সরকারিকরণ নিয়ে জাতির প্রত্যাশার কথা - মতামত - Dainikshiksha

সরকারিকরণ নিয়ে জাতির প্রত্যাশার কথা

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী |

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি স্কুল-কলেজ একত্রে সরকারিকরণের ধারণাটি বড় করে  সামনে এসেছে । এটি এখন সকলের আলোচনায় । সব স্কুল-কলেজ এক সঙ্গে সরকারিকরণ করার ওপর দিনে দিনে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে । এক সময় আমাদের তেমন একটা আর্থিক সঙ্গতি ছিল না । এখন অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো । এর ফলে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটা সঙ্গত কারণে বেড়ে গিয়েছে। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর আমাদের আর্থিক সামর্থ্য যেটুকু বাড়ার কথা সে পর্যন্ত না বাড়লে ও যেটুকু বেড়েছে সে অনুপাতে নানা রকম প্রত্যাশা জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে । 

প্রত্যাশা ও স্বপ্ন কোন ব্যক্তি কিংবা জাতি-গোষ্ঠীকে কেবল সামনে এগুবার পথ দেখায় না, বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর অনুপ্রেরণা ও দেয় । সে অনুপ্রেরণা ব্যক্তি কিংবা জাতি যেই হউন না কেন তাকে অন্য এক সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে দিয়ে থাকে ।  ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে দেশ স্বাধীন হবার পর নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে আমাদের পথ চলা শুরু । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিন স্বপ্ন ও প্রত্যাশার শিখরে ছিল আমাদের অবস্থান । চুয়াত্তরে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর সরকারিকরণ করে বঙ্গবন্ধু জাতির স্বপ্ন ও প্রত্যাশা আরো বাড়িয়ে দেন । সত্যি কথা বলতে কি সে সময় প্রাথমিক শিক্ষাস্তর সরকারিকরণের মত সামর্থ্য আমাদের ছিল না। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর মত এক মহান নেতার সাহস ও সদিচ্ছার কারণে সে কঠিন কাজটি সম্ভব হয়েছিল । অসামান্য দুরদর্শিতা দিয়ে তিনি বুঝে উঠতে পেরেছিলেন যে একমাত্র শিক্ষাই জাতিকে উন্নতির সোপানে নিয়ে যেতে পারে । শিক্ষা দিয়ে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা যায় । আমাদের সে বোধটুকু কেন জানি এখন আর জাগ্রত নেই । এ বোধটির পুনর্জাগরণ অপরিহার্য হয়ে ওঠছে। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা কেবল পিছিয়ে পড়তে থাকবো । এ কারো কাম্য নয় । গত দু'তিন বছর ধরে একটি দু'টি করে স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ করা হচ্ছে । তাতে অন্ততঃ একটা বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেছে যে, সরকারিকরণের প্রয়োজনীয়তা আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা উপদ্ধি করতে শুরু করেছেন । কেবল সাহসের অভাবে এ কাজটি এক সাথে করতে পারছেন না । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ বিষয়ে সদিচ্ছা নিয়ে কারো মনে সন্দেহ নেই । কিন্তু কেন যেন তার সদিচ্ছাটি কে বা কারা বার বার আটকে দিচ্ছে । বঙ্গবন্ধুর  খুব কাছে থেকে এক শ্রেণির মানুষ আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর ক্ষতির চিন্তায় চব্বিশ ঘণ্টা ডুবে থাকতো ।  এদের প্রেতাত্মাগুলো শেখ হাসিনাকে ঘিরে রেখেছে কীনা কে জানে ? শেখ হাসিনা সব স্কুল-কলেজ একত্রে সরকারিকরণের ব্যয়ের হিসেবটি বার বার জানতে চান । কিন্তু তা সঠিক করে তার সামনে উপস্থাপন করা হয় বলে মনে হয় না । তদুপরি একটি দু'টি করে হলে ও সরকারিকরণেরকাজ থেমে নেই । সে একমাত্র তারই সদিচ্ছার কারণে ।

গত কয়েকদিন আগে মোট ২৭১ টি বেসরকারি কলেজ চুড়ান্ত সরকারি করে তিনি তার সদিচ্ছা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন । শিক্ষায় ব্যয় বাড়িয়ে কেউ কোনো দিন দেউলিয়া হয়েছে বলে জানা নেই । শিক্ষার পেছনে খরচ সর্বোত্তম বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত । এ বিনিয়োগে কোন ঝুঁকি নেই। এ থেকে যে কোনো জাতি যুগ যুগান্তরে কেবলি মুনাফা পেতে থাকবে । পৃথিবীর যে সকল দেশ আমাদের বহু পরে স্বাধীনতা অর্জন করে এখন আমাদের পিছে ফেলে  সামনে চলে গেছে তারা কেবল শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে তা করতে সক্ষম হয়েছে । এশিয়ায় সিঙ্গাপুর,  ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়া এ করে অনেক দুর এগিয়ে গেছে । তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কাম্য সফলতা অর্জন করতে পারি । শিক্ষাব্যয়কে সর্বোত্তম বিনিয়োগ গণ্য করে একসাথে সব স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের সাহসটুকু আমাদের অবিলম্বে অর্জন করতে হবে । তা করতে আমাদের যত দেরী হবে  শিক্ষা থেকে কাঙ্খিত সুফল পেতে আমাদের ততই বিলম্ব ঘটবে ।  আরেকটা বিষয়ে আলোকপাত করা খুব  দরকার হয়ে পড়েছে । আমাদের শিক্ষাকে রাজনীতির বাইরে রাখা একান্ত অপরিহার্য । ছাত্র রাজনীতির সংজ্ঞা পুর্ননির্ধারণ করা প্রয়োজন । ছাত্ররা দেশ ও জাতির জন্য রাজনীতি করবে । যেমন এই সেদিন তারা নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করেছে । চমৎকার তাদের সে আন্দোলন । শিক্ষকদের  রাজনীতি ও তেমন হওয়া উচিত । কিন্তু আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যখন আওয়ামী লীগ , বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা জামাতের হয়ে রাজনীতি করেন তখন খুব খারাপ লাগে । আমাদের স্কুল-কলেজের কমিটিগুলো এখন রাজনীতিকদের কব্জায় । বেশির ভাগ জায়গায় এমপি সাহেব কিংবা তার মনোনীত ব্যক্তি কমিটির সভাপতি । তাদের ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় স্কুল -কলেজ চালাতে হয় । আবার স্কুল কলেজ সরকারিকরণ কিংবা এমপিওভুক্তিকরণের ক্ষেত্রে এমপি কিংবা মন্ত্রী মিনিস্টারের সুপারিশ ছাড়া হয় না । এমনকি দালান বিল্ডিং পেতে ও মন্ত্রী মিনিস্টারের অগ্রাধিকার। যে সব স্কুল কলেজের মন্ত্রী মিনিস্টার কেউ নেই তাদের কিছু পাবার আশা নেই । এই তো এখন নন এমপিও স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইন আবেদন চলছে । আবেদনের একটা জায়গায় সংসদীয় এলাকা চিহ্নিত করার অপশন রয়েছে। এতে মনে হয় সংশ্লিষ্ট এমপি সাহেবের বিশেষ কৃপা ছাড়া কারো এমপিও পাবার সুযোগ নেই । এমপি সাহেবের কোটায় হয়ত এক বা দু'টি প্রতিষ্ঠান পড়বে । তিনি তার পছন্দের অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ডিও লেটার প্রদান করলে সেটিই এমপিওভুক্ত হবে। পক্ষান্তরে এমপি সাহেবের ডিও লেটার না পেলে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ও বিড়ম্বনায় পড়তে হবে । এমপি-মিনিস্টার কিংবা রাজনৈতিক নেতার কারণে অনেক সময় অযোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়ে যায় । সরকারিকরণ হয় । দালান বিল্ডিং ইত্যাদি পায় । পক্ষান্তরে যোগ্য প্রতিষ্ঠান এসব পাবার কথা থাকলে ও তারা পায়না । এভাবেই আমাদের কালচারটা গড়ে ওঠছে । 

দেশে কোটা বাতিল কিংবা সংস্কারের আন্দোলন যখন চলছে তখন আবার কেউ কেউ কোটার সুবিধা ভোগ করেন । এটি চলতে দেয়া যায় না । আমাদের পবিত্র সংবিধানে আছে,  শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার । আরো আছে,  রাষ্ট্র কিংবা সরকার সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সুবিধা ও অধিকার নিশ্চত করবে । এখন এ প্রশ্নটি যে কেউ করতে পারে যে, এক দু'টো করে স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ করা হলে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে দু'জন কী সমান অধিকার পেতে পারে ? এ প্রশ্নের উত্তর কখনো হ্যাঁ বোধক হবে না । তাহলে নাগরিকের অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য সৃষ্টির দায় কার ? আমাদের রাষ্ট্র কিংবা সরকারের এ দায় এড়াবার কোনো সুযোগ নেই ।                                          
আমাদের স্বাধীনতার বয়স পঞ্চাশ বছরের সামান্য একটু কম । এ সময়টাতে শিক্ষায় যেমন বহু অর্জন তেমনি কলংকের বোঝাটা ও একেবারে ছোট নয় । আমাদের শিক্ষা আজো বিশ্বমানে উন্নীত হয়নি । নোট গাইড, কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁসের মত জঘন্য বিষয়গুলো সারা দুনিয়ায় আমাদের মাথা হেট করে রেখেছে । ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্ণিং বডির দৌরাত্ম্য জায়গায় জায়গায় চরম পর্যায়ে । কোনো কোনো জায়গায় প্রিন্সিপ্যাল-প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে পিয়ন ও দারোয়ান পর্যন্ত এদের হাতে নিত্যদিন শারীরিক কিংবা মানসিক নানা রকম নির্যাতনের শিকার । এসব দেখার কেউ নেই । শিক্ষকদের ন্যুনতম মান সম্মান বাঁচিয়ে শিক্ষকতা পেশা চালিয়ে যাবার এখন কোনো গ্যারান্টি নেই । এ হলে শিক্ষকতা পেশায় কে আসবে ?  এমনিতে বেসরকারি বলে আজকাল মেধাবীরা বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে । এ এক মারাত্মক উদ্বেগের কথা । আমি প্রায়ই বলে থাকি আমাদের সরকার মনে হয় শিক্ষার মানের চেয়ে স্কুল-কলেজে দালান বিল্ডিং তৈরিতে  বেশি আগ্রহী । কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না যে দালান কোঠা নির্মাণের চেয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন আজ বেশি দরকারি হয়ে ওঠেছে । আর শিক্ষার মান বাড়াতে মেধাবী তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হবে । সরকারিকরণ ছাড়া এ কাজটি সম্ভব নয়। প্রাথমিক শিক্ষাস্তরটি সরকারিকরণ করা হয়েছে বলে মেধাবী তরুণেরা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে । অনেকে হাই স্কুল ও কলেজের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে প্রাইমারিতে ঢুকছে । সে কী আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাস্তর সরকারিকরণের কারণে নয়? আমাদের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে এখন পর্যাপ্ত শিক্ষক । প্রায় স্কুলে সাত-আট জন কিংবা দশজনের স্টাফ । বেশির ভাগ শিক্ষক অনার্স মাস্টার্স কম্পলিট করা । কিন্তু বেশিরভাগ বেসরকারি স্কুল কলেজে মানসম্মত শিক্ষকের এখন বড়ই আকাল । এই আকাল কাটিয়ে উঠতে সকল স্কুল-কলেজ একত্রে সরকারিকরণ না করলে শিক্ষার এ স্তরে আমাদের দুর্দিন ঘুচবেনা । জাতি অন্ততঃ শিক্ষায় আর বেশি দিন কোনো দৈন্যদশা দেখতে রাজি নয় ।                   

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট,  সিলেট ও দৈনিক শিক্ষার নিজস্ব সংবাদ বিশ্লেষক।

বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ - dainik shiksha বেসরকারি স্কুলে ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ এমপিওভুক্ত হচ্ছেন আরও ২২৮ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন আরও ২২৮ শিক্ষক পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার আদেশ জারি - dainik shiksha পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার আদেশ জারি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ  বাতিল - dainik shiksha প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এমসিকিউ বাতিল স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী - dainik shiksha স্ত্রীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্বামী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website