please click here to view dainikshiksha website

সৃজনশীল পদ্ধতির অসৃজনশীল প্রয়োগ

দৈনিক শিক্ষা ডেস্ক | আগস্ট ৪, ২০১৭ - ৮:১২ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

সৃজনশীল পদ্ধতি বলিতে মূলত মূল পাঠ্য বইয়ের যে বিষয় রহিয়াছে তথা হইতে সকল প্রশ্ন না করিয়া তাহারই মূল ভাবের আলোকে জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা—এই চারটি ধাপে প্রশ্ন করাকে বুঝাইয়া থাকে। প্রাথমিকভাবে ইহার নাম ছিল কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন। বাংলাদেশের শিক্ষাবিদেরা ইহার প্রয়োগকালে স্নেহবশত ইহার নাম বদলাইয়াছেন। ইহার প্রকৃত অর্থ—পরীক্ষার প্রশ্নগুলি একটি কাঠামো বা স্ট্রাকচারের মধ্যে করা হইবে, যাহা মূলত ঐ চারটি ধাপকে নির্দেশ করিয়া থাকে। বেঞ্জামিন ব্লুম নামক এক শিক্ষাবিদের বিশ্লেষণকে ভিত্তি করিয়া এই পদ্ধতি গড়িয়া উঠিয়াছে, সারা পৃথিবীর ছাত্র-ছাত্রীদেরই এই পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হয়। আমাদের দেশে ২০১০ সাল হইতে ইহা কার্যকর হইয়াছে। তবে সৃজনশীল পদ্ধতির কার্যকারিতা লইয়া শিক্ষাবিদদের মধ্যে দ্বিমত রহিয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে যেই সকল শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন করিবেন তাহাদেরই সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নাই।

পদ্ধতি হিসাবে কিছুটা জটিল হওয়ায় এবং প্রশ্ন করিতে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করিবার বাধ্যবাধকতা থাকায়, সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নের জন্য শিক্ষকরাই গাইড বইয়ের উপর নির্ভর করিতেছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের গাইড বইয়ের প্রতি নির্ভরশীলতা দিনদিন বাড়িতেছে। শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যায় নিরুত্সাহিত করা, গাইডবই নির্ভরতা হ্রাস করা ও কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য বন্ধের লক্ষ্যে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়, কিন্তু ইহার কোনোটিই ঠেকানো সম্ভব হইতেছে না।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সম্প্রতি সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট শীর্ষক প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে (খসড়া) তৈয়ার করিয়াছে। ইহাতে বলা হইয়াছে, প্রকল্পের আওতায় পাঠ্যক্রম ও সৃজনশীল পদ্ধতির উপর প্রদত্ত প্রশিক্ষণের সময়সীমা অপ্রতুল ছিল। ফলে পরিবর্তিত পাঠ্যক্রম শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গাইডনির্ভরতা লক্ষণীয়ভাবে কমাইতে পারে নাই। শিক্ষার্থীরা বলিয়াছেন, তাহারা জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক বিষয়ে প্রশ্নপত্র ভালোভাবে উত্তর দিতে পারিলেও প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতায় গিয়ে খুব একটা ভালো করিতে পারিতেছেন না। শিক্ষকগণও স্বীকার করিয়াছেন, কীভাবে ইহার যথার্থ প্রয়োগ করিতে হয় তাহা তাহারা নিজেরাই ভালোভাবে জানেন না। বাংলার মতো বিষয় কখনোই কেহ প্রাইভেটে পড়িত না বা কোচিং-এ যাইত না। তথাকথিত সৃজনশীল পদ্ধতির জটিলতায় পড়িয়া শিক্ষার্থীদের আজকাল বাংলাও কোচিং সেন্টারে গিয়া পড়িতে হইতেছে।

সৃজনশীল প্রশ্ন করিতে কিছুটা বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয়। সরাসরি পাঠ্যবই হইতে প্রশ্ন উঠাইয়া না দিয়া, মুখস্থভিত্তিক পড়াশোনা হইতে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাহার করিতে এবং তাহাদের অর্জিত জ্ঞানের পরীক্ষা করিতে, অনেক ভাবনা-চিন্তা করিয়া নূতন নূতন প্রশ্ন প্রণয়ন করিতে হয়। কিন্তু শিক্ষকদের যদি সেই যোগ্যতার ঘাটতি থাকে তাহা হইলে এই মহত্ উদ্দেশ্য বিফলে যাইতে বাধ্য। বাস্তবে তাহাই হইয়াছে। একদিকে বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নাই। স্থানীয় পর্যায়ে তদবির ও ঘুষের মাধ্যমে অযোগ্য লোকজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হইতেছেন। শিক্ষক হিসাবে তাহাদের ঘাটতি হয়তো প্রশিক্ষণ দিয়া পূরণ করা যায়। কিন্তু প্রতিবেদন হইতে জানা যাইতেছে, সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তনের পর তাহাদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় নাই। শিক্ষাপদ্ধতি লইয়া যেহেতু বারংবার নিরীক্ষা করিবার অবকাশ নাই, তাই সৃজনশীল পদ্ধতির ব্যাপারে শিক্ষকদের দক্ষ করিয়া তুলিতে হইবে এবং এইজন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিতে হইবে। আর শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত মেধাবীরা যাহাতে সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ ও পরিবেশ প্রস্তুত করিতে হইবে। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ-দুর্নীতি দূর করিবার বিকল্প আর কিছুই নাই। ইহা দূর করিতে না পারিলে প্রশিক্ষণ দিয়াও ফল পাওয়া যাইবে না।

সৌজেন্য: ইত্তেফাক

সংবাদটি শেয়ার করুন:


পাঠকের মন্তব্যঃ ৩টি

  1. পরমানন্দ ঢালী says:

    আমি আগেও লিখেছি সৃজনশীল লেখা পড়া একটা গবেষণামূলক বিষয়। যাদের বেতন ভাতা, সংসার নিয়ে ভাবতে হয় না অন্যের মঙ্গল চিন্তা করে, দেশের উন্নতি কামনা করে এবং মেধাবী শুধু তাদেরই এই পেশায় নিয়োগ দিতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো করে বেশি ফলের আশা করা হয়। এটা করা ঠিক নয়। মেধাবী লোকদের এ পেশায় আকৃষ্ঠ করে ভালো ফলের আশা করা উচিৎ। তার পরেও দেখবেন এমনও শিক্ষক পাওয়া যাবে যাদের মনোভাব হবে, আসি যাই বেতন পাই কাজের জন্যে ঘুষ পাই,যেমনটা হয় অন্যান্য চাকরিতে। কারণ আমরা বাঙ্গালী, কাজ না করে পাওয়ার পথ খুঁজি। শিক্ষকদের অনেক প্রশিক্ষণ হয়েছে,কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। কারণ যারা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন উভয়েরই একই মনোভাব। শুধু অরথের আদান প্রদান।

  2. এমদাদুল হক এখলাছ says:

    যোগ্য seqaep act দের মূল্যায়ন করে এদের job কে parmanent করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি অকর্ষণ করছি।তাহলে এই সংকট দূর হবে বলে আমি মনে করছি।

  3. সালেহ আহমদ,বিয়ানী বাজার ,সিলেট । says:

    ‘শিক্ষকরা সৃজনশীল হলেই ,শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল হবে ’-জাফর ইকবাল স্যার ।

আপনার মন্তব্য দিন