সরকারি পদে কেউ চিরস্থায়ী নয় - মতামত - Dainikshiksha

সরকারি পদে কেউ চিরস্থায়ী নয়

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী |

ওরা সিভিল সার্ভিসের তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষাগত শ্রেষ্ঠত্বে গৌরবান্বিত বিভিন্ন ক্যাডারের ৮৫ জন সদস্য। বিপিএটিসিতে এটি তাদের প্রশিক্ষণের প্রথম পাঠ। আমন্ত্রিত হয়েছি Transparency I Accountabilityর ওপর বক্তৃতা দিতে। তাদেরকে সহজবোধ্য ভাষায় বলেছি,Transparencyর মর্মার্থ হলো, 'তোমার আচরণ, সরকারি দায়িত্ব পালন এবং সেবা প্রদান অবশ্যই জনগণের পর্যবেক্ষণ, বিশ্নেষণ ও মূল্যায়নের অংশ।' আর AccountabilityÕর সংজ্ঞায় বলেছি, 'তোমার বিবেক যেন থাকে সদা জাগ্রত, তোমার প্রতিদিনের দায়িত্ব পালন কত নির্ভুল, নির্মোহ ও ন্যায্য।'

সরকারি কোষাগার থেকে গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জনপ্রশাসন খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৪ হাজার কোটি টাকা, যা সমগ্র বাজেটের ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তোমরা বিশ্নেষণ কর, এ বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে জনগণকে দেওয়া সেবা অর্থনীতির ভাষায় কতটুকু  Cost-effective। প্রশাসন ও জনগণের সম্পর্ক অনুগ্রহকারী ও অনুগৃহীতের সম্পর্ক নয়। কারণ জনগণের করের অর্থেই আমাদের বেতন-ভাতা এবং বিপরীতে মানুষ চায় প্রশাসনের স্নেহ ও যত্নে মোড়ানো সেবা। নবীন কর্মকর্তারা সৌভাগ্যবান। কারণ তাদের বেতন কাঠামো অনেক উন্নত। অথচ চাকরির দীর্ঘ সময় অনেক নগণ্য বেতন স্কেলেও আমরা বজায় রেখেছি দায়িত্ব পালনে অফুরন্ত প্রাণবন্ততা; আমাদের মস্তিস্কের নিউরনে প্রবেশ করেনি দুর্নীতির কল্পনা।

নথির ঊর্ধ্বগামী-নিম্নগামী পরিভ্রমণের যে দীর্ঘসূত্রতা, তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলায়তনের জন্মদাতা। সৎ, অকপট ও ইতিবাচক মন দিয়ে নথির জট খুলতে হবে। তথ্যের সামান্য ঘাটতি বা নগণ্য ভুলত্রুটির জন্য নথি সিদ্ধান্তহীন রাখা যাবে না, কোয়ারির তরবারিতে নথিকে জর্জরিত করা যাবে না। অফিস অনুশাসন শানিত করতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার, মোবাইল ট্র্যাকিং, অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন, অনলাইন রিপোর্টিং, সিসিটিভি ক্যামেরা ইত্যাদি অব্যর্থ মহৌষধ। নিজেদেরCharter of Duties এবং জনগণেরCharter of Rights বোঝাটাই Bureaucracyসার্থকতা। 'মানুষ, মনুষ্যত্ব ও মানবতা'- এ তিন উপলব্ধি হৃদয়মূলে গ্রথিত না থাকলে ব্যুরোক্রেসি ব্যর্থ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়েও জাপান ও জার্মান ব্যুরোক্রেসি তাদের সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব প্রমাণ করেছে। অথচ ব্রিটিশ ব্যুরোক্রেসি অদক্ষ বলে নিন্দিত হয়েছে।

সততার জন্য পুরস্কার ও দুর্নীতির জন্য শাস্তির চর্চা না থাকলে শুদ্ধাচারের প্রচেষ্টা বৃথা। আর্থিক সততাই একমাত্র সততা নয়। দুমুখো নীতি, পক্ষপাতদুষ্ট পলিসি বা আইন ভঙ্গের সংস্কৃতি ইত্যাদি ভিন্ন মাত্রার দুর্নীতি। পুলিশ ও প্রশাসনকে 'আমিত্ব' ও 'শ্রেষ্ঠত্ব' মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠে আনতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা। শোনা কথায় কাউকে শত্রু বানানো যাবে না, অহমিকাবোধ নিয়ে প্রতিপক্ষ ভাবা যাবে না, কান-কথাকে প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যাবে না। 

এক জেলার কর্ণধারের কাছে সম্প্রতি এক সেবাপ্রার্থীকে পাঠিয়েছিলাম তার সমস্যাটি শোনার জন্য। তিনি সাক্ষাতের সময় তাকে বললেন, 'মুনীর স্যার পাঠিয়েছেন বিধায় আপনাকে এত সময় দিয়েছি। নতুবা আমি কাউকে এত সময় দিই না।' মনে রাখতে হবে, সেবাপ্রার্থী একজন মানুষ, আর সেবা প্রদানকারীও একজন মানুষ। প্রতি বছর ২০ হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যান। এর পর পার্থিব জীবন থেকে অবসরের পালা। এভাবে সিভিল সার্ভিসের গৌরবে অভিষিক্ত অতীতের বহু ডাকসাইটে কর্মকর্তা সময়ের পরিক্রমায় চিরনির্জনতায় হারিয়ে গেছেন। এর ধারাবাহিকতায় আমরাও একদিন মানুষের স্মৃতি ও স্মরণের অগোচরে চলে যাব। সুতরাং এমন অহংবোধ যেন আমাদের গ্রাস না করে।

বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি, খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশ দূষণ, নদী ও জলাশয় দখল এবং সড়ক দুর্ঘটনা। এসব সেক্টরে ৫০ শতাংশ অনিয়ম-দুর্নীতি কমানো যাবে ডিজিটালাইজেশনে, বাকি ৫০ শতাংশ কমানো যাবে আইনের শাসনে। নবীন কর্মকর্তা হিসেবে বুকে ধারণ করতে হবে দেশ, প্রতিষ্ঠান ও মানুষকে। এসব অন্তরে স্থান না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানবাদ(Institutionalization) দুর্বল হয়ে পড়ছে। মানুষ পরিবেশ সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, নদনদী রক্ষা ও সড়ক নিরাপত্তা দেখতে চায়। হাইকোর্টের অব্যাহত আদেশ সত্ত্বেও এখনও হাইড্রোলিক হর্ন চলছে দাপটে। রাজধানীতে কঠোর নির্র্দেশনা ভেঙে দিনে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় করে চলেছে ইজিবাইক। কী পরিহাস!

১০ বছর আগে মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট থাকতে বিএসটিআইকে সিএনজি স্টেশনের গ্যাস চুরি বন্ধে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সিএনজি গ্যাস স্টেশনে নীরবে ক্রেতারা ঠকছে। অথচ বিএসটিআই এ কারচুপি বন্ধে আজও যথাযথ প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে পারেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত Doing Business Report 2017-Gi Global Rankingএ বাংলাদেশের অবস্থান দেখানো হয়েছে ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৬তম। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ, ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি, শিল্প-কারখানা ও ভবন নির্মাণের অনুমতি, আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া, ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে গ্রাহকদের অজস্র ভোগান্তি। এক টুকরো কাগজ বা অনুমতি পাওয়া যেন বিশাল মরীচিকা। একেকটির অনুমোদনে প্রয়োজন ২৬৯ দিন থেকে ৩ বছর ১১ মাস পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ। কপালে ঘামের ফোঁটা এবং ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে মানুষ সরকারি দপ্তরে যেন না আসে, এ নিশ্চয়তাই সত্যিকারের Transparency I Accountability. 

এক প্রকৌশলীর অবসর ভাতার নথি নিষ্পত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা সময় নিয়েছেন মাত্র ১১ মাস (!)। দুর্ভাগ্য, অবসরপ্রাপ্ত ওই প্রকৌশলী দু'দফা ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে লন্ডন থেকে দু'বার আসা-যাওয়া করেছিলেন শুধু ৫ লাখ টাকা ভাতা পাওয়ার জন্য। দুদক থেকে কঠোর চাপ দিয়ে এ নথি আমাকে বের করতে হয়েছিল।

শুধু কলমের আঁচড়ে সুশাসন আসে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোকে একটি প্রশাসনিক ভুলের জন্য ১০০ ডলার অর্থদণ্ড পেতে হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে কত তুচ্ছ কারণে আইন আমাদের হাতে পদদলিত হয়! সিভিল সার্ভিসে এখন বেতন-ভাতা, পদোন্নতি ও যানবাহনের প্রচুর সুবিধা। সুতরাং জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবার জন্য চাই দক্ষতা, সততা ও নীতিতে নিষ্ঠতা। জীবনের বিবর্তনের ধারায় মানুষ তার পাপ-পুণ্য হাতে নিয়ে মহান স্রষ্টার সম্মুখে উপস্থিত হয়, যার কাছে মানুষের চূড়ান্ত জবাবদিহি। এ নিয়ে সংশয়বাদিতায় মানুষ পাপ-পুণ্যের পার্থক্য ভুলে যায়। আমাদের এ জীবনটা এক করিডোর, পরজীবন ইহজীবনেরই অবিচ্ছিন্ন ধারা। মহাজাগতিক পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের পদমর্যাদা ও ক্ষমতা ক্ষুুদ্র ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র, নগণ্য। জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস উদযাপনকালে এ বাস্তবতা উপলব্ধির আহ্বান জানাই সব ক্যাডার, সংস্থা ও বিভাগের কর্মকর্তাদের। 

লেখক: মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন

সৌজন্যে: সমকাল

সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর - dainik shiksha সরকারিকরণের দাবিতে শিক্ষক সমাবেশ ৫ অক্টোবর অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু - dainik shiksha অনলাইনে এমপিও আবেদন শুরু ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে - dainik shiksha ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতার ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ - dainik shiksha দাখিল আলিম পরীক্ষায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website