শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সুশাসন ও উন্নয়ন - মতামত - Dainikshiksha

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সুশাসন ও উন্নয়ন

মো. মইনুল ইসলাম |

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশবাসীকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। ছুটি-বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে যেভাবে তারা রাস্তায় নেমে এসেছে এবং যাদের অনেকেই কিশোর-কিশোরী, তার কারণ ও সমাধানের ব্যাপারে সরকারকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে এবং দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেল, লক্ষাধিক বাস-ট্রাকের ফিটনেস সনদ নেই। ১৬ লাখ গাড়িচালকের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিক সমিতিগুলোকে ম্যানেজ করেই চলছে এসব গাড়ি (যুগান্তর ৩-৮-১৮)। ম্যানেজ করা মানে ঘুষ প্রদান। বলার অপেক্ষা রাখে না, দুর্নীতি এবং অদক্ষতার সনদ হচ্ছে সড়ক অব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনা। সড়কে দুর্ঘটনা এবং বহু মানুষের প্রাণ হারানোর খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে পাওয়া যায়। এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়া এবং দেশব্যাপী দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, মানুষের হয়রানি এবং মৃত্যুর খবর তরুণ শিক্ষার্থীদের অজানা নয়। এরই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যে এই আন্দোলন, তা সরকারি এবং বেসরকারি মহল থেকে স্বীকার করা হচ্ছে। ফার্মগেটে আমার গাড়ি আটকিয়ে এক তরুণ বলল, ‘বঙ্গবন্ধুই আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের কথা বলে গেছেন’, বৃষ্টিতে অনবরত ভিজতে ছিল ছেলেটি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মতো বড় ধরনের না হলেও কিছুদিন আগে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা চুরির ঘটনাটিও প্রসঙ্গক্রমে কিছুটা আলোচনা করতে হয়। এই লুটপাটের জন্য খনিটির ১৯ পদস্থ কর্মকর্তা দায়ী বলে অভিযোগ, যার মধ্যে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সাবেক কয়েকজন প্রধান নির্বাহীও আছে। দেখা যাচ্ছে, এই কয়লা চুরি দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কয়লা মজুদ এখন তলানিতে ঠেকায় এবং নিকটবর্তী বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে। এ ঘটনায় শুধু দুর্নীতির ব্যাপকতাই ফুটে ওঠেনি, তাতে ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়ও ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে একজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, যার বিরুদ্ধে এ ব্যাপারে অভিযোগ আছে, তাকে হজব্রত পালনের জন্য ৪২ দিনের ছুটি দেয়া হয়েছে। টঙ্গি এসি ল্যান্ডের অফিসে একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাও ছুটি নিয়ে হজ পালন করতে গেছেন। ওই অফিসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ তদন্ত করতে এসে একদল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘ঘুষের টাকায় হজ হয় কিনা?’ দেশে এখন এই দুর্নীতিবাজদেরই বেশি বেশি হজ এবং কোরবানির ঈদে বড় বড় গরু কোরবানি এবং রোজার ঈদে বেশি জাকাত দিতে দেখা যায়।

কিছুদিন আগে একটি দৈনিকে দেখা গেল, শিক্ষকদের এমপিও বা Monthly Pay Order ভুক্তির ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দফতরের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষের ছড়াছড়ি। এ ব্যাপারে একজন প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য প্রতিবাদ জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু এই ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপারটি এত ব্যাপক যে, সরকারের এমন অফিস খুব কমই পাওয়া যাবে- যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ পাওয়া যায়। শুধু কোটা সংস্কারের ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলাই সন্ত্রাস নয়। ঘুষ-দুর্নীতিও এক ধরনের সন্ত্রাস, যা শারীরিকভাবে আহত করে না; তবে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মানুষ

যে হেনস্তার শিকার হয়, তাকে নীরব সন্ত্রাস না বলে পারা যায় না।

এই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের পটভূমিতে শিক্ষার্থীদের বর্তমান আন্দোলনকে বিচার করলে দেখা যাবে, এটা সরকারি প্রশাসনের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে এটা সুশাসন প্রতিষ্ঠারও দাবি। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ফিটনেস সার্টিফিকেট যাচাই করার কাজ ছাত্রদের নয়। প্রশাসন বা পুলিশ সেটা যথাযথভাবে এতদিন করেনি বলে তরুণ শিক্ষার্থীরা পথে নেমে এসেছে। এটাও এক ধরনের প্রতিবাদ। এটা স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। স্থায়ী ব্যবস্থা হল সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দক্ষতা, সততা ও দায়িত্বশীলতা। এ ব্যাপারেই এখন সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সুশাসনের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

দেশে সামগ্রিকভাবে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। বিশেষ করে ভৌতিক অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তাছাড়া অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে প্রায় ৭ দশমিকের কাছাকাছি জিডিপি প্রবৃদ্ধি তারই প্রমাণ। বিষয়টি শুধু আমাদের সরকারই দাবি করছে না; বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং জাতিসংঘও তার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ কৃতিত্ব অবশ্যই বর্তমান সরকারের পাওনা। তবে যা আমাদের দুঃখ দেয় তা হল, দুর্নীতির পরাজয় এবং তার সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। দুর্নীতি সৎ মানুষ, সৎ পরিশ্রম এবং সুনীতিকে মূল্যহীন করে তোলে।

এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রতিদিন জীবিকা অর্জনের জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে থাকে। এ পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী শহরের নানা ধরনের শ্রমিক ও কর্মী এবং গ্রামাঞ্চলের কৃষক। এদের একটি অংশ, যাদের অধিকাংশই মহিলা, পোশাক শিল্পে কাজ করে আমাদের জন্য প্রায় ৭৫ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। আরেকটি অংশ যাদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি, মধ্যপ্রাচ্য এবং মালয়েশিয়ায় কাজ করে ১২শ’ কোটি ডলার দেশে পাঠায়। এই শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের শ্রম ও টাকায় সরকার চলে এবং উন্নয়নের রথ এগিয়ে চলেছে। এ উন্নয়নের মাত্রা আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত, যদি দুর্নীতি তা না খেয়ে নিত বা বাধাগ্রস্ত করত।

দেশব্যাপী দুর্নীতির এই দাপট সুশাসনের অভাবই তুলে ধরে। সুশাসন গণতন্ত্রের অন্যতম উপাদান। নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনীতিকদের যতটা আগ্রহ দেখা যায়, সুশাসনের ব্যাপারে ততটা দেখা যায় না। এ ব্যাপারে বর্তমানে বিএনপি বেজায় উচ্চকণ্ঠ। তাদের আমলে সুশাসন দেশ থেকে প্রায় বিদায় নিয়েছিল। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ পর পর ৪ বার বিশ্বের সেরা দুর্নীতিবাজ দেশ বলে পরিচিতি পেয়েছিল। সুশাসনের ব্যাপারে রাজনীতিকদের নীরব থাকার কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলে তাদের সম্পদ অর্জন এবং দক্ষতা প্রদর্শনে অসুবিধা হবে। নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের বিশেষ উৎসাহের কারণ নির্বাচন ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি। সিঁড়িটি বেয়ে ক্ষমতার মসনদে বসে গেলে সিঁড়ির কথা মনে থাকে না। বরং নির্দ্বিধায় পায়ে ঠেলে ফেলে দেয়া যায়।

মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন দারিদ্র্য হ্রাস করে, যা যুগ যুগ ধরে দারিদ্র্যের অভিশাপে জর্জরিত আমাদের মানুষের জীবনে এক পরম আশীর্বাদের সূচনা করে। এর ফলে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অভাব হ্রাস পায়। তবে এর সঙ্গে যদি কাক্সিক্ষত পরিমাণে মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো বৃদ্ধি না পায়, তাহলে সে উন্নয়ন অর্থপূর্ণ হয় না। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে, উন্নয়ন তথা সার্বিক বিকাশ দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি চলমান আছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নটি বেগবান আছে বলা যায়। গত এক দশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও স্বীকৃতি পেয়েছে, যা আগেই বলা হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে, বর্তমান সরকারের বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও অঙ্গীকারবদ্ধতার কারণে। তাই তিনি যখন বলেন, তিনি শুধু পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান এবং প্রতিটি মুহূর্ত দেশের মানুষের চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন, তখন তা বিশ্বাস না করে পারা যায় না। কিন্তু সে ধরনের আন্তরিকতা ও অঙ্গীকার তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকর্মী এবং সরকারি আমলাদের মধ্যে দেখতে পেলে খুশি হতাম। তাহলে দুর্নীতি হ্রাস পেত, সুনীতি ও সুশাসনের প্রসার ঘটত এবং উন্নয়ন আরও বেগবান হতো। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি মহলে যে উল্লাস দেখি, তাতে সাধারণ মানুষের উল্লসিত হওয়ার কারণ নেই। তাদের শাসনকালে ব্যাপক দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার কথা নয়। শুধু বিদ্যুতের অভাব এবং যন্ত্রণার স্মৃতিটি মনে করিয়ে দিলেই যথেষ্ট। এ সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি যে নেই, তা বলব না। তবে তার বিকল্প মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক এবং বিশ্বের সেরা দুর্নীতিবাজ দেশের তকমা উপহার দানকারীরা হতে পারে না। সুশাসন ও উন্নয়নের জন্য সুস্থ আন্দোলনকে স্বাগত। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তিকে ধিক্কার এবং প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া উপায় নেই।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সৌজন্যে: যুগান্তর

দুর্নীতিবাজরা সাবধান হয়ে যান: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha দুর্নীতিবাজরা সাবধান হয়ে যান: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী অর্ধাক্ষর শিক্ষকরা সিকিঅক্ষর শিক্ষার্থী তৈরি করছেন: যতীন সরকার - dainik shiksha অর্ধাক্ষর শিক্ষকরা সিকিঅক্ষর শিক্ষার্থী তৈরি করছেন: যতীন সরকার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে যা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে যা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ১৮১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু - dainik shiksha ১৮১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন ২০ ফেব্রুয়ারি - dainik shiksha স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন ২০ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ - dainik shiksha প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website