সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতায় আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে বিদেশীরা - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতায় আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে বিদেশীরা

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর অঞ্চল ১১-এর অধীনে আয়কর দেয় সাড়ে নয় হাজার বিদেশী নাগরিক। যদিও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট ছিল প্রায় ২৩ হাজার ৮৫৪ জন বিদেশীর। অন্যদিকে বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র বলছে, বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে দেশে কর্মরত বিদেশীর সংখ্যা আড়াই লাখেরও বেশি, যারা ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করছে। ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় তাদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বণিকবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন সুকান্ত হালদার।

 প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, বিদেশীদের আয়করের আওতায় আনতে না পারার জন্য সরকারের দুর্বল নজরদারি ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের ওপর সরকারের নজরদারি খুবই দুর্বল। এছাড়া বিদেশী কর্মীদের কাজের অনুমতি দেয়া এবং তাদের কাছ থেকে কর আদায়ে আইন থাকলেও তার খুব একটা প্রয়োগ নেই। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমেও গতি নেই। টাস্কফোর্সের অন্তর্ভুক্ত সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় গত তিন বছরেও গতি পায়নি সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) ‘ডাটা ব্যাংক’-এর কার্যক্রম। এমনকি বিমানবন্দরগুলোতে বিদেশী কর্মীদের জন্য আয়কর বুথ চালুর কথা থাকলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে খুব সহজেই ভ্রমণ ভিসায় এসে নানা কাজে যুক্ত হতে পারছে বিদেশীরা।

২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এনবিআরে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিদেশীদের কর ফাঁকি অনুসন্ধানে টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পুলিশের এসবি, ডিজিএফআই, এনএসআই, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেপজা, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, এনজিও ব্যুরো ও এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এ টাস্কফোর্সের কাজ ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে কর ফাঁকিবাজ বিদেশীদের চিহ্নিত এবং কর্মরত বিদেশীদের ডাটাবেজ তৈরি করা।

তবে সরকারের এসব সংস্থা বিদেশী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে কাজ করলেও দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের বিষয়ে কোনো সমন্বয় ছিল না। তার ওপর সিআইসি ‘ডাটা ব্যাংক’-এর কার্যক্রম যখনই স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করে, তখনই বিভিন্ন মহল থেকে আসতে থাকে অদৃশ্য সব চাপ। এর পরই কার্যক্রমে নেমে আসে এক ধরনের স্থবিরতা।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, যখনই ‘ডাটা ব্যাংক’-এর কার্যক্রম বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়, তখন দেখা যায় বাংলাদেশে বিদেশী যারা কাজ করছে তারা, না হয় ওই প্রকল্পের বিনিয়োগকারী অথবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ  নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের কাছ থেকে অদৃশ্য চাপ আসে। এ কারণে সিআইসির কাজে কখনো কখনো বেশ গতি দেখা যায়, আবার হঠাৎ করেই সব স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে বিদেশী নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যাই এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নথিতেও রয়েছে ভিন্ন তথ্য।

বিডার তথ্যমতে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত দেশে বিদেশী শ্রমিক ছিল প্রায় ২৩ হাজার ৮৫৪ জন। এর মধ্যে শিল্প অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ মোট ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে ১৪ হাজার ৯১ জনের। আর বাণিজ্য অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ মোট ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে ৯ হাজার ৭৬৩ জনের। যদিও ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশে মোট ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশী নাগরিক কাজ করছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন ভারতের নাগরিক।

জানা গেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিদেশী কর্মী কর্মরত তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে। তাদের মধ্যে ভারত ও শ্রীলংকার নাগরিকই বেশি। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক এনজিও, চামড়া শিল্প, চিকিৎসাসেবা এবং হোটেল ও রেস্তোরাঁয়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশী কাজ করছে, যাদের বড় একটা অংশ ভ্রমণ ভিসায় এসেছে। ফলে তাদের কাজের অনুমতি নেই। এ রকম অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ ভিসা নিয়ে অবস্থান করা বিদেশীরা প্রতি তিন মাস পরপর নিজ দেশে ফিরে যায়। এরপর দ্রুত নতুন পর্যটন ভিসা নিয়ে এসে একই বা একই ধরনের কাজে যোগদান করেন।

নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করতে হলে বিডার অনুমতি নিতে হয়। এর বাইরে এনজিও ব্যুরো ও বেপজা বিদেশীদের কাজের অনুমতি দিয়ে থাকে। বিদেশীদের হয়ে তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অনুমতি নেয়ার কাজটি করে থাকে।

বিডা বলছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী গ্রুপ সরাসরি বিদেশীদের চাকরিতে নিয়োগ দিলে তা হবে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে এজন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে, যদিও তার প্রয়োগ নেই।

বিডার নির্বাহী সদস্য (ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) ও অতিরিক্ত সচিব নাভাস চন্দ্র মণ্ডল এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা বিনিয়োগ রেজিস্ট্রেশন (প্রতিষ্ঠান), বিদেশীদের কাজের ওয়ার্ক পারমিট প্রদান, ভিসা প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে কাজ করি। আয়করের বিষয়টি দেখে রাজস্ব বিভাগ। যারা এখানে বৈধভাবে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। অবৈধভাবে যারা কাজ করে তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, যারা বৈধভাবে কাজ করে আমরা দেখি তারা ঠিকঠাক মতো আয়কর পরিশোধ করছে কিনা। তাদের আয়করের ক্লিয়ারেন্স আছে কিনা। এটি যথাযথ থাকলে আমরা পরবর্তী মেয়াদে তার কাজ করার মেয়াদ বাড়িয়ে দিই। এর বাইরে আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ঘাটতি কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে সম্প্রতি আবারো বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এনবিআরের ডাটা ব্যাংকে বিদেশী নাগরিকদের  দেশ, তারা যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে তার নাম, কাজের ধরন, আয়সহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য থাকবে। যাতে বিদেশীদের আয়ের ওপর আরোপিত কর স্বচ্ছতার সঙ্গে আদায় করা যায়।

ডাটা ব্যাংকের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, অতীতে দেখা গেছে, আমরা এ বিষয়ে বেশ তোড়জোড় করে যখন কাজ করছি, তখন সংশ্লিষ্ট বিদেশী কর্মীদের দিক থেকে, না হয় যারা প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, তাদের দিক থেকে কিংবা যারা বাংলাদেশে তাদের নিয়োগ দিয়েছে তাদের দিক থেকে চাপ আসে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিংবা দায়িত্বশীল জায়গা থেকেও চাপ আসে, যাতে বিষয়গুলো নিয়ে আর সামনে এগোনো না হয়। আমাদের আবার এসব বিষয় খেয়াল রেখেও কাজ করতে হয়। এ ধরনের জটিলতা সামনে রেখেই কাজ করতে হয়।

প্রসঙ্গত, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) কর অঞ্চল ১১-এর অধীনে আয়কর দিয়েছে মোট সাড়ে নয় হাজার বিদেশী কর্মী। তাদের সম্মিলিত আয়করের পরিমাণ ছিল ১৮১ কোটি টাকা। মোট আয়ের ৩০ শতাংশ আয়কর হিসেবে এ সময় বিদেশী কর্মীদের মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০৩ কোটি টাকা। আর মাসিক গড় বেতন দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ হাজার টাকা বা ৬০০ ডলারের কাছাকাছি।

বিদেশী কর্মীরা যাতে অর্থ পাচার ও রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্য এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রাহমাতুল মুনিম। অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করা বিদেশীদের তথ্য জোগাড় এবং অবৈধ বিদেশীদের নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নিতে বিশেষ নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (আয়কর) কানন কুমার রায় বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী কর্মীদের আয়কর ফাঁকি দেয়ার বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনেকদিন ধরেই কাজ করছে সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু কিছু বাধার কারণে বিদেশী কর্মীরা যে বড় অংকের আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে, সেটি রোধ করা যাচ্ছে না। কয়েক বছর আগে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছিল, তবে তাতেও কিন্তু খুব একটা সুফল পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আমি রাজস্ব বিভাগের যেসব পরিকল্পনার কথা শুনেছি, সেগুলোর যদি সঠিক বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বিদেশী কর্মীদের আয়কর ফাঁকির অনেক বিষয়ই রোধ করা যাবে।

একাদশে শিগগিরই ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে : শিক্ষামন্ত্রী - dainik shiksha একাদশে শিগগিরই ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে : শিক্ষামন্ত্রী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা বন্ধের পরিকল্পনা নেই : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা বন্ধের পরিকল্পনা নেই : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী করোনায় আরও ৪১ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩ হাজার ৩৬০ - dainik shiksha করোনায় আরও ৪১ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩ হাজার ৩৬০ অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হতে পারছেন না প্রভাষকরা: রুলের জবাব দেয়নি সরকার - dainik shiksha অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ হতে পারছেন না প্রভাষকরা: রুলের জবাব দেয়নি সরকার ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ নামে আরেকটি বই প্রকাশ হবে - dainik shiksha ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ নামে আরেকটি বই প্রকাশ হবে শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান - dainik shiksha শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে লেখা আহ্বান শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে টেসলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ - dainik shiksha শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে টেসলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক - dainik shiksha বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কনটেন্ট দিচ্ছে টিউটর্সইঙ্ক শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে - dainik shiksha শিক্ষকদের ফ্রি অনলাইন প্রশিক্ষণ চলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website