সব স্তরের শিক্ষকই যখন আন্দোলনে - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

সব স্তরের শিক্ষকই যখন আন্দোলনে

মাছুম বিল্লাহ |

আমাদের দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ স্তরে মোট শিক্ষকসংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। এই তিন স্তরের কোনো না কোনো পর্যায়ের শিক্ষকরা বর্তমানে চাকরিসংক্রান্ত দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে আছেন। কোনো কোনো গ্রুপ সরকারের আশ্বাস পেয়ে মাত্র আন্দোলন স্থগিত করেছে। তাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি রয়েছে। তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে, সরকার শিক্ষকদের সমস্যাবলি বিচ্ছিন্নভাবে দেখেছে এবং কিছু সুযোগ-সুবিধা সময় সময় বাড়িয়েছে। যার ফলে দেশের সবচেয়ে বড় এই পেশাজীবী গোষ্ঠীকে ঠিকমতো ম্যানেজ করতে না পারায় কোনো পক্ষই আর খুশি নয়। সরকার কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই যখন যেটা সামনে এসেছে তখনই তা বিবেচনা করায় একধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা যদিও জাতীয় বিষয় কিন্তু এটিকে অনেকটাই রাজনৈতিকভাবে দেখার কারণে এবং বিচ্ছিন্নভাবে সমস্যা সমাধানের কারণে সার্বিক ও সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সমস্যা সমাধান হওয়ার পরিবর্তে আরো ঘনীভূত হয়েছে।

বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদে গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষকের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো করার কথা বলা হয় কিন্তু তা আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এর মধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময় স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো করার কথা বললেও তা আর এগোয়নি। শিক্ষকদের কিছু দাবি দীর্ঘদিনের, যা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আরো চাঙ্গা হয়েছে। বছরের শেষ সময়ে বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ, নতুন বই বিতরণ ও ভর্তির মৌসুমকে আন্দোলনের সময় হিসেবে শিক্ষকরা বেছে নিয়েছেন। শিক্ষকরা আন্দোলনে নামায় এসব কার্যক্রম অনেকটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়, সব শিক্ষকের বেতন সরকারি চাকুরেদের মতো দ্বিগুণ করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদমর্যাদা বাড়ানো হয়। এগুলো সবই ভালো উদ্যোগ কিন্তু সামগ্রিক পরিকল্পনা ছাড়াই যখন যেটি সামনে এসেছে এবং সরকার চাপ অনুভব করছে, তখনই সেটি মেনে নেওয়া হয়।

সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদরাসা (দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদরাসার সঙ্গে সংযুক্ত) জাতীয়করণের প্রশ্ন নিয়ে মাদরাসা শিক্ষকরাও আন্দোলন করে আসছেন। ওই সব মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন স্কেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো করাসহ কয়েকটি দাবিতে শিক্ষকরা আন্দোলনে নেমেছেন। দেশে বর্তমানে ইবতেদায়ি মাদরাসা আছে ৯ হাজার ৩৩৫টি। এগুলোর শিক্ষকসংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। ৩৩ বছর ধরে পাঁচ হাজার ৪৭৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। যাঁরা পাচ্ছেন তাও তিন মাস পর পর। সরকার প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেছে কিন্তু ইবতেদায়ি শিক্ষা জাতীয়করণ না করা প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে এক বিরাট বৈষম্য নয় কি?

জানা যায়, ১৯৮৪ সালে ৭৮ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বতন্ত্র মাদরাসা নিবন্ধন শুরু হয়। তখন থেকেই ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকরা সরকারের নিয়মনীতি অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন। তবে তাঁদের কোনো বেতন-ভাতা নেই। বিনা বেতনে একই কারিকুলামে পাঠদান করা হচ্ছে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোতে। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় এসব মাদরাসা শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতোই সরকারের সব কাজে অংশগ্রহণ করছেন শিক্ষকরা অথচ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে এ রকম দ্বিমুখী নীতি নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন।

দেশে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৭৫ থেকে ৮০ হাজার। তাঁরাও কর্মসূচি পালন করেছেন।

দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ২৭ হাজার ৮১০টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী আছেন চার লাখ ৯৬ হাজার ৩৬২ জন। তাঁদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে খরচ হয় প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা। এর বাইরে স্বীকৃতি পাওয়া নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে পাঁচ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার। স্বীকৃতির বাইরেও দুই হাজারের বেশি নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এদিকে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদেরও দাবিদাওয়া রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা। সারা দেশে ৩৩৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ হাজার শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন আট হাজার। পাঁচ শতাধিক প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। এগুলো শিগগিরই পূরণ করা না হলে কেন্দ্রীয় সভা ডেকে কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন নেতারা।

কলেজ শিক্ষকদের মধ্যে চলছে ক্যাডার-নন-ক্যাডার বিতর্ক ও আন্দোলন। দেশের ৩৩৫টি সরকারি কলেজ আছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব উপজেলায় সরকারি কলেজ নেই সেগুলোর একটি করে বেসরকারি কলেজকে সরকারি করা হবে। নতুন করে আরো ২৮৩টি বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু আগে থেকে নীতিমালা ছাড়াই এত বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ করায় সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ঘোষিত মানদণ্ড না থাকায় ভালো ও পুরনো কলেজ বাদ দিয়ে যেনতেন কিছু কলেজ জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনও চলছে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয়করণ হওয়া কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত করার উদ্যোগ তাঁরা মানবেন না। তাঁদের নন-ক্যাডার রাখতে হবে। এ দাবিতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে তাঁরা আন্দোলন করছেন। অন্যদিকে জাতীয়করণ হতে যাওয়া কলেজ শিক্ষকরা বলছেন, তাঁদের আগের মতো ক্যাডারভুক্ত করতে হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, যদি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব প্রতিষ্ঠানকেও এমপিওভুক্ত করা হয়, তাহলে ওই সব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করলে মাসে আরো প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি মাসে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দেওয়া হয় ৯৪২ কোটি টাকা। সাত হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করলে খরচ আরো বাড়বে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রমতে, নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ে সব প্রতিষ্ঠান যোগ্য নাও হতে পারে। তবে এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দেশের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী কোন এলাকায় কতগুলো প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন, কী পরিমাণ আছে, কোথায় আরো প্রয়োজন সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া। প্রয়োজন হলে কিভাবে সেগুলো প্রতিষ্ঠা করা হবে, সরকার করবে নাকি বেসরকারি পর্যায়ে হবে, নাকি সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে হবে। এগুলোর অর্থায়ন হবে কিভাবে, শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা কিরূপ হবে, কোথা থেকে হবে। এগুলো সাময়িক কোনো সিদ্ধান্তের দ্বারা করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন ‘জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কমিশন’—যারা বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, খালি পেট নিয়ে শিক্ষকরা শিক্ষাদান করতে পারবেন না। শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ, সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে এবং শিক্ষকতায় যোগদান করার পর শিক্ষকদের জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। কারা শিক্ষাদান করবেন, কিভাবে করবেন তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে স্পষ্ট করে জাতিকে জানাতে হবে।

 

লেখক: মাছুম বিল্লাহ, লেখক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত।

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website