please click here to view dainikshiksha website

সেশনজট কত প্রকার ও কী কী!

মো. কাউছার মিয়া | আগস্ট ১৭, ২০১৭ - ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

সেশনজটে ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার বারোটা বাজছে। বড় ভাইদের কাছ থেকে আমরা যে  কথাটা বেশি শুনতাম সেটা হলো সেশনজট। তাদের আতঙ্কের বিষয় ছিল সেশনজট। আমরা মনে মনে ভাবতাম এটা আবার কী? অনার্সে ভর্তি হওয়ার আগে নানাজনের কাছে নানা রকম কথা শুনলাম সেশনজট নিয়ে। এক বড় ভাইয়ের কাছে শুনলাম যে জাতীয় ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের নাকি চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ করতে ছয় থেকে সাত বছর লেগে যায়। আমাদের চারপাশে ছয় বছরে অনার্স শেষ করা অনেক বড় ভাইকে আমরা নিজেরাও দেখেছি।

আমাদের সেশনটা ছিল ২০১৩-২০১৪। তখন ছিল সরকার বদলের পালা অর্থাত্ জাতীয় নির্বাচন। চারদিকে শুধু হত্যা, মারামারি, জ্বালাও, পোড়াও। এসবের ফলস্বরূপ যেখানে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালের নভেম্বরে, সেখানে পরীক্ষা হয়েছে ২০১৪ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে। চান্স পেলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে গেল অনির্দিষ্টকালের জন্য। বন্ধ থাকলো প্রায় ১৫ দিনের মতো। আবার ক্লাস শুরু হলো।

নভেম্বরে প্রথম সেমিস্টারের ফাইনালের তারিখ দিল। দুইটা পরীক্ষা দিয়ে দিলাম। পরীক্ষা দিতে হবে পাঁচটা। তিন নম্বর পরীক্ষার আগের দিন শুরু হলো গোলাগুলি। ঘণ্টা-দেড়েক মারামারি হলো। পরে শোনা গেল ইন্টারন্যাশনাল ভার্সিটির সুমন নামে এক ছেলে মারা গেছে। এই দিনেই ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ দিয়ে দিল। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলো প্রায় পাঁচ মাস। বন্ধের পরে আমাদের বাকি পরীক্ষাগুলো হলো। তবে তা হয়েছে পূর্ণ এক বছর সময় নিয়ে। ভালো কথা প্রথম সেমিস্টার শেষ হয়েছে পূর্ণ এক বছর সময় নিয়ে। কিন্তু পরের সেমিস্টার শেষ হতেও সময় লেগেছে পূর্ণ এক বছর! তার মানে এক বছরের দুইটা সেমিস্টার তারা শেষ করলো দুই বছরে। তখনই বুঝলাম সেশনজট কাকে বলে? কত প্রকার ও কী কী! এই যে একটা বছর আমাদের জীবন থেকে চলে গেল তা ফিরিয়ে দেবে কে? এ দায়ভার কে নেবে? জানি কেউ নেবে না!

আমরা সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত করার কথা শিক্ষকদের কাছে বললেও তারা তা আমলে নেননি। তারা বলেন ১২ সপ্তাহ ক্লাস না হলে পরীক্ষা নেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু তারা রেজাল্ট দেওয়ার বেলায় দেরি করলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। এক সেমিস্টারের রেজাল্ট আগামী সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও কখনো কখনো তারা রেজাল্ট দেন অনেক পরে। আবার আমরা এর প্রতিবাদ করলে আমরা হয়ে যাই বেয়াদব। যাই হোক, আমরা যেহেতু তাদের কাছে ভালো থাকতে চাই তাই আমরাও আর প্রতিবাদ করি না। একটা বিষয় খুব অবাক লাগে যে জাতীয় ভার্সিটিতে পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য আছে। দারুণ ভারসাম্য! তাদের ভার্সিটির শাখা-প্রশাখা সারা বাংলাদেশ জুড়ে, তবুও তাদের পরীক্ষা যখন শুরু হয় তখন একসাথেই হয় আবার শেষও হয় একসাথে। অপরদিকে পাবলিক ভার্সিটিতে মোটেও ভারসাম্য নেই বললেই চলে। তাদের এক বিভাগের পরীক্ষা এ মাসে হলে অন্য বিভাগের পরীক্ষা পরের মাসেও শুরু হবে কি না তাও বলা যায় না। একটা খাপছাড়া পদ্ধতি।

স্বায়ত্তশাসিত বলে এরা এতটাই স্বাধীন যে কোনো নিয়মের ধার ধারে না। এদের এ রকম উদাসীনতার কারণে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ঝরে পড়ছে। অনেকে হতাশ হয়ে পড়ছে। বাবা-মা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করলে তাদেরকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। তারা বলেন, কিরে তোর চার বছরের কোর্স এ বছর শেষ হওয়ার কথা না? তখন এই তো শেষ হয়ে যাবে একথা বলা ছাড়া আর উপায় থাকে না। যাই হোক, বলছিলাম ভারসাম্যের কথা। আমাদের মনে হয় পাবলিক ভার্সিটিতেও জাতীয় ভার্সিটির মতো পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত। তাহলেই সেশনজট কমিয়ে আনা সম্ভব। পাবলিক ভার্সিটিতে এ ভারসাম্য নেই বলেই কিছু বিভাগ এক সেমিস্টার এগিয়ে আবার কিছু বিভাগ পিছিয়ে। এই যেমন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের কথা বলা যায়। তাদের বিভাগে আমাদের জুনিয়র ব্যাচ অর্থাত্ ২০১৪-২০১৫ সেশনে যারা আছে তারা এখন আমাদের সাথে হয়ে গেছে। এটা একটা বড় সমস্যা এবং বড় লজ্জা পাবলিক ভার্সিটির। এ রকম পরিস্থিতি হলে হয়তো মানুষ এক সময় পাবলিক ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে ভরসা হারিয়ে ফেলবে।

যে ভার্সিটির কথা শুনেছিলাম ছয় বছরে অনার্স শেষ হয় সে ভার্সিটি অর্থাত্ জাতীয় ভার্সিটিই ২০১৪তে নিয়ম করেছে চার বছরের অনার্স কোর্স চার বছরেই শেষ করবে এবং তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স তিন বছরেই শেষ করবে। এবং তারা তা ভালোভাবে কার্যকরও করেছে। এখন আমরা অর্থাত্ পাবলিক ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা যে বছরে চতুর্থ বর্ষে থাকার কথা সে বছরে আমরা আছি তৃতীয় বর্ষে। অপরদিকে জাতীয় ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা ঠিকই চতুর্থ বর্ষে আছে। আমরা কি পাবলিক ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি এক বছর পিছিয়ে যাওয়ার জন্য? অবশ্যই না।

লেখক :শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন