স্কুলব্যবস্থা হোক শিক্ষার্থীবান্ধব - মতামত - Dainikshiksha

স্কুলব্যবস্থা হোক শিক্ষার্থীবান্ধব

কাজী ছাইদুল হালিম |

আমাদের প্রত্যেকের সন্তানসন্ততি আমাদের হৃদয়ের একটা বড় অংশ। আমরা আমাদের শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সব ক্ষমতা দিয়ে তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করি।

বাস্তবে আমাদের সন্তানসন্ততি কতটা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এবং তারা কী ধরনের পরিবেশ পাচ্ছে বেড়ে ওঠার জন্য তার ওপর।

আমাদের সমাজে অর্থাৎ বাংলাদেশে শিশুরা সবসময় একটা চাপের মধ্যে বসবাস করে- সেটা হোক নিজ বাড়িতে বা বিদ্যালয়ে। এই চাপ সাধারণত শিশুদের মুক্ত ও সৃজনশীলভাবে বেড়ে ওঠা থেকে বঞ্চিত করে।

প্রতিনিয়ত পারিপার্শ্বিক চাপে ব্যক্তির অনুভূতি শক্তি লোপ পায়। অনুভূতি শক্তি লোপ পেলে ব্যক্তি, পরিবার, দেশ ও জাতি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। দুর্বল অনুভূতির মানুষ পার্থক্য করতে পারে না ভালো ও খারাপের মধ্যে, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে, এবং মানবিকতা ও অমানবিকতার মধ্যে। অনুভূতি হ্রাস পেলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা থাকে না, আর থাকে না ন্যায়কে সমর্থন করার মতো মনোবল- আমরা হয়ে যাই অনেকটাই অকেজো যন্ত্রের মতো।

সাধারণত বাংলাদেশে দেখা যায়, একটা শিশু জন্মের পর ভালোভাবে চারপাশ বোঝার আগেই তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় একগুচ্ছ বই। আর একই সঙ্গে চলে বাবা, মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় শেখানোর পালা- যেমন ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত গণনা শেখা, ছড়া মুখস্থ করা এবং মাঝেমধ্যে আত্মীয়স্বজন এলে তাদের সামনে মুখস্থ বিদ্যা আওড়ানো।

অবস্থা দেখে মনে হয় আত্মীয়স্বজনরা এসেছে ওই ছোট বাচ্চাটার পরীক্ষা নেয়ার জন্য। অধিকন্তু চলে বিভিন্ন বাংলা শব্দের ইংরেজি অনুবাদ শেখার পালা। একই সঙ্গে বাবা, মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিকল্পনা শুরু হয় সন্তানটাকে বড় হলে কী বানানো হবে। পরিস্থিতি অনেক সময় এমন হয় যে, বাবা বলে ওকে ইঞ্জিনিয়ার বানাব, মা বলে আমার সন্তান ডাক্তার হবে, আবার পরিবারের অন্য কোনো ঘনিষ্ঠ সদস্য বলে বসে ও বিমানের পাইলট হলেই ভালো হবে। বেচারা সন্তান যখন নিজের মনে আনন্দ করে খেলতে চায়, তখন তাকে নিয়ে কত পরিকল্পনা আর চাপই না চলে পরিবারে! খেলাধুলা শৈশবকে প্রস্ফুটিত করার অন্যতম প্রধান উপায়- আপনার সন্তানকে খেলতে দিন।

বাংলাদেশে শিশুরা মানবেতর চাপের মধ্যে পড়ে, যখন তারা স্কুল শুরু করে। স্কুল শুরু করার পর যে চাপের সম্মুখীন তারা হয়, সে বিষয়ে পরে আসছি। তবে আমাদের শিশুরা স্কুল শুরু করার জন্যও একটা চাপের মধ্যে থাকে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, তিন থেকে চার বছর বয়সেই শিশুদের স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। এটা শুধু অযৌক্তিকই নয়, অমানবিকও বটে।

বাংলাদেশ সরকার স্ক্যানডিনিভিয়ান দেশগুলোর (ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও ডেনমার্ক) আদলে শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্রের প্রবর্তন করতে পারে। প্রয়োজন অনুসারে এক বা তার চেয়েও কম বয়স থেকে শুরু করে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা যাবে দিবাযত্ন কেন্দ্রে। ছয় বছর বয়সে শিশুরা যাবে এক বছরের জন্য প্রাক স্কুলে। পরিশেষে সাত বছর বয়সে শিশুরা যাবে স্কুলে অর্থাৎ প্রথম শ্রেণীতে। বন্ধ হোক সাত বছরের কম বয়সী শিশুদের স্কুলে পাঠানো।

বর্তমানে আমাদের শিশুরা স্কুলে গিয়েই যে চাপের মাঝে পড়ে তা হল- শোনা, পড়া, মুখস্থ করা, মনে রাখা এবং পরীক্ষায় লেখা। পরীক্ষায় ভালো করতে হলে স্কুলের বাইরে কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়া।

আমাদের পুরো স্কুল সিস্টেমের মধ্যে সৃজনশীলতার উপস্থিতি অনেক কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হবে। একটা আদর্শ স্কুলের শ্রেণীকক্ষে পাঠদান চলাকালে গেলে যা দেখা যাবে তা অনেকটা এমন- ১. শিক্ষক একাধারে কোনো একটা বিষয়ে ছাত্রদের পাঠদান করে যাচ্ছেন; ২. অন্যদিকে উপস্থিত ছাত্ররা একাধারে শিক্ষকের পাঠদান শুনে যাচ্ছে; ৩. পাঠদান শেষে শিক্ষক ছাত্রদের বাড়ির কাজ বা পড়ার জন্য কিছু দিয়ে দিচ্ছেন;

৪. এ কাজ ছাত্রদের সম্পন্ন করতে হবে সাধারণত স্কুল শেষে কোচিং সেন্টারে বা গৃহশিক্ষকের কাছে গিয়ে; ৫. পরিশেষে শিক্ষকের দেয়া সব পাঠ ছাত্রদের মুখস্থ করতে হবে এবং মনে রাখতে হবে; ৬. শিক্ষকের দেয়া পাঠ থেকেই পরীক্ষায় প্রশ্ন আসবে এবং সঠিক উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে ফলাফল। সম্প্রতি সৃজনশীল পড়াশোনা কিছুটা চালু হলেও সফলতার প্রান্ত এখনও অনেক দূর।

আবার স্বার্থান্বেষী মহলের কোচিং ব্যবসা এ প্রচেষ্টাকে অনেকটাই নস্যাৎ করে দিচ্ছে। আমরা চাই স্কুল হোক চাপের পরিবর্তে আনন্দের মাধ্যমে শেখা এবং সৃজনশীলতার প্রাণকেন্দ্র। বন্ধ হোক জাতিকে মেধাশূন্য করার কোচিং ব্যবসা।

আমি বলছি না বিদেশিদের সবকিছুই আমাদের জন্য ভালো বা উপযোগী। তবে আমরা সবসময়ই কিছু ভালো বিষয় অন্যদের কাছ থেকে নিতে পারি, যদি তা আমাদের উপকারে আসে এবং উপযোগী হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ফিনিশ শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর ভালো শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর অন্যতম। এখানে শিশুরা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় কম সময় স্কুলে থাকে; কিন্তু তারা যে কোনো দেশের ছাত্রদের চেয়ে গড়ে বেশি সৃজনশীল, দায়িত্ববান ও মানবিক গুণসম্পন্ন হয়।

এখানে কোচিং ব্যবসার নামগন্ধও নেই আর স্কুলের পর শিশুরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিভিন্ন খেলা বা শখ নিয়ে যেমন- ফুটবল, ভলিবল, সাঁতার, আরও কত কী! আমরা কি পারি না আমাদের শিশুদের শৈশব তাদের ফিরিয়ে দিতে, যা আমাদের স্কুলব্যবস্থা এবং কোচিং সেন্টারগুলো হরণ করে নিচ্ছে। আমাদের সরকার অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ফিনিশ শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখতে পারে। আমার বিশ বছরের ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এর অনেক উপাদানই আমরা গ্রহণ করতে পারি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে।

দেরিতে হলেও সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত আর কোনো বার্ষিক বা পাবলিক পরীক্ষার মতো বড় পরীক্ষা থাকছে না এ বছর থেকে। এর স্থানে চালু হবে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি। আমরা একে স্বাগত জানাই।

তবে যত দ্রুত সম্ভব এটাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত কার্যকর করা দরকার। স্কুলপড়ুয়াদের অবশ্যই পরীক্ষা থাকবে; কিন্তু কোনোভাবেই তা শুধু মুখস্থ বিদ্যানির্ভর এবং ভীতিকর চাপযুক্ত হওয়া চলবে না।

পরীক্ষা হতে হবে ছাত্রদের পড়াশোনায় অগ্রগতির জন্য সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক এবং কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া। যত বেশি পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ও মুখস্থ বিদ্যানির্ভর পরীক্ষা থাকবে, গৃহশিক্ষক ও কোচিং ব্যবসার চাহিদা তত বাড়বে। এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে ওঠার ফল প্রকাশেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, কারণ এখন আমরা ছাত্রদের পরীক্ষায় অর্জিত নম্বরের ভিত্তিতে তাদের ক্রমিক অনুসারে সাজাই যেমন- ১, ২, ৩, ৪, ৫ ইত্যদি। এভাবে আমরা একজনের সঙ্গে অন্যজনের একটা প্রতিযোগিতার সূচনা করি, যা পরবর্তী সময়ে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয়।

শ্রেণীতে কোনো ক্রমিক নম্বরই থাকবে না, সবাই পরিচিত হবে তার নিজ নামে। এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে ওঠার ফলাফল দেয়া যেতে পারে অর্জিত নম্বরের ভিত্তিতে, গ্রেড অনুযায়ী যেমন- এ, বি, সি, ডি, ই, এফ- এভাবে। তাহলে আর কেউ বলতে পারবে না ‘আমি শ্রেণীর সবচেয়ে ভালো ছাত্র’। একই সঙ্গে শ্রেষ্ঠত্ব ও নিকৃষ্টতার জটিলতাও শেষ হবে। চাপ কমবে ক্রমিক নম্বরের প্রথমদিকে থাকার।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কীভাবে শিশুদের ওপর থেকে স্কুলের চাপ কমানো যায় এবং কিভাবে চাপমুক্ত করে তাদের সৃজনশীলভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়া যায়।

আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ, তাই তাদের সৃজনশীলতার ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নির্ভর করছে। শিক্ষার্থীবান্ধব স্কুলব্যবস্থার প্রবর্তন এখন আমাদের সবার গুরুদায়িত্ব, যেখানে ছাত্ররা চাপমুক্ত থেকে পড়বে, লিখবে, শিখবে, খেলবে, সামাজিক ও ব্যক্তিগত গুণাবলী অর্জন করবে এবং হারাবে না তাদের শৈশব স্কুলের চাপে।

 

লেখক : ফিনল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষক

 

সৌজন্যে: যুগান্তর

‘শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ সুবিধার তহবিল বন্ধ করে পেনশন চালু করতে হবে’ - dainik shiksha ‘শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ সুবিধার তহবিল বন্ধ করে পেনশন চালু করতে হবে’ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের পরীক্ষা ১০ মে - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের পরীক্ষা ১০ মে এসএসসির ফল ৫ বা ৬ মে - dainik shiksha এসএসসির ফল ৫ বা ৬ মে চাঁদা বৃদ্ধির পরও ২১৬ কোটি টাকা বার্ষিক ঘাটতি : শরীফ সাদী - dainik shiksha চাঁদা বৃদ্ধির পরও ২১৬ কোটি টাকা বার্ষিক ঘাটতি : শরীফ সাদী একাদশে ভর্তির নীতিমালা জারি, আবেদন শুরু ১২ মে - dainik shiksha একাদশে ভর্তির নীতিমালা জারি, আবেদন শুরু ১২ মে সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি - dainik shiksha সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website