please click here to view dainikshiksha website

শিক্ষায় কাম্য পৃষ্ঠপোষকতা

গোলাম কবির | সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭ - ৮:২৩ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

মানব সভ্যতার আলো-আঁধারির কাল থেকে সামন্ত শাসনের হাত ধরে চার্চ তার আধিপত্য বিস্তার করে মুক্ত সংস্কৃতি আর মননকে পদদলিত করে এসেছে। মাঝেমধ্যে মেঘের আড়াল থেকে চমকিত বিদ্যুৎ প্রভার মতো কিছু অক্ষয় সৃষ্টি প্রতিভাবানরা মহাকালের পৃষ্ঠায় রেখে গেছেন। সুদীর্ঘকালের চার্চের আধিপত্যের ফলে মুক্তচিন্তা অনেকটা অবরুদ্ধ থেকেছে। এখানেই শেষ নয়, সামাজিক জীবনচর্চায় জৈবিক প্রয়োজন মেটানোর পদ্ধতিকে সমান্তরাল করার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক সাম্যের মতবাদ। তারাও মুক্ত জ্ঞানচর্চা ও ব্যক্তির উজ্জীবনকে মূল্য দিতে চায়নি। চার্চের মতো মতবাদকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছে।

আজকের উন্মুক্ত বিশ্বে এসব ধারা বিলুপ্ত হয়েছে, তা বলা যাবে না। তবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ এখন বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে লক্ষ করা যায়। দেশ-সমাজ-মানবকল্যাণ নিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই ভাবনা শাসনব্যবস্থায় যেন মানবধর্ম প্রাধান্য পায়। চার্চ যেন মানবসত্যকে খর্ব না করে। অনুরূপভাবে শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণের নামে যেন রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত না হয়।

অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময় ধরে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার জন্য শিক্ষা ও শিক্ষক সম্পর্কে যে সামান্য অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, তার কিছু অংশ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে মত প্রকাশের চেষ্টা করে আসছি কিছুদিন ধরে। যদিও এর সঙ্গে সবার একমত হওয়ার কথা নয়।

একসময় সামন্তপ্রভুরা নিজেদের বৈভব ও জ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ প্রদর্শনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক হতেন। সেসব প্রতিষ্ঠানের খ্যাতি ইতিহাস আজও বহন করছে। আমাদের দেশে আঠারো শতকের শেষ পর্বে পশ্চিমা বণিকের মানদণ্ড শোষকের রাজদণ্ডে রূপান্তরিত হলে তারা নিজেদের প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় পৃষ্ঠপোষক সাজে। উদ্দেশ্য প্রশাসনের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি করা। বিশ শতকের মাঝামাঝি দেশ ভাগ হলো ধর্মীয় ভেদবুদ্ধি সামনে রেখে। তার বিষময় পরিণতি ভুক্তভোগী মানুষকে তিলে তিলে দগ্ধ করছে।

পাকিস্তানি শাসকচক্র দেশভাগের পর অনেক কিছুর সঙ্গে শিক্ষায় পৃষ্ঠপোষণের নামে রাজনীতি শুরু করল। কিছু মাধ্যমিক স্কুল ও স্বনামখ্যাত কলেজ সরকারি বাঁধনে আনা হলো। উদ্দেশ্য প্রভাব বৃদ্ধি করা। তাতে শিক্ষার উন্নতির শিকড় কতখনি প্রোথিত হয়েছে আর তাদের প্রভাবই বা কতখানি বৃদ্ধি পেয়েছে ইতিহাস তার বিচার করবে। তবে তারা শিক্ষার বুনিয়াদ প্রাথমিক শিক্ষাকে আমলে আনল না। প্রাথমিকের ভিত শক্ত না হলে উপরিকাঠামো ভেঙে পড়বে, সে সত্য তারা ভাবনায় আনেনি। কারণ পূর্ববাংলা তাদের কাছে অনেকটা কলোনির মতো ছিল। মাতৃভূমি শৃঙ্খলমুক্ত করে বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করলেন। এটা ছিল তাঁর সুদূরপ্রসারী কর্মযজ্ঞের অন্যতম গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত। বিদেশি উস্কানিতে সমাজে কিছুটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ সময়ে কিছু অপরিণামদর্শী ব্যক্তির প্ররোচনায় বেসরকারি কলেজগুলো সরকারীকরণের দাবি তুলে শিক্ষকরা লাগাতার ধর্মঘট শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু প্রাক-কলেজ শিক্ষাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় না করিয়ে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি। কারণ সে পৃষ্ঠপোষণ জাতির ভবিষ্যতের জন্য কাম্য ছিল না। তখন শোনা যাচ্ছিল পর্যায়ক্রমে তিনি দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করবেন। তারপর ওপরের ভাবনা। ইতিহাস বলছে, পঁচাত্তরের জাতীয় ট্র্যাজেডির পর বঙ্গবন্ধুর সে শুভ উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি।

১৯৮০-৮১ সাল থেকে কলেজ সরকারীকরণ শুরু হলো পাকিস্তানি কায়দায় শিক্ষায় পৃষ্ঠপোষণের নামে। মাঠে-ময়দানে-হাটখলায় সাইনবোর্ডসর্বস্ব কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি হয়ে গেল। যার ভয়াবহ পরিণতি গোটা জাতি হাড়ে হাড়ে আঁচ করছে। অথচ পৃষ্ঠপোষণের বিরাম নেই। নব্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদাতারা কতজন শিক্ষক হওয়ার যোগ্য তা খতিয়ে দেখা হলো না। প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য থাকল সমর্থক বাড়ানো। বাহ্যদৃষ্টিতে তা হয়তো বাড়ে কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী।

শিক্ষা নিয়ে তুঘলকি পৃষ্ঠপোষণ হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তন। এ ব্যবস্থায় কিছু মানুষের স্বচ্ছন্দে জীবিকার ব্যবস্থা হলেও শিক্ষা ক্রমান্বয়ে হয়ে চলেছে অধোগামী। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই হয়ে উঠেছে সনদ বিক্রির প্রতিষ্ঠান। ভেবে দেখা হলো না, এসব সনদধারী দেশের কোন উন্নয়নে কাজে লাগবে।

সমাজকে এগিয়ে নেওয়ায় জন্য সরকার অবশ্যই পৃষ্ঠপোষকতা করবে। শিক্ষা সমাজ উন্নয়নের অন্যতম শক্তিধর মাধ্যম, তবে তা যেন সুপরিকল্পিত হয়। কারণ উচ্চশিক্ষা লাভের ব্যবস্থা করাটাই শেষ কথা নয়, শিক্ষা গ্রহণকারী যথাযথ শিক্ষিত হতে পারল কি না এবং শেখার পর তাদের কর্মসংস্থানের কতটুকু ব্যবস্থা করা যাবে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণই হলো শিক্ষার কাম্য পৃষ্ঠপোষকতা। বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। বরং নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খোলার হিড়িক চলছে। সেই সঙ্গে চলছে অপ্রচলিত নতুন নতুন বিষয় প্রবর্তন এর মূল বিষয়কে ভেঙে একাধিক বিষয়ে বিভাজন, সেখানে শিক্ষার্থীরা যেন বেকার থাকাকেই বিধিলিপি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। এটা বোধকরি কাম্য নয়। শিক্ষা মানুষের মনোভুবনের পরিবেশ কুসুমিত করে। আর রাজনীতি সমাজ ও জীবনধারা উন্নয়নের সম্মিলিত প্রয়াস। এ দুইয়ের সমন্বয় অপরিহার্য। তবে বাছবিচার না করে শিক্ষার অপরিণামদর্শী পৃষ্ঠপোষকতা শুধু শিক্ষার নয়, জাতিরও অবনয়ন ঘটায়।

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। তা খর্ব করার ভাবনা অপরাধ। তবে সে শিক্ষা কত দূর পর্যন্ত প্রলম্বিত হবে। কারণ সমান মেধা নিয়ে সবাই জন্মায় না। তাই যথার্থ মেধাবীরা যথাযথ স্থানে আসীন হবে, সেটাও মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। শিক্ষায় কাম্য পৃষ্ঠপোষণের মাধ্যমে যার যতটুকু প্রাপ্য তা বুঝিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রধান স্তম্ভ।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন