স্বীকৃতি ও সনদ নিয়েই সন্তুষ্ট কওমি শিক্ষার্থীরা - মাদরাসা - Dainikshiksha

স্বীকৃতি ও সনদ নিয়েই সন্তুষ্ট কওমি শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক |

মাস্টার্সের স্বীকৃতি পেয়েছে ১৩ হাজার ৮২৬টি কওমি মাদরাসা। আর এ স্বীকৃতির পর প্রথমবারের মতো দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় অংশ নেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৫০ জন কওমি শিক্ষার্থী। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মাস্টার্সের সনদ পেয়েছেন ১৪৮৯২ জন শিক্ষার্থী। সরকারের তরফ থেকে সর্বোচ্চ স্বীকৃতির পর হাতে সনদ পেয়েও আগের মতোই মসজিদ ও মাদরাসার মতো গতানুগতিক পেশাই তাদের পছন্দের ও আগ্রহের। তাদের কথা- সর্বোচ্চ শিক্ষার স্বীকৃতিই ছিল নাকি তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবি। এই দাবি পূরণ হওয়ায় কেবল স্বীকৃতি ও সনদ নিয়েই সন্তুষ্ট কওমি মাদরাসার প্রায় সব শিক্ষার্থী।

এ বছর দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা দেবেন মো. মোশাররফ হোসেন। বাড়ি ময়মনসিংহে। 

অধ্যয়ন করছেন রাজধানীর এয়ারপোর্ট এলাকায় জামিয়া ইসলামিয়া গাওয়াইর মাদরাসায়। কয়েকমাস পরই তার হাতে আসবে মাস্টার্স সমমান দাওরায়ে হাদিসের সর্বোচ্চ কওমি সনদ। ইসলামি স্টাডিজ ও আরবি বিভাগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, আলিয়া মাদরাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকারি চাকরির অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার যোগ্যতা অর্জন হবে মোশাররফ হোসেনের। কিন্তু সরকারি চাকরির প্রতি তার নেই বিন্দু পরিমাণ আগ্রহ। জামিয়া ইসলামিয়া গাওয়াইর মাদরাসার এই শিক্ষার্থী বলেন, দেওবন্দ মাদরাসার সিলেবাস মেনে নিয়ে কওম মাদরাসাগুলোকে সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে বলেই আমরা সনদ নিয়েছি। এখন এই সনদ নিয়ে চাকরির খোঁজে গেলে আমাদের সরকারের অনেক কিছু মেনে চাকরি করতে হবে। যা একজন আলেমের পক্ষে সম্ভব না। তাই সরকারি চাকরির প্রতি আমাদের কোনো লোভ ও আগ্রহ নাই। স্বীকৃতি ও সনদ পেয়েই আমরা সন্তুষ্ট। 

গত বছরের ১১ই এপ্রিল গণভবনে কওমি ওলামাদের ব্যাপক জমায়েতে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদানের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর এই বছরের ১৩ই এপ্রিল প্রেসিডেন্টের আদেশক্রমে সহকারী সচিব (স.বি.-১) আবদুুস সাত্তার মিয়া এ মর্মে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন। বর্তমানে কওমি মাদরাসার ৬ টি বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের সব দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা সরকার অনুমোদিত কওমি মাদরাসা বোর্ডসমূহ গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি দ্বারা নিবন্ধিত। এই কমিটির আওতায় দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা ও উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মাস্টার্সের সনদ দিয়ে থাকে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। 

কওমি মাদরাসাগুলোর নিয়ন্ত্রক বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও রাজধানীর জামিয়া রাহ্‌মানিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুফতি মাহফুজুল হক বলেন, দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি ও সমমানের সনদ লাভ করে সরকারি চাকরি করা কওমি মাদরাসা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নয়। কেবল ধর্মীয় ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা। সেটা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়েও হতে পারে। এমনকি সামাজিকভাবে মর্যাদা লাভ করার জন্য মাস্টার্স সমমান সনদ লাভ করা কওমি মাদরাসার মৌলিক প্রাপ্য বলে মনে করেন মুফতি মাহফুজুল হক। তিনি জানান, সনদ লাভের পর সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কওমি শিক্ষার্থীদের সব চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে অভিন্ন প্রশ্ন পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। যা দাওরায়ে হাদিস বিভাগের সিলেবাস অনুকূলে নয়। এ অবস্থায় কওমি শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির প্রতি শিক্ষার্থীরা বিমুখ বলে মনে করেন তিনি। 

মাস্টার্স সমমান পাওয়ার পরও দাওরায়ে হাদিস বিভাগের কওমি শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টির কথা স্বীকার করেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সনদ বাস্তবায়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান আল্লামা আশরাফ আলী। তিনি বলেন, তারা সরকার থেকে কোনোরকম পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ৪
অনুদান এবং অর্থসহায়তা গ্রহণ করেন না এবং তদারকির নামে সরকারের কোনো রকম নিয়ন্ত্রণও চান না। এখানে ইঞ্জিনিয়ার বানানো হয় না, বৈজ্ঞানিক বানানো হয় না, ডাক্তার হয় না, দার্শনিক হয় না। ইসলামি শিক্ষার মধ্যে গভীর জ্ঞানী হওয়াই মূল লক্ষ্য। 

একইভাবে কওমি শিক্ষার্থীদের পূরো মাত্রায় সরকারি চাকরির প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টি ফুটে ওঠে টাঙ্গাইল সদরের প্রখ্যাত জামিয়া আশরাফিয়া মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস বিভাগের ছাত্র মো. শোয়াইবের মুখে। তিনি বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতি সমূহকে ভিত্তি ধরে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স এর সমমান দিয়েছে সরকার। এখন সরকারি চাকরি পেতে হলে সরকারের মর্জি মোতাবেক প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হবে। চাকরির জন্য আন্দোলন করতে হবে। আমাদের সরকারি চাকরির লোভ নাই। স্বীকৃতি ও সনদের জন্য আন্দোলন করেছি সেটা পেয়েছি।

তবে একটু ভিন্নমত পোষণ করে জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া দাওরায়ে হাদিস মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা ওমর ফারুক মাসরুর জানান, ক্বওমি শিক্ষার স্বীকৃতির বিষয়টি সবার চাওয়া ছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে। সে বিষয়টি অর্জিত হলেও কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ একেবারেই নেই। তবে ধর্মীয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে কওমি শিক্ষার্থীদের সুযোগ করে দেয়ায় একটু আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার দিয়েছে সরকার। সেখানে আলিয়া ও কওমি মাদরাসা থেকে ফিফটি ফিফটি করে চাকরির কোটা ভাগ করে দেয়া হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে কওমি শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ করার মানসিকতা তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি বলে জানান তিনি।

সনদ বাস্তবায়ন কমিটি আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৫ই মে বেফাক নিবন্ধিত কওমি মাদরাসার ৪৬৬টি পুরুষ ও ৫৪৬ টি মহিলা কেন্দ্রে মোট ছয়টি স্তরে একযোগে মাস্টার্স সমমানের দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ পরীক্ষায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৫০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এতে ছাত্রদের পাশের হার ছিল ৮৪ দশমিক ২৭ শতাংশ আর ছাত্রীদের পাশের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। এসব দাওরায়ে হাদিস পাস করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রায় সবাই তাদের অধিক পছন্দের পেশা মসজিদ, মাদরাসা ও মকতবে কর্মরত রয়েছেন। এই সব পেশাই তাদের কাছে সবচেয়ে আগ্রহের ও পছন্দের। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তাদের প্রবল অনীহা রয়েছে। এমনটাই বলছেন বেফাক মুখপাত্র মাওলানা মুনীর আহমদ। তিনি বলেন, আমরা শুধুই মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রি চেয়েছি। কওমি মাদরাসায় পড়ে শিক্ষার্থীরা মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষক, ইমাম ও মুয়াজ্জিন হয় বলে জানান তিনি। 

স্বীকৃতি ও সমমান পেয়েও সরকারি চাকরিতে কওমি শিক্ষার্থীদের এমন অনীহার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন মনে করেন, যুগোপযোগী সিলেবাস না হলে মাস্টার্স সমমান পেলেও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে না। তিনি বলেন, বিশেষ কাজের সহায়তায় হয়তো চাকরির সুযোগ থাকবে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা সুবিধা করতে পারবে না। তাদের কোনো না কোনোভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে এবং মূল ধারার কাছাকাছি আসতে হবে। কওমিরা বলছে, তারা কোনো কিছুর সঙ্গে থাকবে না। এমনটা হলে এই মাস্টার্স সমমান নিয়েও সরকারের কোনো কাজে অংশ নিতে পারবে না বলে মনে করেন এই ঢাবি শিক্ষক। 

 

সৌজন্যে: মানবজমিন

ডিগ্রি ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু আজ - dainik shiksha ডিগ্রি ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু আজ আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু - dainik shiksha আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি ফরম বিতরণ শুরু নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি - dainik shiksha নির্বাচনের সঙ্গে পেছাল সরকারি স্কুলের ভর্তি শিক্ষকদের অন্ধকারে রেখে দেড় লাখ কোটি টাকার প্রকল্প! - dainik shiksha শিক্ষকদের অন্ধকারে রেখে দেড় লাখ কোটি টাকার প্রকল্প! একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৪৭ প্রতিষ্ঠান - dainik shiksha একাডেমিক স্বীকৃতি পেল ৪৭ প্রতিষ্ঠান এমপিও কমিটির সভা ১৯ নভেম্বর - dainik shiksha এমপিও কমিটির সভা ১৯ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু ১৮ নভেম্বর - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু ১৮ নভেম্বর দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website