শিক্ষার মান সুরক্ষায় বিবেচ্য বিষয় - মতামত - Dainikshiksha

শিক্ষার মান সুরক্ষায় বিবেচ্য বিষয়

ড. মো. নাছিম আখতার |

অজপাড়াগাঁয়ের কোনো একটি স্কুলে নকলবান্ধব পরিবেশে ইংরেজি পরীক্ষার দিন বেড়ার ওপাশ থেকে নকল সরবরাহকারী উত্তর বলছেন আর ছাত্র বেড়ার এ পাশ থেকে লিখছে। ইংরেজি বাক্য বলার শেষে নকল সরবরাহকারী ছাত্রকে বললেন, ‘ফুলস্টপ দে’। ছাত্র বুঝতে না পেরে নকল সরবরাহকারীকে উল্টো জিজ্ঞেস করল, ‘মামা, ফুলস্টপ কী?’ মামা রেগে গিয়ে বললেন, ‘ফুলস্টপ কী জানিস না! লাইনের শেষে কলমের খোঁচা দে’। গল্পের ‘ফুলস্টপ’ না চেনা শিক্ষার্থীরাও প্রশ্ন ফাঁস বা পরীক্ষার হলে অবৈধ সাহায্য পাওয়ার কারণে বহু নির্বাচনী প্রশ্নে পুরো নম্বর পেয়ে যাচ্ছে। তাই মেধার মূল্যায়ন ও প্রশ্ন সুরক্ষার ক্ষেত্রে বহু নির্বাচনী প্রশ্ন পদ্ধতি পরিত্যাজ্য। ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ব্যাপক প্রশ্ন ফাঁসের মধ্যেও নকল থেমে নেই বরং বেড়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম, অভিভাবক বাঁশের মাথায় নকল বেঁধে স্কুলের দোতলায় সরবরাহ করছেন। প্রশ্ন ফাঁসের পরেও ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষার কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি বাড়িতে নিতে পারছে না কেন? কারণ পরীক্ষার আগের রাতে পাওয়া বর্ণনামূলক প্রশ্নের উত্তরের প্রস্তুতি খুব ভালোভাবে নেয়া সম্ভব নয় যদি আগে থেকে পড়া না থাকে।

প্রকৃতপক্ষে সৃজনশীল প্রশ্নের কারণে বই পড়া শুধু রিডিং-এ সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা ছেলেবেলায় দেখা যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতার মতো যার যেমন ইচ্ছে তেমন উত্তর দিচ্ছে। বিষয়টি বোঝানোর জন্য একটি বাস্তব উদাহারণ তুলে ধরলাম। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জীববিজ্ঞানের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরপত্রের সঠিক উত্তরের পরিসংখ্যান থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। উদ্দীপকটি ছিল অনেকটা এইরূপ- রফিক গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায়। অসাবধানবশত তার হাত কেটে রক্তপাত শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর রক্ত পড়া বন্ধ হয়। উদ্দীপকের অনুধাবনমূলক একটি প্রশ্ন হলো- ‘উদ্দীপকের রক্তপাত বন্ধের কৌশলটি বর্ণনা কর।’ এখানে মূলত রক্ত জমাট বাঁধার যে চারটি বৈজ্ঞানিক কারণ পয়েন্ট আকারে দেওয়া আছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। আমার মামা একটি কলেজের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক। প্রায় ৩০ বছর কর্মরত আছেন। তিনি এইচএসসি পরীক্ষার ২০৫টি খাতার পরীক্ষক ছিলেন। মামার ভাষ্যমতে- ৭ জন ছেলে ৪ টি ধাপ নিখুঁতভাবে লিখেছে। আর বাকি পরীক্ষার্থীর বেশির ভাগই উদ্দীপকটি বর্ণনা করে তারপর লিখেছে রফিক হাত চেপে ধরেছিল বলেই রফিকের কাটা জায়গায় রক্তপড়া বন্ধ হয়েছে। রক্ত বন্ধের আরো অনেক অপ্রাসঙ্গিক কারণ উত্তরপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আমার মতে, জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য রক্ত জমাট বাঁধার চারটি বৈজ্ঞানিক কারণ জানা অত্যাবশ্যক। এখানে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি না থেকে যদি সরাসরি রক্ত জমাট বাঁধার কারণ বর্ণনা করতে বলা হতো তাহলে এদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি হয়তো প্রস্তুত থাকত চারটি ধাপ পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করার জন্য। বাকিরা মেধা ও সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে কেউ ৩টি, কেউ ২টি, আবার কেউ হয়তো ১টি ধাপ উল্লেখ করত। খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই থাকত যারা অপ্রাসঙ্গিক উত্তর দিত বা একেবারেই উত্তর দিত না। পাঠ্যবইয়ের অপরিহার্য বিষয়গুলো যেহেতু হূদয়ঙ্গম করাতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, সেহেতু তারা উত্তরপত্রে অপ্রাসঙ্গিক উত্তর দিচ্ছে। দুর্বল হয়ে পড়ছে জ্ঞানের গভীরতা এবং নির্ভুল ভিত্তিজ্ঞানের ভাণ্ডার। ফলে বাড়ছে পরীক্ষা ভীতি, বাড়ছে নকলের প্রবণতা। অপ্রাসঙ্গিক উত্তরের ভিড়ে শিক্ষকরাও মনোযোগ দিয়ে পড়ে নম্বর দেওয়ার প্রবণতা হারাচ্ছেন।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্যে আমার প্রস্তাবনা হলো প্রশ্নকে দুই ভাগে ভাগ করা। প্রথমভাগে পাঠ্যবই পাঠের ফলে যে ভিত্তি জ্ঞান অর্জিত হয় তা জানতে চাওয়া। এক্ষেত্রে ৮০ ভাগ প্রশ্ন সকল ছাত্রের জন্য করা। খেয়াল রাখতে হবে ৮০ ভাগ প্রশ্ন যেন বই-এর অনুশীলনী বা উদাহরণ থেকে হয়। এর ফলে ছেলেরা আগ্রহ নিয়ে বইয়ের অনুশীলনীর সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই পড়বে। একটি আশা নিয়ে পড়তে তাদের আনন্দ থাকবে। এর মধ্যদিয়ে সমস্ত বইয়ের প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু জানা হয়ে যাবে -যা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। আর দ্বিতীয় ভাগে ২০% প্রশ্ন থাকবে মেধাবীদের উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন অনুশীলনী থেকে না হয়ে বইয়ের ভিতর থেকে হতে পারে। পাঠ্যবই পড়ানোর উদ্দেশ্যে এমন প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে পড়ার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ আবার ফিরে আসবে। ফলে নকলের প্রবণতা বন্ধ হবে—শক্ত হবে ভিত্তি জ্ঞানের ভাণ্ডার।

কোন শ্রেণিতে পরীক্ষা কেন হয়? আমার মতে- পরীক্ষা হলো শিক্ষার্থীদের উপর অর্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব পালনের সঠিকতা পরিমাপের একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে নকল, প্রশ্ন ফাঁস বা অন্যকোনো উপায়ে কলুষিত করলে শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব পালনের সঠিক চিত্র প্রকাশিত হয় না। ফলে সঠিক স্থানে সঠিক ব্যক্তি নিয়োগের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের আশঙ্কা বাড়বে। এতে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হবে। পরীক্ষার ফলাফল আসলে কী? পরীক্ষার ফলাফল হলো ছাত্র-ছাত্রীদের নিজ দায়িত্ব পালনে সচেতনতার মানদণ্ড। পরিবার প্রধানের দায়িত্ব যেমন পরিবারকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা, তেমনি নির্দিষ্ট ক্লাসের কোনো ছাত্রের দায়িত্ব হলো খেলাধুলা বা আনন্দ করার সাথে সাথে এক বছরের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানার্জন। এ কাজটি যে যত ভালোভাবে নিষ্ঠার সাথে করবে, সে তত ভালো ফলাফল করবে।

প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভিত্তি জ্ঞান অর্জনের সময়। এই সময়ে অর্জিত জ্ঞানই পরবর্তী উচ্চশিক্ষার পথে পাথেয় হিসেবে কাজ করে। সৃজনশীল প্রশ্নের বদৌলতে যে সময় ভিত্তি জ্ঞান তৈরির মোক্ষম সময় সেই সময়টা ছাত্রছাত্রীরা শুধু রিডিং পড়ে ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে উপরের শ্রেণিতে উঠছে। যার প্রভাব উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা পূরণের জন্য ভর্তি প্রার্থীদের গ্রেস নম্বর দিয়ে পাস করাতে হচ্ছে। সৃজনশীল প্রশ্নে অভ্যস্ত ছাত্রছাত্রী উত্তর লিখনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেমন খুশি তেমন লিখছে। এতে সিলেবাসভুক্ত পাঠ্যবিষয়ের উপর সঠিক জ্ঞানার্জন অধিকাংশ ছাত্রের কাছেই অধরা থেকে যাচ্ছে। তাই দেশের সার্বিক স্বার্থে প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবা দরকার।

জাতীয় দৈনিকে দেখলাম আগামী ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নের একাধিক সেট পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে। আমার বিবেচনায় কমপক্ষে পাঁচ সেট প্রশ্ন থাকা উচিত। কারণ পাঁচ সেট প্রশ্নে কোনো প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি না থাকলে বইয়ের প্রায় সবটুকুই কভার করে। প্রশ্ন-সেটটি নির্বাচনে শতভাগ স্বচ্ছতা রাখতে কম্পিউটার নির্ভর দৈব চয়নের প্রস্তাব করছি।

১৬ কোটি মানুষের দেশে একমাত্র উদ্বৃত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ হলো মানব সম্পদ। এই সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ঘটাতে দরকার মানসম্মত শিক্ষা। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে শিক্ষা ব্যবস্থায় যৌক্তিক পরিবর্তন সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন বিশ্ব নাগরিক সৃষ্টি করবে। এর মাধ্যমে রচিত হবে উন্নত রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি।

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০০

 

সৌজন্যে: ইত্তেফাক

প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সুপারিশপ্রাপ্তদের করণীয় - dainik shiksha প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সুপারিশপ্রাপ্তদের করণীয় দুর্নীতিবাজরা সাবধান হয়ে যান: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha দুর্নীতিবাজরা সাবধান হয়ে যান: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী অর্ধাক্ষর শিক্ষকরা সিকিঅক্ষর শিক্ষার্থী তৈরি করছেন: যতীন সরকার - dainik shiksha অর্ধাক্ষর শিক্ষকরা সিকিঅক্ষর শিক্ষার্থী তৈরি করছেন: যতীন সরকার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে যা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে যা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ১৮১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু - dainik shiksha ১৮১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন ২০ ফেব্রুয়ারি - dainik shiksha স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন ২০ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ - dainik shiksha প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৫ মার্চ ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website