শিক্ষকদের বিদায় সংবর্ধনায় পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রধান অতিথি করা কতটা যৌক্তিক? - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

শিক্ষকদের বিদায় সংবর্ধনায় পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রধান অতিথি করা কতটা যৌক্তিক?

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

এক সময় কবিতার বই পড়তাম। কলেজে পড়তে গিয়ে নিজেও কবিতা লিখেছি। কবিতা লেখার আলাদা একটি ডায়েরি ছিল। সে ডায়েরিতে বহু কবিতা লিখেছি। দ্রোহ-বিদ্রোহ ও  প্রেম-বিরহের কবিতা। অভ্যাসটি কেন জানি এখন আর নেই। ডায়েরিটিও আজ আর খুঁজে পাই না। এর নানা কারণ থাকতে পারে। এদের মধ্যে ‘বয়স’ একটি ফ্যাক্টর। একেক বয়সে একেক জিনিস ভালো লাগে। কৈশোর ও যৌবনের দুরন্ত দিনগুলোতে কবিতা যেমন ভালো লাগে, অন্য বয়সে তেমন লাগে না। অন্তত আমার কাছে সেটি মনে হয়। এ জন্য এখন আর কবিতা পড়া হয় না।

গত সপ্তাহে এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনজন শিক্ষকের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। পুলিশ সুপারকে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল। খুব ভালো মানুষ। সৎ ও জনবান্ধব অফিসার। যোগদানের পর পুরো জেলার পুলিশকে জনতার করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তার কারণে দিনে দিনে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বেড়ে চলেছে। দেশের সব পুলিশ সুপার তার মতো হলে দেশটা এতদিনে স্বর্গ হয়ে যেত। ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার’-স্লোগানটি ষোল আনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো। কেবল স্লোগানে আটকে থাকার কোনো আশঙ্কা থাকত না। এ রকম সজ্জন জনবান্ধব পুলিশ অফিসারকে সবাই ভালবাসে। কিন্তু আমার কথাটি এখানে নয়। অন্য জায়গায়। আমার কথা হলো- শিক্ষকদের বিদায় সংবর্ধনায় পুলিশ অফিসারকে প্রধান অতিথি করার কী দরকার ছিল?

পুলিশ অফিসারকে প্রধান অতিথি করার কারণে বিদায়ী শিক্ষকদের কতটুকু সম্মান জানানো গেছে? এরকম একটি প্রশ্ন মনের ভেতর কয়েকদিন ঘুরপাক খেয়েছে। একজন শিক্ষাবিদ কিংবা কবি-সাহিত্যিককে বা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তাকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করে বিদায়ী শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা যেত। আয়োজকদের নিন্দা বা কুৎসা করি না। আসলে ট্র্যাডিশনটা এমন হয়ে যাচ্ছে। হয়ে যাচ্ছে বলি কেন, প্রায় এমনটা হয়েই গেছে। আজকাল শিক্ষকদের চেয়ে পুলিশ কিংবা সামান্য রাজনীতিকদের অধিকতর সম্মানীয় মনে করা হয়। কোনো কোনো জায়গায় দেখি, শিক্ষকদের চেয়ে চেয়ারম্যান মেম্বারদের বেশি আদর-কদর করা হয়। ক্ষমতাসীন দলের পাতি নেতা পর্যন্ত শিক্ষকের চেয়ে বেশি প্রটোকল পেয়ে যায়। এ থেকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়টি সহজে অনুমান করে নিতে পারি। মুখে অনেকে শিক্ষকদের নানাভাবে বন্দনা করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই।

সেদিনের প্রধান অতিথি বিশেষ কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। অন্যতম বিশেষ অতিথি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে প্রধান অতিথির চেয়ারটি অলংকৃত করতে হয়েছে। তিনি তার বক্তৃতাটি কবি কাদের নেওয়াজের কালজয়ী কবিতা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ আবৃত্তির মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। বেশ দরদ দিয়ে কবিতাটি আবৃত্তি করেন। বক্তৃতা তেমন দেননি। কবিতা আবৃত্তি করে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা নিয়ে আবেগ তাড়িত দু’ চারটে কথা বলেন। ব্যস্ততা থাকার কারণে অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই চলে যান। তার কবিতা আবৃত্তি ও বক্তৃতা অনেককে আবেগাপ্লুত করেছে।

অনুষ্ঠানটি দীর্ঘক্ষণ চলেছে। শেষ হতে সন্ধ্যা গড়িয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গকে মঞ্চে উঠাতে হয়েছে। যে সকল শিক্ষককে সংবর্ধনা দেয়া হয়, তাদের একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান ছিলেন। অন্য দু’ জন সহকারী। যিনি প্রধান ছিলেন, কেবল তাকে মঞ্চের প্রথম সারিতে কোনো রকমে বসানো গেছে। তাও মাঝখানে নয়। এক পাশে। অন্য দু’ জন পেছনের সারিতে। তাদের ছাত্রতুল্য অনেককে মঞ্চের প্রথম সারিতে বসাতে হয়েছে। এদের কেউ চেয়ারম্যান, কেউ সাংবাদিক, কেউ স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিক ইত্যাদি ইত্যাদি। থানায় এখন দু’ জন ওসি। একজন ওসি ( তদন্ত), তিনিও মঞ্চে। এদের কারণে মঞ্চ ভারি হয়েছে। বক্তৃতা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। মঞ্চে এদের মাল্য দিয়ে বরণ করতে কত জনে হুড়মুড়ি খেয়েছে। সংবর্ধিত শিক্ষকদের সকলের শেষে বক্তৃতা করতে দিয়ে তাদের প্রতি এক ধরনের সম্মান দেখানো হয়েছে বটে। কিন্তু তত সময়ে বক্তৃতা শোনার ধৈর্য কারো বাকি থাকেনি। তারাও ততক্ষণে কিছু বলার খেই হারিয়ে ফেলেন।

সেদিনের অনুষ্ঠানটিতে কাউকে অতিথি করার প্রয়োজন ছিল না। বিদায়ী শিক্ষকরাই ছিলেন সে অনুষ্ঠানের মধ্যমনি। অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে তাদের উপস্থাপন করাটা যথার্থ হতে পারতো। সেদিনের অনুষ্ঠানটিতে অন্য কারো বক্তৃতা দেবার প্রয়োজন ছিল না। কেবল বিদায়ী শিক্ষকদের বক্তৃতা দেবার সুযোগ করে দিয়ে সকলে বসে বসে তাদের কথা শুনতে পারতেন। জীবনভিত্তিক ও অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ অনেক কথা তাদের কাছে শুনতে পারা যেত। এভাবে তাদের প্রতি সম্মান জানানো যেত। তাদের সংবর্ধনা দেয়া যেত। তাদের মূল্যায়ন করা যেত। আজকাল এভাবে করা হয় না। ইদানিং শিক্ষক যেন অপয়া মানুষ। শিক্ষকদের সম্মান করা বাপ দাদার ঐতিহ্য মনে করে অনেকে তাদের সম্মান করে। পথে-ঘাটে দেখা হলে ‘সালাম আলকি’ দেয়। এই যা আর কি! এ আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ নয়, রূঢ় বাস্তবতা।

সারাদেশে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা চলছে। বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার হলে ও বাইরে শিক্ষকেরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ পরীক্ষার্থীদের হাতে শারীরিকভাবে অপদস্ত হচ্ছেন। আবার দায়িত্বে অবহেলা দেখিয়ে কোনো কোনো শিক্ষককে বহিষ্কার করা হচ্ছে। জেলে দেয়া হচ্ছে। পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষকদের দু’ দিকে বিপদ। পরীক্ষার হলে যথানিয়মে ডিউটি করলে পরীক্ষার্থীরা ক্ষেপে যায়। ভেতরে কিংবা বাইরে গিয়ে শিক্ষককে অপমান করে। আবার একটু লুজ দিলে শিক্ষক বহিষ্কার হন কিংবা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাস্তি পান। তারা যাবেন কোন দিকে? কুল রাখবেন না শ্যাম রাখবেন?  দুটোই রাখা দায় হয়ে পড়েছে। এ কারণে বলি, পরীক্ষা পদ্ধতির এমন একটি সংস্কার প্রয়োজন যাতে পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, নকল, শিক্ষকের অপমান ইত্যাদি কোনো কিছুর অবকাশ না থাকে। এমন একটি পথ আমরা খুঁজে বের করি, যাতে ফল জালিয়াতির কোনো সুযোগ না থাকে। টাকা খেয়ে জিপিএ বিক্রি করা না যায়।

মুজিববর্ষ ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। শিক্ষক সমাজকে কেবল মুখের কথায় আর কাব্যের অলংকারে নয়, সত্যিকারের মান-মর্যাদা দেবার উপযুক্ত সময় এখন। কথায় যেমন চিড়ে ভিজে না, তেমনি কাব্যের ঝঙ্কারে পেট ভরে না। তাই কেবল কবিতায় কিংবা বক্তৃতায় নয়, শিক্ষক সমাজকে সত্যিকার অর্থে মর্যাদার আসনে বসিয়ে জাতিকে সম্মানিত করার প্রয়াস চালাতে হবে। তাদের পদে পদে লাঞ্ছিত করে আর যাই হউক, জাতি কোনোদিন সভ্য হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারে না। কেবল মুখের বুলি আর কবিতার পংক্তি দিয়ে শিক্ষকদের তুষ্ট করার দিন এখন আর নেই।

লেখক : অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট এবং দৈনিক শিক্ষার সংবাদ বিশ্লেষক।

একাদশে ভর্তির আবেদন শুধুই অনলাইনে, শুরু ১০ মে - dainik shiksha একাদশে ভর্তির আবেদন শুধুই অনলাইনে, শুরু ১০ মে আগামী বাজেট : শিক্ষা খাত পাচ্ছে সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা - dainik shiksha আগামী বাজেট : শিক্ষা খাত পাচ্ছে সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা হবে চারটি পৃথক গুচ্ছে - dainik shiksha বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা হবে চারটি পৃথক গুচ্ছে স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের ফেব্রুয়ারির এমপিওর চেক ছাড় - dainik shiksha স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের ফেব্রুয়ারির এমপিওর চেক ছাড় জেডিসিতে বৃত্তিপ্রাপ্ত ৯ হাজার শিক্ষার্থীর তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha জেডিসিতে বৃত্তিপ্রাপ্ত ৯ হাজার শিক্ষার্থীর তালিকা প্রকাশ ঢাকা ‍ও সিটি কলেজ ছাত্রদের সংঘর্ষ, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে : শিক্ষা উপমন্ত্রী - dainik shiksha ঢাকা ‍ও সিটি কলেজ ছাত্রদের সংঘর্ষ, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে : শিক্ষা উপমন্ত্রী ইবতেদায়ি বৃত্তি পাওয়া সাড়ে ২২ হাজার শিক্ষার্থীর তালিকা - dainik shiksha ইবতেদায়ি বৃত্তি পাওয়া সাড়ে ২২ হাজার শিক্ষার্থীর তালিকা ব্যাংক বন্ধ হলেও আমানতের পুরো টাকা পাওয়া যাবে : কেন্দ্রীয় ব্যাংক - dainik shiksha ব্যাংক বন্ধ হলেও আমানতের পুরো টাকা পাওয়া যাবে : কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএসসি পর্যন্ত বিভাগ বিভাজনের দরকার নেই : প্রধানমন্ত্রী - dainik shiksha এসএসসি পর্যন্ত বিভাগ বিভাজনের দরকার নেই : প্রধানমন্ত্রী ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমে সুদ ফের ১১ দশমিক ২৮, বাস্তবায়ন ১৭ মার্চ থেকে - dainik shiksha ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমে সুদ ফের ১১ দশমিক ২৮, বাস্তবায়ন ১৭ মার্চ থেকে মাস্টার্স শেষ পর্ব পরীক্ষা শুরু ২৮ মার্চ - dainik shiksha মাস্টার্স শেষ পর্ব পরীক্ষা শুরু ২৮ মার্চ করোনা ভাইরাস : প্রাথমিক স্কুলে সচেতনতা বৃদ্ধির নির্দেশ - dainik shiksha করোনা ভাইরাস : প্রাথমিক স্কুলে সচেতনতা বৃদ্ধির নির্দেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষার আসল ফেসবুক পেজে লাইক দিন শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন please click here to view dainikshiksha website