সিন্ডিকেটের খপ্পরে বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপার কাজ - বই - দৈনিকশিক্ষা

সিন্ডিকেটের খপ্পরে বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপার কাজ

দৈনিকশিক্ষা ডেস্ক |

আগামী শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে প্রায় ৭০ লাখ কপি বইয়ের চাহিদা কমেছে। তবে প্রাথমিক স্তরে বইয়ের সংখ্যা কমছে না। এই দুই স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ এবারও বিশেষ সিন্ডিকেটের খপ্পরে পরছে। তারা জোটবদ্ধভাবে সরকারের প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে দরপত্র জমা দিয়েছেন। এতে সরকারের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার উপক্রম হলেও বইয়ের মান রক্ষায় বেশ উৎকণ্ঠায় পরেছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেছেন, ‘সর্বনি¤œ রেটই (দর) একমাত্র মাপকাঠি নয়। দরদাতা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, অভিজ্ঞতাসহ অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই কার্যাদেশ দেয়া হবে। বইয়ের মান রক্ষায় যা যা করণীয় তাই করা হবে।’

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, চারজন প্রভাবশালী মুদ্রাকর জোটবদ্ধভাবে সরকারের প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ২৫/৩০ শতাংশ কমমূল্যে দরপত্রে অংশ নিয়েছেন। এতে ওই চারজনের কব্জায় চলে যাচ্ছে মাধ্যমিক স্তরের প্রায় অর্ধেক পাঠ্যবই ছাপার কাজ। পেশাদার ও সাধারণ মুদ্রাকরদের অনেকেই বই ছাপার কাজ পাচ্ছেন না। ওই সিন্ডিকেটে (জোট) বিএনপিপন্থি মুদ্রাকর, নিষিদ্ধ নোট-গাইড বইয়ের ব্যবসায়ী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের আশির্বাদপুষ্ট প্রকাশকও রয়েছেন।

এ নিয়ে এনসিটিবির কর্মকর্তারা বেশ বেকায়দায় রয়েছেন। কারণ রাতারাতি গজিয়ে উঠা একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত বছর সরকারের বই ছেপে বিক্রির অনুমোদন নিয়ে নিম্নমানের কাগজের বই ছাপার অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের কব্জায় এবার মাধ্যমিক স্তরের বিপুল সংখ্যক বই ছাপার কাজ যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এনসিটিবি’র সদস্য (টেক্সট) প্রফেসর ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যখন বইয়ের প্রাক্কলিত কস্ট (দাম) নির্ধারণ করি, তখন টনপ্রতি কাগজের মূল্য ছিল ৭০ হাজার টাকা, বর্তমানে এটি কমেছে। কিন্তু ব্যবসায়ী অপ্রত্যাশিত কম দামে টেন্ডার ড্রপ করেছে। তারা মাধ্যমিকে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে এবং প্রাথমিকে ২৬ থেকে ৩০ শতাংশ কম মূল্যে টেন্ডার জমা দিয়েছে।’

এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, গত বছর নি¤œমানের বই বিক্রির সঙ্গে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবার মাধ্যমিক ২৫টি এবং প্রাথমিকের ১০টি লটে প্রায় পাঁচ কোটি বইয়ের কার্যাদেশ নেয়ার চেষ্টা করছে ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দেখিয়ে। ওই প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ নোট-গাইড বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

এদিকে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি শহীদ সেরনিয়াবাত গত ২০ জুলাই শিক্ষা সচিবের কাছে এক চিঠিতে বলেছেন, ‘৮ম শ্রেণী পর্যন্ত নোট, গাইড ও সহায়ক বই মুদ্রণ ও বাজারজাতকরণ আইনগত নিষিদ্ধ। কাজেই নিষিদ্ধ বই ছাপার অভিজ্ঞতা এনসিটিবি’র পাঠ্যপুস্তক ছাপার যোগ্যতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’ এর যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহ যে নোট ও গাইড বই মুদ্রণ করে তা পাঠ্যপুস্তকের সম সাইজের নয়। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ হয় ২০ ‘কাট অফ সাইজ মেশিনে এবং নোট গাইড বই মুদ্রণের মেশিন সাইজ ২২’। তাছাড়া অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবহন এই তিনটি উল্লেখ থাকলেও নোট ও গাইড বই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে মুদ্রণ করা হয়ে থাকে, এসব বই বাঁধাই করা হয় অপর একটি প্রতিষ্ঠানে যা অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হয় না। আর নোট ও গাইড বই বাজারে বিক্রি হয় বলে এর পরিবহন করতে হয় না।’

এছাড়াও পুস্তক মুদ্রক ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান ওইসব বিষয় উল্লেখ করে এনসিটিবির সদস্যের (অর্থ) কাছে চিঠি দিয়েছেন।

কম দামে কাজ নিয়ে মানস্মত বই তারা কীভাবে দেবেন-এমন প্রশ্নের জবাবে ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরাও কিছুটা শঙ্কায় আছি তারা কোয়ালিটি বই কিভাবে দেবেন। তবে তাদের চাপে রাখার কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। প্রথমত, তাদের কাছ থেকে পিজি (ফারপরমেন্স গ্যারান্টি বা জামানত) আগে রাখা হত ১০ শতাংশ, এবার এটি ২০ শতাংশ করা হচ্ছে। আগে এনসিটিবি’র পাশাপাশি, ডিপিই (প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় বই ছাপার কাজ মনিটরিং করত। এবার আরও একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।’

মাধ্যমিকের বেশ কয়েকটি লটের বই ছাপার কাজ পেতে যাওয়া একজন প্রভাবশালী মুদ্রাকর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা ব্যাংক থেকে লোন (ঋণ) নিয়ে বই ছাপার কাজ করি। গচ্চা দিয়ে কাজ করব না। লাভ করার জন্যই ব্যবসা করি।’

তবে ৩০ শতাংশ কম দরে কাজ নিয়ে মানসম্মত বই কীভাবে দেবেন-জানতে চাইলে ওই মুদ্রাকর বলেন, ‘মানের কোন শেষ নেই। এটি রক্ষার দায়িত্বও ব্যবসায়ীদের না।’

সিন্ডিকেটের খপ্পরে বিনামূল্যের পাঠ্যবই

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজ তৈরির পাল্পের দামে দরপতন, নতুন অর্থবছরে বাজেটে কাগজের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট (২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ) হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী রপ্তানি বন্ধ থাকায় টনপ্রতি কাগজের দাম কমেছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এসব বিবেচনায় নিয়েই প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করেছিল এনসিটিবি। কিন্তু সরকারের প্রাক্কলিত দামের চেয়ে কম দামে দরপত্র জমা দিয়েছে মুদ্রাকরতের প্রতিষ্ঠানগুলো।

২০২১ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রায় সাড়ে ৩৪ কোটি বই ছাপানো হচ্ছে। এরমধ্যে মাধ্যমিকে প্রায় ২৪ কোটি সাত লাখ বই ছাপানো হবে। মাধ্যমিকের বই ছাপার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা। প্রাথমিকের বই ছাপার প্রায় (গত বছরের চাহিদা অনুযায়ী) দশ কোটি ৫৪ লাখ বইয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপার জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু মুদ্রাকররা অস্বাভাবিক কম মূল্যে দরপত্র আহ্বান করায় ওই টাকা থেকে প্রায় ৩০০ কোটি সাশ্রয় হচ্ছে বলে এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এনসিটিবি জানিয়েছে, প্রাথমিকের সাড়ে ১০ কোটি বই ছাপাতে বিগত বছরের ন্যায় এবারও ৯৮টি লটে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। বিদেশি দুটি প্রতিষ্ঠানসহ দেশীয় শতাধিক প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিয়েছে। দরপত্রের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রায় সবকটি প্রতিষ্ঠানই প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ২৬ থেকে ৩০ শতাংশ কমে দরপত্র জমা দিয়েছেন। এতে গত বছরের চেয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। প্রতি ফর্মা ২ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর প্রাথমিকের একটি বই ছাপতে গড়ে খরচ ২৩ টাকা, এ বছর যা ১৮ টাকা ৩২ পয়সা পরছে।

মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপা হয় সিট মেশিনে, এ স্তরের বই ছাপার কাগজ কিনে দেয় এনসিটিবি। এবার প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন ‘হোয়াইট পেপার’ (৬০ ডিএসএম) ৬৫ হাজার টাকা দরে কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৭০ লাখ কপি বই কমছে

চলতি অর্থাৎ ২০২০ শিক্ষাবর্ষে সারাদেশের চার কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৫৮ জন শিক্ষার্থীর কাছে ৩৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৯৭ কপি পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়। এরমধ্যে প্রাথমিকের ১০ কোটি ৫৪ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের জন্য মোট ২৪ কোটি সাত লাখ কপি বই মুদ্রণের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ হিসেবে গতবারের চেয়ে এবার ৬০ লাখ কপি বই কম ছাপা হচ্ছে।

এক বছরের ব্যবধানে বিপুল সংখ্যক বই কম ছাপার কারণ জানতে চাইলে এনসিটিবি’র বিতরণ নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জিয়াউল হক বলেন, ‘বিগত সময়ে ম্যানুয়ালি বইয়ের চাহিদাপত্র সংগ্রহ করা হতো, মাউশি কর্তৃপক্ষ শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে স্কুল থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে এনসিটিবি’কে দিতো। এতে অনেকেই বাড়তি বইয়ের চাহিদা জমা দিত। কিন্তু প্রথমবারের মতো এবার আমরা নিজ উদ্যোগেই বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনলাইনে সরাসরি স্কুল প্রধানদের কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করেছি। এতে সঠিক তথ্য এসেছে। এছাড়া মাধ্যমিকে বাফার স্টকের (আপদকালীন মজুদ) জন্য বই ছাপার প্রয়োজন পড়ছে না। এ কারণে এবার ৫০/৬০ লাখ কপি বই কম ছাপতে হচ্ছে।

জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের - dainik shiksha জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী - dainik shiksha স্কুল খুললে সীমিত পরিসরে পিইসি, অটোপাস নয় : গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি - dainik shiksha জাতীয়করণ: ফের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেলিম ভুইঁয়া, কর্মসূচির হুমকি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে - dainik shiksha একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করবেন যেভাবে please click here to view dainikshiksha website