সান্ধ্যকালীন কোর্স, তোরই সব দোষ - মতামত - দৈনিকশিক্ষা

সান্ধ্যকালীন কোর্স, তোরই সব দোষ

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

জন বা গণ বিশ্ববিদ্যালয় অথবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে ইদানীং জোরদার আলোচনা হচ্ছে। আলোচনাটি আগেও ছিল। কেন যেন সাধারণভাবে একটি ধারণা বা পারসেপশন তৈরি হয়েছে যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কথাটি হচ্ছে, কেউ যদি, সে তিনি শিক্ষক হন, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, আমলা বা ব্যবসায়ী যে পেশার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট থাকুন না কেন; তিনি যদি বৈধভাবে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করেন, তাহলে সমস্যা কোথায়? যে কোনো মানুষই পড়াশোনা করে, পরিশ্রম করে, জীবন সংগ্রামে নানা কঠিন সময় পার করে কিছু লক্ষ্য সামনে রেখে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে ভালো থাকা। ভালো থাকা মানে, আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকা; আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বউ-বাচ্চা, মা-বাবা নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাপন করা। শনিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে এ তথ্য জানা যায়।

সম্পাদকীয়তে আরও জানা যায়, মানুষের জীবন মানে গাছের ওপর পাখির বাসা নয় বা পানির নিচে মাছের বসতিও নয়। অর্থপূর্ণ মানব জীবনের জন্য অনেক কিছু প্রয়োজন। তিন বেলা খেতে পেলে, শরীর ঢাকার ন্যূনতম বস্ত্র পেলে এবং মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই পেলেই মানুষের জীবন চলে না। তার মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনকে দেখতে হয়, ছেলেমেয়ে মানুষ করতে হয়, নিজের বিপদাপদ, বার্ধক্য ও নাজুক অবস্থার জন্য প্রস্তুতি রাখতে হয়। আর এসব বিষয়ের অধিকাংশ নিশ্চিত করার জন্য ন্যূনতম অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থ অনেকেই, বিশেষ করে সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষরা মেধা দিয়ে ও পরিশ্রম করে বৈধ উপায়ে উপার্জন করতে চান। সেই সুযোগটি না থাকলে ওই নিষ্ঠাবান লোকগুলোর যেমন কষ্ট হয়, তেমন বৃহত্তর সমাজ এবং রাষ্ট্রেও তৈরি হয় নানা সমস্যা।

কিংবদন্তি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কথা মনে পড়ছে। মুক্তিযুদ্ধের আগের ঘটনা হবে। রাজ্জাক স্যারকে একজন বিদেশি সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নাকি সব কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছেন এবং তারা বিপ্লবের জন্য ছাত্রছাত্রীদের খেপিয়ে তুলছেন?’ তখন রাজ্জাক স্যার উত্তর দিয়েছিলেন, ‘দেখুন! এ কথার উত্তর পাওয়ার জন্য আপনাকে দেখতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কী পরিমাণ বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খেয়ে-পরে ভালো থাকেন, তাহলে তাদের কমিউনিস্ট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’ [এবং বিপ্লবে উসকানি দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।]

যাই হোক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে যে মৌলিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- ১. জনবিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নিয়মিত (দিবাকালীন) শিক্ষার্থীদের জন্য, সান্ধ্যকালীন কোর্সের মাধ্যমে বিভিন্ন পেশা, শ্রেণি ও বয়সের মানুষকে শিক্ষা প্রদান করার জন্য নয়। ফলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর মধ্যে দিবাকালীন ও সান্ধ্যকালীন কোর্স সাংঘর্ষিক। ২. বাংলাদেশের সংবিধানের শিক্ষাসংক্রান্ত যে অনুচ্ছেদটি আছে, তার মূল চেতনা হচ্ছে- শিক্ষাকে পণ্য করা চলবে না।  ৩. সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করার পেছনে মূল বিবেচনাটি বাণিজ্যিক। এর পেছনে শিক্ষার বিস্তার, সামাজিক দায়বদ্ধতা ইত্যাদির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ৪. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে নিয়মিত (দিবাকালীন) শিক্ষার্থীদের প্রতি। শিক্ষকরা সান্ধ্যকালীন কোর্সের প্রতি অধিক মনোযোগ দেওয়ায় নিয়মিত শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের যথাযথ মনোযোগ পাচ্ছেন না।
আমি এ কথা বলব না যে, সান্ধ্যকালীন কোর্সের সবকিছু ভালো। আবার এ কথাও ঠিক যে, কিছু কিছু সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ আছে। তবে কোনো গবেষণা বা তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে যে ঢালাও অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার সঙ্গে আমি একমত নই। সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করে শিক্ষকরা লাখ লাখ টাকা নিয়ে যাচ্ছেন- এ অভিযোগটিও সত্যি নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের নানা বিভাগ চার মাসভিত্তিক সান্ধ্যকালীন সেমিস্টার পরিচালনা করে। কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলো ছয় মাসের, কোনো কোনো বিভাগ চার মাসের সেমিস্টার পরিচালনা করে। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ৮১টি বিভাগ ও ১৩টি ইনস্টিটিউট থাকলেও ৩০টির মতো বিভাগ ও ২-৩টি ইনস্টিটিউট সান্ধ্যকালীন কোর্স পরিচালনা করে।

সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোয় প্রতি সেমিস্টারের জন্য অনুষদ ও বিভাগভেদে একজন অধ্যাপককে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপকরা পান আরও কম। চার থেকে ছয় মাসের একটি সেমিস্টারে একজন অধ্যাপক ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি ব্যাচের ২২ বা তদূর্ধ্ব ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়া, খাতা দেখা, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেনটেশন নেওয়ার পর হাতে পান ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিভাগভেদে একজন অধ্যাপক মাসে ১৬ হাজার ৬৬৬ থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা হাতে পান। ইনফ্লেশন, বাড়ি ভাড়া, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচের ঊর্ধ্বগতির বাজারে মাসে ১৭ থেকে ৩০ হাজার টাকা কি বেশি কিছু? এরপর আমি সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলো নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সে বিষয়ে মনোযোগ দিতে চাই। প্রথম বিষয়ের ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিক্ষার প্রসার ও গবেষণা কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণাসংক্রান্ত চারটি প্রোগ্রাম পরিচালনা করে- অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি। শিক্ষা ও গবেষণাসংক্রান্ত এসব প্রোগ্রামের বাইরেও বিশে^র বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পেশাজীবীদের জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত মাস্টার্স ও ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। সমাজের সর্বস্তরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তার ও দক্ষ মানবশক্তি গড়ে তোলার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এটি করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়, জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়, এআইটি; কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, সিমোন ফ্রেসার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৩টি অনুষদ নিয়ে যাত্রা করে। এ ৩টি অনুষদ হচ্ছে- বিজ্ঞান, কলা ও আইন। এর মধ্যে আইন অনুষদে অনার্স চালু হয় ১৯৭৩ সালে। তার আগে এ অনুষদের শিক্ষা কার্যক্রম ছিল সান্ধ্যকালীন। ১৯৬০ সালে চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটও প্রথম থেকেই ছিল সান্ধ্যকালীন। তাহলে দিবাকালীন ও সান্ধ্যকালীনের বিভাজনটি আর থাকল না। মূল যে বিষয়টি দাঁড়াল, তা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হচ্ছে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা; সেটি দিবাকালীন হোক, অথবা হোক বৈকালিক বা সান্ধ্যকালীন।

দ্বিতীয় আলোচনার বিষয়টি সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ নিয়ে। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ, অর্থাৎ শিক্ষাসংক্রান্ত সংবিধানের একমাত্র অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, (খ) সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করার জন্য এবং যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এ অনুচ্ছেদের মূল চেতনা হচ্ছে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে শিক্ষাকে পণ্য বানানো যাবে না। এটি যদি হয় সংবিধানের মূল চেতনা, তাহলে প্রথমে বন্ধ করতে হবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলো, যেখানে একজন শিক্ষার্থী কোটি টাকা খরচ করে ডাক্তারি পাস করছেন। আর টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা ডাক্তারদের কাছে আমাদের জীবন যে নিরাপদ নয়, সে কথা বলাই বাহুল্য।

সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলো চালু করার পেছনে আর্থিক বিবেচনা ছিল না, তা আমি বলব না। তবে এর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিশেষায়িত জ্ঞানের বিস্তার ঘটানোর বিবেচনাটিও ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোয় পড়াশোনা করতে আসেন বিচারক, আইনজীবী, সামরিক কর্মকর্তা, ব্যাংকার, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এতে শিক্ষকের তাত্ত্বিক জ্ঞান ও পেশাজীবীদের প্রায়োগিক জ্ঞানের একটি মেলবন্ধন রচিত হয়, যা সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর বলে অনেকেই মনে করেন।

আর স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একদিন না একদিন সান্ধ্যকালীন কোর্সে যেতেই হতো। কেননা, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করার জন্য গঠিত ফরাসউদ্দিন কমিটি তাদের রিপোর্টে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারি নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নের দিকে মনোযোগ দিতে বলেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ২৬ বছর মেয়াদি যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে, সেখানেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব অর্থায়নের কথা জোর দিয়ে বলা হয়।

চতুর্থ যে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে, সে ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে- শিক্ষকদের সব শিক্ষা ও গবেষণাসংক্রান্ত কাজে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবে অগ্রাধিকারের কথা জিজ্ঞাসা করলে আমি বলব, শিক্ষকদের অগ্রাধিকার হবে মৌলিক গবেষণা এবং অনার্স ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন ও লারনিং আউটকামের ওপর। এ দুটিকে বাদ দিয়ে কোনো কিছু করা শিক্ষকদের জন্য আত্মঘাতী বলেই আমি মনে করি, যদিও আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি আছে। উপরন্তু, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভুটানের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পান, তার তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকরা পান অনেক কম।

 লেখক : শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram - dainik shiksha Admission going on at Navy Anchorage School and College Chattogram একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website