শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধির বাধা যেখানে - মতামত - Dainikshiksha

শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধির বাধা যেখানে

ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও |

স্বাধীনতার ৪৬ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অনেক এগিয়ে গেছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে শুধুমাত্র ৬৪ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক কোটি ৯৫ লাখ শিশু পড়ালেখা করছে। সংখ্যার হিসেবে এ পরিসংখ্যান যে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের কথা ঘোষণা করছে, তা আর ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ সব পরিসংখ্যানের বিপরীতে অন্য চিত্র রয়েছে—আর তা হলো, এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? তারা যে মেধা আর অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে, আমরা তাদের কীরূপে শিক্ষালয় থেকে বের করে আনছি? উন্নত জাতি আর ব্যক্তির চরিত্র গঠনে সেই শিক্ষা কোনো কাজে আসছে কি না? যদি এর ইতিবাচক কোনো উত্তর সরাসরি দেওয়া সম্ভব না হয়, তা হলে আমি বলব—শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে।শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি।

যে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে একজন শিক্ষার্থীর নৈতিকতা আর মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে একটি উন্নত চরিত্র গঠন করার কথা—সেখানে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাবাণিজ্য, দুর্নীতি, শিক্ষকদের অনৈতিক কোচিং-বাণিজ্য আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা এক ধরনের নীতিহীনতার শিক্ষা লাভ করছে। অর্থাত্ দুর্নীতি, অন্যায় আর অপরাধমূলক ক্রিয়াকলাপের শিক্ষা তারা একপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লাভ করছে। এই যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে—তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে না পারার দায় যেমন সরকার এড়াতে পারে না, তেমনি অভিভাবকরাও এর পেছনে কম দায়ী নন। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে প্রশ্নের পেছনে ছুটছে বলেই প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে সরকারকে এত হিমশিম খেতে হচ্ছে। অপরদিকে সামাজিকভাবেও নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং মেধাবিকাশের পরিবর্তে এ-প্লাস প্রাপ্তির ওপর আমরা অধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। একজন শিক্ষার্থীকে আমরা মূল্যায়ন করছি সে এ-প্লাস পেল কি না—তার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু একবারও ভেবে দেখি না, তার মূল্যবোধ কিংবা মেধার বিকাশ হলো কি না। এজন্য অভিভাবকরা সন্তানের ভালো ফলের আশায় কাড়ি কাড়ি অর্থ ব্যয় করছেন। আর এর সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু মহল ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে কিছু নীতি বিবর্জিত শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। যা শিক্ষার মূল সুরকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আবার দেখা যায় শিক্ষার্থীরা যেসব পাঠ্যপুস্তক থেকে শিক্ষালাভ করছে সেখানেও নানা রকম গলদ রয়েছে। বর্তমান সরকার যথাসময়ে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করছে এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু দেখা যায় বইগুলো প্রণয়নে উপযুক্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে না। যার ফলে বইয়ের ভেতরে অসংখ্য ভুলভ্রান্তি, নানা বিতর্কিত বিষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে গাইড বইয়ের প্রাদুর্ভাব শিক্ষার মানোন্নয়নে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পড়ে নিজের মেধা বিকাশ ঘটানোর পরিবর্তে গাইড বইয়ের ওপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।  একইসঙ্গেশিক্ষকরাও পাঠদান বা প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গাইড বইয়ের আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়েছে তা তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আর একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হলো দক্ষ শিক্ষকের অভাব। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে আমাদের দেশে সৃজনশীল বা যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন পুরোপুরি বোঝেন না এমন শিক্ষকের সংখ্যা ১৩%, বুঝলেও ক্লাসে বোঝাতে পারেন না এমন শিক্ষকের সংখ্যা ৪২%, গাইড বইয়ের উপর নির্ভর করে ৪৭% শিক্ষক এমনকি প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার মাত্র ৫৮%। আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশার সামাজিক মর্যাদা অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় মেধাবীরা এ পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।

অন্যদিকে যারা শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছে তারা অর্থনৈতিকভাবে অধিকমাত্রায় সামাজিক মর্যাদা লাভের আশায় অনৈতিক উপায় (কোচিং, টিউশনি) অবলম্বন করছে।শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সর্বাগ্রেই দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষকের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য তাদের ব্যাপকহারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের মধ্যেও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে তোলার জন্য তাদের সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কোনো ফল তৈরি নয়, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতার উত্কর্ষ আর মেধার বিকাশ ঘটানোই যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য তা পরিবার, সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানকে অনুধাবন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা দান এবং গ্রহণ একটি মানসিক প্রক্রিয়া। এখানে কোনোকিছু চাপিয়ে দেওয়া বা আরোপ করার অর্থ হলো শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্ত করা। তাই শিক্ষার্থীরা যেন আনন্দের সঙ্গে শিক্ষালাভ করতে পারে সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করতে হবে। ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্নীতি, কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বইয়ের প্রতি সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।

আমাদের এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা আনন্দ নিয়ে অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে, মেধার বিকাশ ঘটানোর জন্য জানার চেষ্টা করবে। তারা মানবিকতা, মূল্যবোধ আর নৈতিকতার শিক্ষা অর্জন করে মানুষ হয়ে উঠবে। আর তা করতে পারলে আমরা অচিরেই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারব।

লেখক :অধ্যক্ষ, নটর ডেম কলেজ

প্রাথমিক শিক্ষকরা ৩৬ হাজার টাকা বেতন পান : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষকরা ৩৬ হাজার টাকা বেতন পান : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল নভেম্বরে - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল নভেম্বরে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা অক্টোবরে - dainik shiksha প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা অক্টোবরে ‘শিক্ষা প্রশাসনে জামাতীরা বহাল, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে পরীক্ষা দিতে হয়’ - dainik shiksha ‘শিক্ষা প্রশাসনে জামাতীরা বহাল, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে পরীক্ষা দিতে হয়’ প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের ফল দেখুন - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের ফল দেখুন বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৪ অক্টোবর - dainik shiksha বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৪ অক্টোবর এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ - dainik shiksha এইচএসসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে - dainik shiksha কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কবে ভর্তি পরীক্ষা, এক নজরে শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন - dainik shiksha শিক্ষার এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখতে দৈনিক শিক্ষার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website