সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রহসনের আইন ও অমৃত বচনের শেষ কোথায়? - মতামত - Dainikshiksha

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রহসনের আইন ও অমৃত বচনের শেষ কোথায়?

শরীফ আহমেদ |

সড়কে মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিন লাশের সংখ্যা বাড়ছে, চলার পথে মানুষ মুহূর্তেই বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ‘নাই’ হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় স্কুলব্যাগ কাঁধে পড়ে থাকা বালক-বালিকার ছিন্নভিন্ন দেহ, বাসের গায়ে লেগে থাকা রাজীবের হাত, ব্যস্ততম বিমানবন্দর সড়কে শিক্ষার্থীদের রক্তের দাগ আমাদের মরচে পড়া অনুভূতি আর বিকিয়ে দেয়া বিবেকের ভেতর সূক্ষ্ম নাড়া দিয়ে যায়। 

আমাদের কাঁদায়, ভাবায়- কোন পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ; যেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই, যেখানে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই, নেই কোনো নিরাপত্তা।

শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণী পড়ুয়া করিম আজ সারা বাংলার করিম-রহিমদের প্রতিচ্ছবি। একাদশ শ্রেণীতে পড়ুয়া মিম সে তো আমাদেরই মেয়ে কিংবা বোন। এভাবেই বাংলার বুক থেকে শত শত করিম, মিম, রাজীব, পায়েল, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনির ও রূপারা বাসের চাকায়, হেলপারের অমানবিকতায় সবাইকে কাঁদিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের এমন মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে অথচ শাসক গোষ্ঠীর ঘুম ভাঙে না।

যে মুখে থাকার কথা বিষাদের চিহ্ন, যে কণ্ঠে থাকবে সান্ত্বনার বাণী- সে মুখে আজ ভিলেনের হাসি! আর কত মায়ের বুক খালি হলে, আর কত কিশোর প্রাণের রক্তে রাজপথ ভেসে গেলে তাদের ঘুম ভাঙবে; আর কত মৃত্যু হলে ক্ষমতার বিভোর নেশা কেটে গিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ আর্তনাদ তাদের কানে পৌঁছবে?

এমন সম্ভাবনাময় তরুণ প্রাণের মৃত্যুর দায় কে নেবে? এই দহনের কালে সবাই দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। সবাই বালিতে মুখ গুঁজে আছে। এর কি কোনো প্রতিকার নেই? নেই কোনো বিচার? থাকবেই বা কী করে! এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রেখে কোনো আইনই তো নেই! সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত আইনের ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ ছিল।

ওই আইনের ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা ছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু পরিবহন কর্তৃপক্ষ আর নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের চাপে প্রস্তাবিত আইনটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক আইনের ৩০২ (খ) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর! সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০২ ধারায় ৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল, ক্ষমতার দাপটে সেটিও ৩০৪ ধারায় নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এ আইনের ৪৯ ধারায় বলা হয়েছে- সব অপরাধই জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য। তার মানে একটা হাস্যকর আইন তৈরি করে অদক্ষ, অযোগ্য, লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে গাড়ির চাবি আর নির্ভয়ের আইনিবিধান! 

যে দেশে বিচারের নামে এমন প্রহসনমূলক আইন থাকে, সে দেশে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীর উপর গাড়ি তুলে দিতে কোনো ড্রাইভারের বুক কাঁপবে না- এটাই স্বাভাবিক। আর হত্যাকারী ড্রাইভারদের জন্য যদি থাকে মন্ত্রী-এমপি-ক্ষমতাসীনদের অভয়বাণী, তাহলে তো কোনো কথাই নেই! এবার হত্যাকারী ড্রাইভারদের পক্ষে সাফাই গাওয়া কিছু অমৃত বচন আপনাদের সামনে তুলে ধরছি-

ব্যস্ত বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের ড্রাইভার আরেক গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের উপর বাস চালিয়ে দিয়ে ২ জনকে হত্যা করল। এটা তো কেবল দুর্ঘটনা নয়, এটা একটা হত্যাকাণ্ড। উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা সহপাঠীর রক্তে ভাসা রাজপথে নেমে এলো, গাড়ি ভাঙচুর করল। ঠিক তখনই নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান হাসিমুখে সাংবাদিকদের বললেন- আমি যদি আপনাদেরকে প্রশ্ন করি, গতকাল আপনারা লক্ষ করেছেন, ভারতের মহারাষ্ট্রে একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে ৩৩ জন মারা গেল। এখন সেখানে কি আমরা যেভাবে এগুলোকে নিয়ে কথা বলি, এগুলো নিয়ে কি ওখানে কথা বলে? অতঃপর ভাববাচ্যে বলে গেলেন- যে অপরাধ করবে সে অপরাধের শাস্তি তাকে পেতে হবে। তিনি আরও বলে গেলেন- আপনি কি জানেন, ভারতে প্রতি ঘণ্টায় কতজন লোক অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়? ১৬ জন মারা যায়।

আমরা জানি, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৬৪ জন। তার মানে, তিনি কি সড়কে মৃত্যুর মিছিলে আরও বেশি লাশ চেয়েছিলেন? এমন ব্যক্তির কাছ থেকে আর কী আশা করতে পারে জাতি! আজ থেকে ৭ বছর আগে ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান বলেছিলেন- বাস্তবতা হল দেশে চালকের সংকট আছে।

আর এই বাস্তবতার ভিত্তিতে অশিক্ষিত চালকদেরও লাইসেন্স দেয়া দরকার। কারণ তারা সিগন্যাল চেনে, গরু-ছাগল চেনে, মানুষ চিনে। সুতরাং তাদের লাইসেন্স দেয়া যায়। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন- কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটালে তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে আমাদের কিছু করার নেই। কেননা দুর্ঘটনা হল দুর্ঘটনা (অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট)।

হ্যাঁ, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে মাইক্রোবাস আরোহী তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহতের ঘটনা বিচ্ছিন্ন বটে! গত ৩ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় হাত হারানো ও পরে মারা যাওয়া রাজীব হাসানের অ্যাকসিডেন্টটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে দুর্ঘটনায় আহত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সাইদুর রহমান পায়েলকে অচেতন অবস্থায় সেতু থেকে খালে ফেলে দেয় হানিফ পরিবহনের চালক ও তার সহকারীরা। এটাও জাস্ট একটা অ্যাকসিডেন্ট?

তাহলে বিমানবন্দর সড়কে যা ঘটেছে, এটা কী? কোন আইন বলে ড্রাইভার নামক এই ঘাতকরা শাস্তির ভয় করে না? যে দু’জন শিক্ষার্থীকে রোড অ্যাকসিডেন্টের নামে হত্যা করা হল- সেই চালককে যদি গ্রেফতার করতে পারে পুলিশ, তাহলে প্রচলিত আইনে দু’জনকে হত্যার দায়ে ওই চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ৩ বছরের জেল!

যে দেশে মানুষকে বকা দিলে মানহানির মামলায় অজামিনযোগ্য ৫৭ ধারায় ১০ বছরের জেল হয়, সে দেশে মানুষ হত্যার দায়ে জামিন ও আপসযোগ্য মামলায় জেল হয় মাত্র ৩ বছর! জনগণের সঙ্গে একি অদ্ভুত প্রহসন! আরও আক্ষেপের বিষয় হল- এমন প্রহসনের আইন যারা প্রণয়ন করেন, তাদেরকেই ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি বানানো হয়! এ কোন দেশে বাস করছি আমরা?

এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৫-২০১৬ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে সারাদেশে ৫১ হাজার ৬৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫৭ হাজার ৫০৬। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম।

আর বছরে ক্ষতি ৩৪ হাজার কোটি টাকা। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে। অপরদিকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ৬৪৫ জন।

রোগে, বার্ধক্যে কারও মৃত্যু হলে তা কষ্টকর হলেও মানা যায়, কিন্তু সবকিছু অসমাপ্ত রেখে এমন তাজা প্রাণের অকালমৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। প্রশ্ন হল- এমন মৃত্যুর জন্য কার কাছে বিচার চাইবে জনগণ? এমন মৃত্যুর জন্য কাকে দায়ী করব? ড্রাইভার-হেলপারকে, বাসের মালিককে, বাস-ট্রাক মালিক সমিতির কোনো ক্ষমতার অধিপতি মহাজন-সভাপতিকে, সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরকে, সরকারকে নাকি স্বয়ং আমাকে?

আমাদের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়, দায়ী এই রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্রের আইনে বিচারের নামে প্রহসন হয়, সেই বিচার আমরা চাই না। আমরা চাই, এই প্রহসনমূলক আইনের পরিবর্তন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান হোক, অমন দুঃখের দিনে অপ্রিয় কথন- অমৃত বচন বন্ধ হোক, আর সড়ক-পরিবহন ও তৎসংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হোক বোধোদয়।।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সৌজন্যে: যুগান্তর

‘শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ সুবিধার তহবিল বন্ধ করে পেনশন চালু করতে হবে’ - dainik shiksha ‘শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ সুবিধার তহবিল বন্ধ করে পেনশন চালু করতে হবে’ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের পরীক্ষা ১০ মে - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের পরীক্ষা ১০ মে এসএসসির ফল ৫ বা ৬ মে - dainik shiksha এসএসসির ফল ৫ বা ৬ মে চাঁদা বৃদ্ধির পরও ২১৬ কোটি টাকা বার্ষিক ঘাটতি : শরীফ সাদী - dainik shiksha চাঁদা বৃদ্ধির পরও ২১৬ কোটি টাকা বার্ষিক ঘাটতি : শরীফ সাদী একাদশে ভর্তির নীতিমালা জারি, আবেদন শুরু ১২ মে - dainik shiksha একাদশে ভর্তির নীতিমালা জারি, আবেদন শুরু ১২ মে সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি - dainik shiksha সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্র্রিস্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website