কলেজগুলোতে কাজ শুরু করেন। বারো থেকে আঠারো বছর বয়সের শিশু-তরুণদের মনের ভেতর কী আনাগোনা করছে, তা চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সের শিক্ষকরা কেমন করে বুঝবেন?

ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করা ছেলেমেয়েদের দেখেছি স্বাস্থ্যজনিত কারণে অনেক ভুগতে। এই ছেলেমেয়েগুলো মনে করেন, তারা ছ'বছর অনেক শরীরচর্চা করে এসেছেন যা দিয়ে সারাজীবন চলবে। এমন চিন্তা করলে ভুল হবে। শরীরচর্চা ছেড়ে দিলেই আমাদের শরীর জীবাণুর লক্ষ্যে পরিণত হয়। তারা যে শরীরচর্চা করেন, তার সঙ্গে যদি যোগ ব্যায়াম শেখানোর কোনো ব্যবস্থা থাকত, তাহলে তাদের চর্চাটি দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই হতো।

যোগ হচ্ছে এমন ব্যায়াম যা মানসিক কারণে শারীরিক ব্যাধিগুলোকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। মনের সঙ্গে শরীরের এক সেতু তৈরি করে। অন্যান্য ব্যায়াম তা পারে না এবং সে কারণেই যোগ টেকসই হয়। কেউ যদি বুঝতে পারেন, যোগ মানুষকে কতটা সাহায্য করে, তাহলে সেই ব্যক্তি যোগকে ভালোবেসে ফেলবেন এবং সারাজীবন চর্চার মাঝেই থাকবেন। আমার মনে হয়, ক্যাডেট কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভাবতে পারে।

আমি এবং আমার আরও একান্ন জন সহপাঠী এক ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম। এই বায়ান্ন জনের মধ্যে তেইশ জন মিলিটারি একাডেমি ও মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হয়ে গেল। আমরা পরীক্ষা দিয়েই বুঝতে পেরেছিলাম যে পরীক্ষায় প্রশ্ন অত্যন্ত কঠিন হয়েছে এবং সবার ফল আশানুরূপ হবে না। আমাদের অনেক বন্ধু তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, তারা সামরিক বাহিনীতে যোগ দেবে। পরীক্ষা দিয়ে তৃপ্তি পেলে তারা আসলে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিত না।

আমরা যারা কখনোই সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চাইনি, তাদের স্বপ্ন ও ইচ্ছা ছিল চিকিৎসক ও প্রকৌশলী হবো। না হলে বিদেশে চলে যাবে অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডে পড়বে। কলেজের চার দেয়ালের মধ্যে ছ'বছর বসবাস করে বাইরের বিশ্বের বাস্তবতা নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। ক্যাডেট কলেজের বাইরের জীবন নিয়ে আমরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছিলাম, কিন্তু সে জীবন নিয়ে আমাদের সঠিক জ্ঞান ছিল না।

বাইরের পৃথবীটা কেমন কেউ আমাদের কখনও বলেননি। সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে আমাদের কিছুটা ধারণা ছিল, আমরা কে কোন পেশায় যোগ দিতে যাচ্ছি, তা নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না। মাতা-পিতা থাকেন দূরে। তারা জানেনও না যে, তাদের সন্তান কী চিন্তা করছে। কোনো শিক্ষক কখনও আমাদের কাছে জানতে চাননি তাদের ছাত্ররা জীবনে কে কী হতে চায়। তারা সব সময় বলেছেন, 'পড়াশোনা করলে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।'

একজন ক্যাডেটকে দুই জীবন সম্পর্কেই ধারণা দিতে হবে। এমনটা মনে করা ঠিক হবে না যে, ক্যাডেটরা সবাই মেধাবী এবং তারা সব বুঝে নিতে পারবে। তাদের বয়স সতেরো-আঠারো। এসব বুঝতে পারার সময় তখন নয়।

ইদানীং শুনছি এসব কলেজের প্রাক্তন ক্যাডেটদের সংগঠনগুলো তাদের নিজ নিজ কলেজে গিয়ে এসব জ্ঞান ক্যাডেটদের দিচ্ছেন, শেখাচ্ছেন। তাদের ধন্যবাদ জানাই।

লেখক : ইকরাম কবীর, গল্পকার যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করবেন যেভাবে স্কুল শিক্ষার্থীদের প্রমোশন: সরকারের সিদ্ধান্ত জানা যাবে কাল - dainik shiksha স্কুল শিক্ষার্থীদের প্রমোশন: সরকারের সিদ্ধান্ত জানা যাবে কাল প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের আবেদন শুরু ২৫ অক্টোবর - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের আবেদন শুরু ২৫ অক্টোবর অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত বাতিল চায় ছাত্র ফ্রন্ট - dainik shiksha অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত বাতিল চায় ছাত্র ফ্রন্ট দাখিলের রেজিস্ট্রেশন নবায়ন শুরু - dainik shiksha দাখিলের রেজিস্ট্রেশন নবায়ন শুরু প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা: আদালতে শিক্ষা ভবনের কর্মকর্তা - dainik shiksha প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা: আদালতে শিক্ষা ভবনের কর্মকর্তা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নতুন ডিজি মনসুরুল আলম - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নতুন ডিজি মনসুরুল আলম উচ্চমাধ্যমিকের উপবৃত্তি পেতে শিক্ষার্থীদের বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় বাড়লো - dainik shiksha উচ্চমাধ্যমিকের উপবৃত্তি পেতে শিক্ষার্থীদের বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় বাড়লো ইএফটির মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন দিতে কাজ চলছে - dainik shiksha ইএফটির মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন দিতে কাজ চলছে please click here to view dainikshiksha website