শিক্ষার্থীরা শেখাল সামাজিক দায়িত্ববোধ - মতামত - Dainikshiksha

শিক্ষার্থীরা শেখাল সামাজিক দায়িত্ববোধ

মামুনুর রশীদ |

আমাদের অর্থনৈতিক চিত্র ইতিমধ্যে যথেষ্ট পুষ্ট হয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে এবং আমাদের আরও উচ্চাশা রয়েছে। শিল্প-কারখানা বেড়েছে। বেড়েছে উৎপাদন। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটেছে। প্রাইভেট গাড়ি বেড়েছে। মফস্বলে গেলে দেখি 'রেন্ট এ কার'-এর চাহিদাও বেড়েছে। এগুলো খণ্ড খণ্ড দৃষ্টান্ত মাত্র। এসবের মধ্য দিয়ে সামাজিক অগ্রগতির নানারকম চিত্র চোখে পড়ে। কিন্তু এসব কিছুর ভেতর যে ফাঁকটা রয়েছে, এর একটা দিক উন্মোচন করেছে আমাদের শিশু-কিশোররা। মানবিক একটা দাবি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক ফাঁকের একটা ফাঁক উন্মোচন করে তারা সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিল। এই ফাঁকটা নিয়ে অতীতে কথা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু এমনভাবে নাড়া পড়েনি। 

এই শিশু-কিশোরদের ওপর অভিভাবকদের নানারকম চাপ আছে। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের কাছে অভিভাবকদের রয়েছে আরও বহু রকম প্রত্যাশার চাপ। তারা মুক্তভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। তাদের বিনোদনের জন্য, খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত স্থান ও পরিবেশের অভাব রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। শহরে-নগরে এই অভাবটা আরও বেশি। পড়াশোনা আর অভিভাবকদের প্রত্যাশার চাপ পূরণ করতে গিয়ে তারা শৈশব-কৈশোরের মাধুর্য হারিয়ে ফেলছে। আমরা অনেকেই বলি, তারা ফেসবুক আর ট্যাবে নির্ভর হয়ে পড়েছে। কিন্তু না, এবার তারা দেখাল সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গায় তাদের অবস্থান অনেক উঁচুতে। তাদের এই অবস্থান আমাদের দৃষ্টি ফেলেছে নতুন দিগন্তে। তাদেরকে নিয়ে যারা হতাশার কথা শোনান, তারা দেখুন এই শিশু-কিশোররা কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সজাগ। রাষ্ট্রের নানা স্তরে ও খাতে যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে এর একটি মাত্র দিক তারা উন্মোচন করে দেখাল। অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার বিষয়গুলো তারা দায়িত্বশীলদের চোখে আঙুল দিয়ে শেখাল। যেহেতু বোধের জায়গায় তারা এতটা পুষ্ট ছিল, সেহেতু তাদের উচিত ছিল এগুলো শিখিয়ে দেখিয়েই ঘরে ফিরে যাওয়া, ক্লাসে ফিরে যাওয়া। কিন্তু তা না হওয়ার ফলে এখানে অন্য উপাদান ঢুকে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। তারপরও যা হয়েছে তাতে একটা নতুন বোধ জেগেছে। নবজাগরণ ঘটেছে। 

ছোটবেলায় আমাদের কোনো বন্ধুর অকাল প্রাণ বিয়োগ ঘটলে তার প্রতি দরদ দেখাতে, সমবেদনা প্রকাশে বিচ্ছিন্নভাবে হয়তো আমরা যেতাম। কিন্তু প্রজন্মের প্রতিনিধিরা সমবয়সী, সহপাঠীর বিয়োগ যন্ত্রণায় ব্যথিত হয়ে কাতর আক্রান্তে যে সমন্বিত রূপ দেখাল প্রথমে রাজধানীতে, পরে ক্রমান্বয়ে প্রায় সারাদেশে, এই বিষয়টি নানাভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের দাবি রাখে। যে মর্মন্তুদ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে শিশু-কিশোরদের আন্দোলন জনসমর্থন লাভ করে, এর প্রেক্ষাপট বিস্তৃত। মানুষ কষ্ট-দুর্ভোগ সয়েছে; কিন্তু সমর্থন জানিয়েছে। তবে সমস্যাটা হয়েছে অন্য জায়গায়। শিশু-কিশোরদের আবেগ ও দাবির যৌক্তিক প্রেক্ষাপট হীনস্বার্থবাদী-সুযোগসন্ধানীরা তাদের মতো করে কাজে লাগাতে তৎপর হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। যা হোক, শেষ পর্যন্ত বড় কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঠেকানো গেছে। তবে এ থেকে দায়িত্বশীল সব মহলকে শিক্ষা নিতে হবে। স্বতঃস্ম্ফূর্ত কিংবা নেতৃত্বহীন, অসংগঠিত আন্দোলনের অভিনব প্রতিবাদে রূপরেখা কিংবা পথনির্দেশনা মিলে বটে, কখনও কখনও আশারও সঞ্চার হয় আবার তা অন্যদিকে বাঁক নেওয়ার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নানারকম গুজবও ছড়াতে থাকে। উদ্বেগ-অনিশ্চয়তাবোধ তাড়া করে, রাজনীতির হীন কূটকৌশল যুক্ত হয়ে পড়ে এবং এ ক্ষেত্রেও এর আলামত দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছিল।

যে বিষয়টি নিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি এ নিয়ে এই পর্যন্ত লেখালেখি আমিও কম করিনি। যখন শিশু-কিশোররা এবার বিষয়টি সামনে নিয়ে এলো অনাকাঙ্ক্ষিত চরম মর্মন্তুদ প্রেক্ষাপটে, তখন সঙ্গতই তা ব্যাপক জনসমর্থন পেল। তারা একটা বিপ্লব ঘটিয়ে দিল কয়েক দিনে। তাদের পথে নামার কারণটি নিঃসন্দেহে বীভৎস এবং এমন মমর্ন্তুদ ঘটনা দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। এই খাতটি ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণহীন চক্র। এ খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থা, দুর্নীতির মাত্রা কতটা প্রকট রূপ নিয়েছে এবং এর স্তরে স্তরে কী রকম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে, এর একটি দৃষ্টান্ত দিই। পত্রিকায় দেখলাম, গত পরশু ঢাকার পথে শিক্ষার্থীরা একটি গাড়ি আটকিয়ে চালকের কাছে প্রথমে তার লাইসেন্স চাইল। উত্তর পেল, নেই। তারপর গাড়ির কাগজপত্র চাইল। উত্তর পেল, নেই। তারপর গাড়ির চাবি চাইল। উত্তর পেল, নেই। বিস্ময়ের সঙ্গে তারা জিজ্ঞেস করল, তাহলে গাড়ি চালাচ্ছেন কী করে? চালকের আসনে বসা ব্যক্তির উত্তর নেগেটিভ-পজেটিভ মিলিয়ে! কী বিস্ময়কর!

গত কয়েকদিন যারা অর্থাৎ যে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির, চালকের কাগজপত্র দেখতে চাইল, লেন মেনে চলতে নির্দেশ দিল, তাদের তো এসব করার কথা ছিল না। সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে, স্ম্ফীত হয়ে ওঠা বিশৃঙ্খলার কারণে আস্থাহীনতার জন্য এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। এ আস্থাহীনতা তো কোনো শুভ লক্ষণ নয়। শিক্ষার্থীরা এবার স্পষ্ট করেই অনেক বার্তা দিয়ে দিল। তারা একটি খাতের অনিয়ম-অস্বচ্ছতা তুলে ধরে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিরাপদ সড়কের দাবি জানিয়েছে, যার সঙ্গে সচেতন শুভবোধসম্পন্ন কারোরই কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এমন দুর্নীতিগ্রস্ত, অনিয়মে জরাজীর্ণ খাত আমাদের আরও রয়েছে। যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এর অন্যতম। এই দুটি খাত সম্পর্কে দ্রুত সজাগ ও যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এমন বিস্ম্ফোরণ ঘটে যেতে পারে। এই দুটি খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি-বিশৃঙ্খলা নিয়েও অসংখ্য ভুক্তভোগীর নানারকম ক্ষোভের আওয়াজ ইতিমধ্যে কম শোনা যায়নি।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে অনেক বিষয়ের দিকে গুরুত্বের সঙ্গে দৃষ্টি দিতে হবে। চালকদের পড়াশোনার বিষয়টি যেমন গুরুত্ববহ, তেমনি গুরুত্ববহ প্রশিক্ষণের বিষয়টিও। বৈধ লাইলেন্সপ্রাপ্তির সবগুলো শর্ত পূরণ তো অবশ্যই অত্যাবশ্যকীয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্নিষ্ট প্রত্যকটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল প্রত্যেকের স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতেই হবে। এও মনে রাখতে হবে, চালকদের কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই। তাদের বিশ্রাম-অবকাশের ব্যবস্থা নেই। তার জীবনাচরণে অনেক ক্ষেত্রেই নেই শৃঙ্খলা। এর পাশাপাশি সড়ক-মহাসড়কে বহুবিধ ত্রুটি তো রয়েছেই। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আমাদের দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এটাকে পার্থক্য না বলে আমাদের সাংঘাতিক ত্রুটি বলাই সমীচীন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও অনেক উন্নত। আমাদের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা এ থেকে পাঠ নিয়ে এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। আমাদের এখানে কী হাস্যকর চিত্র চোখে পড়ে। সবুজ বাতিতে গাড়ি থেমে থাকে, লাল বাতিতে গাড়ি চলে। শিশুরা গাড়িতে বসে এই ভুল বার্তা দেখে কী শিখছে?

আমাদের ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা অনেক কথা বলে দিয়েছে। আমরা বয়স্করা অনিয়ম-অনাচারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আর ওরা প্রতিবাদ করে আমাদের জাগিয়ে দিয়েছে, শিখিয়ে দিয়েছে। পথনির্দেশনা দিয়েছে। ভুল অনেক হয়েছে। ভুলের সীমানা আর বিস্তৃত না হলেই মঙ্গল। প্রজন্মের প্রতিনিধিদের কাছে শিখে নেওয়ার আছে অনেক কিছু। তারা শুধু নিরাপদ সড়কের দাবিতেই রাস্তায় দাঁড়ায়নি, এটা মনে রাখতে হবে। তাদের দাবির মধ্যে নিরাপত্তা, নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা, অনিয়ম-দুর্নীতির মূলোৎপাটন ইত্যাদি অনেক বিষয়ই নিহিত। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ খসড়া। এই আইন সংসদে পাস হওয়ার পর যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে এর কার্যকারিতা। সরকার অন্য সব যৌক্তিক, মানবিক দাবিগুলো মেনে নেওয়ার যে আশ্বাস দিয়েছে, এর ওপর আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই। এই প্রজন্ম যেন আস্থা না হারায়। এ লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। নতুন সমাজ বিনির্মাণের রূপরেখা তৈরি করতে হবে- এ থেকে নতুন প্রেরণা নিয়ে। এই আন্দোলন মানবিক উত্থানের যে আলো ছড়িয়েছে, তাতে আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব আশাবাদী। কারণ, প্রজন্ম একটি খাত নিয়ে নাড়া দিয়ে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলাপূর্ণ-দুর্নীতিগ্রস্ত অন্য খাতগুলো সম্পর্কেও সজাগ করে দিয়েছে। তারা জানিয়ে দিয়েছে, স্বেচ্ছাচারিতা চলবে না। ন্যায়-সত্য-সুন্দর এবং ঐক্যবদ্ধ সৎ উদ্যোগই যে বড় শক্তি, এও তারা শিখিয়ে দিয়েছে।

লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব

সৌজন্যে: সমকাল

সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর - dainik shiksha সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর দুই ক্যাডার একীভূত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ - dainik shiksha দুই ক্যাডার একীভূত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোট শিক্ষার্থীর ৪৫ শতাংশ ছাত্রী : ব্যানবেইস - dainik shiksha মোট শিক্ষার্থীর ৪৫ শতাংশ ছাত্রী : ব্যানবেইস এমপিওভুক্তিতে প্রতারণা: মন্ত্রণালয়ের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha এমপিওভুক্তিতে প্রতারণা: মন্ত্রণালয়ের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু ১১ নভেম্বর - dainik shiksha নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু ১১ নভেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website