শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘বুলিং’ করলে বহিষ্কার, নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত - কলেজ - দৈনিকশিক্ষা

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘বুলিং’ করলে বহিষ্কার, নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত

নিজস্ব প্রতিবেদক |

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করা এবং অশালীন বা অসৌজন্যমূলক আচরণ রোধে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের বিধান রেখে ‘বুলিং’ প্রতিরোধ কাউন্সিলিং নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘বুলিং’ প্রতিরোধে কাউন্সিলিং দিতে জাতীয় নীতিমালা খসড়া তৈরি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি। আগামীকাল এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা, জোর প্রদর্শনসহ যে কোন ধরণের ইনজুরি প্রতিরোধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং সেবা প্রদানের জাতীয় নীতিমালার খসড়াটি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা হবে। কমিটির সদস্য সচিব ও শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নান দৈনিক শিক্ষাডটকমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, আগামীকাল সকালে ব্যানবেইসে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এ কর্মশালায় নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা হবে। আলোচনা শেষে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হতে পারে। 

বিষয়টি নিশ্চিত করে কমিটির সদস্য সচিব ও শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নান দৈনিক শিক্ষাডটকমকে জানান, সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘঠিত কিছু বুলিং এর ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ভুক্তভোগী হচ্ছে। স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। আর বুলিংয়ের ইফেক্টটাও ‘ট্র্যাজিক’। এসব বিষয় মাথায় রেখেই নীতিমালাটি তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর একটি নীতিমালা থাকলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের আইনী সহায়তা পেতেও সুবিধা হবে। 

তিনি আরও জানান, নীতিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। আগামীকাল ব্যানবেইসে কর্মশালায় খসড়া নীতিমালাটি নিয়ে আলোচনা হবে। নীতিমালাটি  উপস্থাপন করবে কমিটি। কর্মশালায় খসড়া নীতিমালাটি চূড়ান্ত হতে পারে। পরে নীতিমালাটি জারি করা হতে পারে। 

এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র দৈনিক শিক্ষাডটকমকে জানায়, বুলিং প্রতিরোধে খসড়া নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করণীয় নির্ধারণ করে বলা হয়েছে স্কুল চলাকালীন বা শুরুর আগে ও পরে, ক্লাস রুমে, স্কুলের ভেতরে, প্রাঙ্গণে বা স্কুলের বাইরে কোনো শিক্ষার্থী দ্বারা অন্য শিক্ষার্থীকে শারীরিক আঘাত করা বা মানসিক বিপর্যস্ত করা, অশালীন বা অপমানজনক নামে ডাকা, অসৌজন্যমূলক আচরণ করা, কোনো বিশেষ শব্দ বারবার উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করাকে স্কুল বুলিং হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত স্কুলে মৌখিক, শারীরিক ও সামাজিক এ তিন ধরনের বুলিং হয়ে থাকে। মৌখিক বুলিং হলো কাউকে উদ্দেশ করে এমন কিছু বলা বা লেখা, যা খারাপ কোনো কিছুর প্রতি ইঙ্গিত করা যেমন উপহাস, খারাপ সম্বোধন বা ডাকা, অশালীন শব্দ ব্যবহার করা বা হুমকি দেওয়া। শারীরিক বুলিং বলতে কাউকে আঘাত করা, হাত দিয়ে চড়-ধাপ্পড় বা পা নিয়ে লাথি মারা, ধাক্কা মারা, খোঁচা মারা, কারও জিনিসপত্র জোর করে নিয়ে যাওয়া বা ভেঙে দেওয়া, মুখ বা হাত দিয়ে অশালীন বা অসৌজন্যমূলক অঙ্গভঙ্গি করাকে বোঝায়। সামাজিক বুলিং বলতে বোঝানো হয়েছে সামাজিক স্ট্যাস্টাস, এক বা দলগত বন্ধুত্ব বা পারস্পরিক সম্পর্ক, পরিচিতি বা বংশগত অহংকারবোধ থেকে কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা তা করতে প্ররোচিত করা বা কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে বারণ করা, কারও সম্পর্কে গুজব ছড়ানো, প্রকাশ্যে কাউকে অপমান করা, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাত তুলে কোনো কথা বলা ইত্যাদি। এছাড়াও সাইবার বুলিং হলো, বাজে মেসেজ পাঠানো, কোনো গোপন বিষয় মিডিয়ায় প্রকাশ করে দেওয়া, অনলাইনে হুমকি দেয়া।
  
বুলিং প্রতিরোধে খসড়া নীতিমালায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করণীয় নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখানোর দিকে বেশি নজর দিতে হবে। নীতিমালায় বুলিংয়ের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বন করাতে বলা হয়েছে। বুলিং করলে কঠোর শাস্তি পেতে হয়, এ ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে। বুলিং করলে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে দেয়া হবে, এমন বার্তা সবার মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে। প্রয়োজনে টিসি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বুলিংয়ের ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে আঘাত করা যাবে না। প্রয়োজনে কাউন্সিলিং করতে হবে। অভিভাবকদের ডেকে বোঝাতে হবে। বুলিং রোধে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ, করিডোর, ক্লাসরুমে সিসি ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি মনিটরিং করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বুলিংয়ের ব্যাপারে আতষ্ক কাজ করবে। বুলিংয়ের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি হয়, এমন নাটক-সিনেমা দেখার পাশাপাশি স্কুলে এসব নাটক শিক্ষার্থীদের দিয়ে মনস্থ করার ব্যবস্থা করতে হবে। বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীকে প্রথমে মানসিক সাপোর্ট দিতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীদের মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। 

বুলিং ক্রিমিনাল ক্রাইম না হলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে পুলিশের সাহায্য নিতে পারবে। শিক্ষকদের চাপমুক্তভাবে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হবে। শিক্ষক যুক্তিসঙ্গত উপায়ে তা হ্যান্ডেল করবেন। বুলিংয়ের শিকার ও বুলিং করার ক্ষেত্রে কেউ সাক্ষী থাকলে তার থেকেও লিখিত রিপোর্ট নেওয়া যাবে। বুলিংয়ের শিকার ও বুলিং করা উভয়কে আলাদাভাবে বা একসঙ্গে প্রতিরোধ কমিটি প্রয়োজনীয় কথা বলবে।

বুলিংয়ের শিকার ও বুলিং করা উভয়কে যত্মসহকারে কাউন্সিলিং করে তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। বুলিং করা শিক্ষার্থী ও ভিকটিম উভয়ের জন্য ফাইল মেইন্টেন করতে হবে। তাদের রেকর্ডগুলো পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যাতে সহায়ক হয়। স্কুলের যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে মিটিং করতে হবে এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্কুলে কোনো প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করতে পার তার ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্ম-গোত্র ইত্যাদি যে কোনো বিষয়ে যেন বৈষম্য তৈরি না হয় তার দিকে নজর দিতে হবে। স্পেশাল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা যাতে শারীরিক-মানসিকভাবে আঘাত না পায়, সে বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। দলগত বুলিং শিক্ষার্থীদের পরস্পরকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সেকশন পরিবর্তন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সিনিয়র ও ভালো শিক্ষার্থী তাৎক্ষণিকভাবে বুলিং বন্ধ করতে বলবে। বুলিংয়ের শিকার হলে দ্রæত উদ্ধার করবে, এমন ব্যবস্থা করতে হবে। দূরে দাঁড়িয়ে না দেখে দ্রুত ভিকটিমকে উদ্ধার করতে হবে।    

অভিভাবকদের করণীয় বিষয়ে খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, সন্তানকে স্কুলের নিয়মকানুন মেনে চলা, অন্যান্য শিক্ষার্থী বা বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নিয়মিত উদ্বুব্ধ করতে হবে। সন্তানকে সর্বোচ্চ ভালোবাসার মধ্য দিয়ে লালন-পালন করতে হবে। তাদের মধ্যে মূল্যবোধ শেখাতে হবে, যাতে তারা বুলিংকারী না হয়ে ওঠে। নিজ সন্তানকে বুলিংকারী বা বুলিংয়ের শিকার যাই হোক না কেন, পূর্বাপর কিছু না জেনে অভিভাবকদের ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সন্তানদের সামনে পিতা-মাতা কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবেন না। বুলিংকারী শিক্ষার্থীরা স্কুলে কোনো পদক্ষেপ নিলে অভিভাবকরা তার বিরোধিতা না করে স্কুলকে সহযোগিতা করার কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৫ মার্চ হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাউন্সিলিং দিতে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা, জোর প্রদর্শনসহ যে কোন ধরণের ইনজুরি প্রতিরোধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং সেবা প্রদানের জাতীয় নীতিমালার খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছিল এ কমিটিকে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদকে আহ্বায়ক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নানকে কমিটির সদস্য সচিব করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আব্দুল আমিন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপসচিব মাকসুদা হোসেন, আইন ও বিচার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মোল্যা সাইফুল আলম, ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন এবং গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক দেওয়ান তাহেরা আক্তার।  

গত ডিসেম্বরে ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যার ঘটনার পর ‘শুধু শিক্ষার্থী নয় 
শিক্ষকদেরও মানসিক কাউন্সেলিং দরকার’ বলে মন্তব্য করেন হাইকোর্ট। সে প্রেক্ষিতই আত্মহত্যা প্রতিরোধে নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেসরকার।

করোনা : আরও ৫৫ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩ হাজার ২৭ - dainik shiksha করোনা : আরও ৫৫ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩ হাজার ২৭ এনটিআরসিএর নতুন চেয়ারম্যান আকরাম হোসেন - dainik shiksha এনটিআরসিএর নতুন চেয়ারম্যান আকরাম হোসেন প্রাথমিকে ৪০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ আসছে - dainik shiksha প্রাথমিকে ৪০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ আসছে গার্ডেনিং করতে ৫ হাজার করে টাকা পাবে ১০ হাজার স্কুল - dainik shiksha গার্ডেনিং করতে ৫ হাজার করে টাকা পাবে ১০ হাজার স্কুল কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের নতুন সচিব আমিনুল ইসলাম - dainik shiksha কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের নতুন সচিব আমিনুল ইসলাম চলতি মাসেই স্থায়ী হচ্ছেন প্রাথমিকের অস্থায়ী প্রধান শিক্ষকরা - dainik shiksha চলতি মাসেই স্থায়ী হচ্ছেন প্রাথমিকের অস্থায়ী প্রধান শিক্ষকরা সৌদি আরবে থেকেও নিয়মিত হাজিরা, এমপিওভুক্তি! - dainik shiksha সৌদি আরবে থেকেও নিয়মিত হাজিরা, এমপিওভুক্তি! শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান - dainik shiksha শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে টেসলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ - dainik shiksha শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে টেসলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক - dainik shiksha বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে - dainik shiksha শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website