সরকারিকরণ এখন সময়ের ব্যাপার - মতামত - Dainikshiksha

সরকারিকরণ এখন সময়ের ব্যাপার

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

দেশে এই মুহূর্তে শিক্ষায় সবচেয়ে বড় দাবি কোনটি? কেউ এমন প্রশ্ন করলে নিঃসংকোচে উত্তর দেই, সব স্কুল-কলেজ এক সাথে সরকারিকরণ করাই এখন সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবি। জবাবটির পেছনে অবশ্যই যুক্তি আছে। অন্য কারো তাতে দ্বিমত থাকতে পারে। গত দু'তিন বছর ধরে সরকার যেসব উপজেলায় কোন সরকারি স্কুল-কলেজ নেই, সেসব উপজেলায় একটি করে বেসরকারি স্কুল ও কলেজ সরকারিকরণ করে দাবিটির যথার্থতা যেমন মেনে নিয়েছে, তেমনি এর গুরুত্বও স্বীকার করেছে। 

মনে হয়, তারা সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একত্রে সরকারিকরণের নীতিগত একটি সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে গ্রহণ করে রেখেছে। কেবল সময় ও সুযোগের অপেক্ষা। আমার বিশ্বাস, এক এক করে স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ করে তারা একত্রে সব স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের মেসেজটি জাতিকে দিয়েই দিয়েছে। স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটি বেসরকারি সব স্কুল-কলেজ একত্রে সরকারিকরণের একটি বড় ধরণের রিহার্সেল। প্রথমে যেসব উপজেলায় কোন সরকারি স্কুল ছিল না, সেখানে একটি করে মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সরকার সরকারিকরণের পথে এক ধাপ অগ্রসর হয়। এখন সে সব স্কুলের প্রায় সব ক'টি সরকারিকরণ হয়ে গেছে। 

সে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যাবার দৃঢ় একটা প্রত্যয় দেখতে পাই। এ কারণে দাবিটি এখন প্রস্ফুটিত অবস্থায় সবার চোখের সামনে দৃশ্যমান। এটি এখন বলতে গেলে একটি কমন ইস্যু। এক সাথে পাঁচ লাখ মানুষ ও তাদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এমনকি শুভাকাঙ্ক্ষীরা পর্যন্ত নিরন্তর স্বপ্নটি দেখেন। লাখ লাখ অভিভাবক স্বপ্নটি দেখে থাকেন। কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর চোখে মুখে সাধের এ স্বপ্নের স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ। এক সাথে এত মানুষের অভিন্ন দাবি এ মুহূর্তে বোধ হয় দেশে দ্বিতীয়টি নেই। এটি হঠাৎ করে একদিনে দেখা কোন স্বপ্ন নয়। তিলে তিলে স্বপ্নটির জন্ম। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা। সেই কবে, কখন স্বপ্নটির বীজ রোপণ করা হয়েছিল, সে ইতিহাস ক'জনে জানে? গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের শতাংশ করে সামনে এগিয়ে চলা। খুব সম্ভব স্কেলের পঞ্চাশ শতাংশ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই করে করে ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বই শতাংশ বেতন। এরপর মূল বেতনের 'শত ভাগ'। 

প্রিয় পাঠক, বেসরকারি স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বপ্নের সোনালি দাবির একেকটি সিঁড়ির কথাই স্মরণ করছিলাম। একটি করে সিঁড়ি ডিঙাতে কত দিন, মাস ও বছর পেরোতে হয়েছে। তারপর একদিন স্বপ্নের 'শত ভাগ' বেতন স্কেল। সেদিনের আনন্দটি আজ লিখে কাউকে অনুধাবন করানো যাবে না। সে সময়ের শিক্ষক নেতাদের অনেকে বেঁচে নেই। অনেকেই অবসরে গেছেন। শিক্ষা ও শিক্ষকদের জন্য তারা কত না নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও বিসর্জন বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়ে গেছে। 

আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছুতে তারা কত না আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা পর্যন্ত পেতে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের যেটুকু কৃতিত্ব অর্জিত হয়েছে, সেটি পূর্বসূরি শিক্ষক নেতাদের কারণেই সম্ভব হয়েছে। সে কথাটি বিস্মৃত হলে চলবে না। নতুন প্রজন্মের অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর সে ইতিহাস জানা নেই। জানা থাকার কথাও নয়। কেবলি কি তাই? এক সময় বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা তিন মাস পর পর বেতন পেতেন। বেতন পাবার কোন নির্ধারিত তারিখ ছিল না। এক মাসের বেতন আরেক মাসের শেষে পাওয়া যেত। কী না কষ্টের দিন গেছে তাদের! সে কষ্টের এখন অবসান হয়েছে। 

একসময় বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা-এসব এক আনা কিংবা এক পাইও তাদের ছিল না। পাই ও আনার যুগ সেই কবে শেষ হলেও আরো বহু পরে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা সেগুলো পেয়েছেন। আজও সে সব কেবল গন্ধ শোঁকার পর্যায়ে। সেটুকু ও নানা আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা। তদুপরি সে কষ্টের মাঝে এখন অন্য এক আনন্দ বিদ্যমান। 

অতি সম্প্রতি তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা প্রাপ্তির সংবাদ সে আনন্দকে শতগুণ বাড়িয়ে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে। সেটি এখন সরকারিকরণকে নিত্য হাতছানি দিয়ে ডাকে। সরকারিকরণের স্বপ্নকে পূর্ণতায় পৌঁছে দিতে চায়। সব স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ হলে শিক্ষকরাই লাভবান হবেন বলে এক শ্রেণির মানুষের ধারণা। সাধারণ লোকজনের প্রায় সকলেই কথাটি বিশ্বাস করে থাকেন। শিক্ষক সমিতিগুলো বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে অনেকটা ব্যর্থ বলেই সাধারণ লোকজনের মনে এমন বিশ্বাস জন্ম নিতে পেরেছে। 

সরকারিকরণের জন্য সমিতিগুলো যে আন্দোলন-কর্মসুচি পালন করে, তা কেবল শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বার্থে বলেই স্বভাবত অনেকে মনে করেন। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সর্বোপরি শিক্ষা ও জাতির জন্য সরকারিকরণ অপরিহার্য-সে বিষয়টি সবার মনে জাগিয়ে দিতে হবে। সরকারিকরণ হলে টাকার হিসেবে শিক্ষক-কর্মচারীরা বাহ্যত একটু উপকৃত হন বটে। সেটি বাড়তি কিছু নয়, ন্যায্য পাওনা। কিন্তু তাতে দেশ ও জাতির যে উপকার সাধিত হয়, সেটি আজ বুঝিয়ে বলা কঠিন। 

আমরা সকলে জানি, মানসম্মত শিক্ষাই আসল শিক্ষা। স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ হলেই কেবল মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয়। মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্মত শিক্ষকের জুড়ি নেই। যতদিন না স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ হবে ততদিন আমরা মানসম্মত শিক্ষক কোথায় পাব? আমাদের শিক্ষার মান এখন অনেক নীচে। বেসরকারি স্কুল-কলেজে এখন কোয়ালিটি শিক্ষক নেই বললে চলে। এ কারণে কোয়ালিটি এডুকেশনের হাহাকার। এসবের কারণ কী? একমাত্র স্কুল-কলেজ বেসরকারি বলেই শিক্ষায় এক রকম দেউলিয়াপনা। ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্ণিং বডির দৌরাত্ম্যের কারণে জায়গায় জায়গায় ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম। কোথাও কোথাও কমিটি ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের রোষানলে পড়ে কত শিক্ষক-কর্মচারীর প্রাণ ওষ্ঠাগত-সে খবর ক'জনে রাখে? কোথাও কোথাও আর্থিক অনিয়ম। বেসরকারি বেশির ভাগ স্কুল-কলেজের তহবিল অনেক সমৃদ্ধ। এসব টাকা ও সম্পদ কোন কোন জায়গায় নানাভাবে অপচয় কিংবা আত্মসাৎ হয়ে যায়। সরকারিকরণ ছাড়া বেসরকারি স্কুল-কলেজের তহবিল ও সম্পদ মোটেও নিরাপদ নয়। এক সময় একেবারেই হাতছাড়া হয়ে যাবার আশংকা থেকে যায়। 'ডিড অব গিফট' সম্পাদিত হলেই সম্পদ ও তহবিল দু'টিরই সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। সে কারণেও সরকারিকরণে আর বিলম্ব করা মোটেও সমীচীন নয়।     
                                
আরেকটি বিষয়ে একটা বড় রকমের প্রশ্ন থেকে যায়। সেটি হলো, সরকার যেখানে শতভাগ স্কেলে বেতন দেয়, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা একটু হলেও দেয়, ছোট হলেও দুই ঈদে দু'টো উৎসব ভাতা দেয়, অবসরকালীন সময়ের জন্য এককালীন অবসর সুবিধাও দেয় এবং সর্বশেষ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং বৈশাখী ভাতা দেবার কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন থেকে প্রতি বছর জুলাই মাসের ১ তারিখে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর ন্যায় ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা পাবেন। শিক্ষক-কর্মচারীরা এত সব পাওয়ার পর আর তাদের এমন কী বাকি রইল? আমার প্রশ্ন এটি নয়। আমার প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। সেটি হলো, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এত সব সুযোগ-সুবিধা পাবার পর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেসরকারি বলে অভিহিত করা কতটুকু সঠিক ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়? এ প্রশ্নটি কেবল আমার নয়, আরো অনেকের। আমার তো তাদের আধা সরকারির চেয়েও বেশি মনে হয়। হতে পারে সরকারির চেয়ে সামান্য একটু কম। সরকারিদের একেবারে কাছাকাছি। আমার মনে হয় তাদের সামান্য যেটুকু পাওনা বাকি, তা দিয়ে সরকার নিজের কৃতিত্বের সবটুকু বেসরকারির বে-এর নীচ থেকে উদ্ধার করার উদ্যোগ নিতেই পারে। বে-এর নীচে সরকারের সব অবদান ঢাকা পড়ে আছে। এর আগ পর্যন্ত তাদের আর বেসরকারি নয়, অন্য কোন নামে ডাকাই সমীচীন হবে।

আজ থেকে প্রায় চার যুগ আগে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাস্তর অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।যুদ্ধবিধ্বস্ত ও পীড়িত একটি দেশে পুরো একটি শিক্ষাস্তর সরকারিকরণ করে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করা অনেক বড় সাহসের কাজ ছিল। এতগুলো বছর পরও আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর এখনো অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক না হওয়া সত্যি লজ্জাজনক বিষয়। আমাদের সাধ ও সাধ্য দু'টোই বেড়েছে। কিন্তু বড় কিছু করার সাহস সে হারে বাড়েনি। সাহস করলে জাতীয়করণ বহু আগেই হয়ে যেত। এখন দ্রুত সাহস সঞ্চয় করে সব স্কুল-কলেজ একটি মাত্র ঘোষণায় একত্রে জাতীয়করণ করে মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার সময় এসে পড়েছে। এটি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সে দাবিটি মানতেই হবে। যত দ্রুত মানা যাবে, ততই দেশ ও জাতির মঙ্গল। শিক্ষক-কর্মচারীগণ সামান্যই লাভবান হন। গোটা জাতিরই লাভ বেশি। আর শিক্ষকরা লাভবান হলে ক্ষতির তো কিছু নেই। শিক্ষক-কর্মচারীরা তো পেট-পিঠহীন অদ্ভুত কোনো প্রাণী নন। 


লেখক : অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট। 

ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে বিতর্ক - dainik shiksha ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে বিতর্ক প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ: ৫ দিন আগে অ্যাডমিট না পেলে যা করবেন - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ: ৫ দিন আগে অ্যাডমিট না পেলে যা করবেন নতুন সূচিতে কোন জেলায় কবে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা - dainik shiksha নতুন সূচিতে কোন জেলায় কবে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি - dainik shiksha সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website