হামলা সমস্যাকে জটিল করে তোলে - মতামত - Dainikshiksha

হামলা সমস্যাকে জটিল করে তোলে

মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার |

সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের উদ্যোগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এপ্রিলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে ৫ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নামেন। যদিও এর আগে তারা ফেব্রুয়ারি থেকেই এ আন্দোলনের জানান দেয়। অবশ্য এ সরকারের আমলে এর আগে ২০১৩ সালে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাজপথে নেমেছিলেন। সে সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নেমে পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছিলেন। উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনের মূল দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে মেধার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম শ্রেণীর যে সরকারি চাকরিগুলোয় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়; ওই চাকরি শতকরা ৫৬ ভাগ কোটায় দেয়ার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থী ও বেকার চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষুব্ধ হন। তারা দাবি করেন, সরকারি চাকরিতে যোগ্যতা ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মেধাকে গুরুত্ব দিয়ে এ চাকরিতে প্রদত্ত কোটার হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কোটা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে।

এ লক্ষ্যে আন্দোলনকারীরা কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য ৫ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামেন। তবে এ আন্দোলনে সবাই রাজপথে না নামলেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কেবল সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ব্যতীত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের অনেকেই এ আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন দেন। তবে প্রকাশ্যে না বলতে পারলেও ছাত্রলীগের কিছুসংখ্যক নেতাকর্মী-সমর্থকেরও এ আন্দোলনে অঘোষিত সমর্থন ছিল। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের কিছু পার্থক্য দেখা যায়। প্রথমবার ২০১৩তে এ আন্দোলনে যতটা সাড়া পড়েছিল, পরের বার ২০১৮তে এসে এ আন্দোলনে তার চেয়ে বেশি সাড়া পড়ে। বেকারত্ব বৃদ্ধিসহ নানা কারণে সাধারণ শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজ অনেকে আন্দোলনকারীদের সমর্থন দেন। পুলিশের পিটুনিতে প্রথমবার আন্দোলনে ক্রমান্বয়ে ভাটা পড়ে। কিন্তু এবার ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের পুলিশ পেটায়নি। পরিবর্তে পুলিশের উপস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে পিটুনি খেয়েছে। এ আন্দোলন কর্মসূচিতে কারা মারধর করেছে, তা সাংবাদিকরা ছবি তুলে নামসহ পত্রিকায় প্রকাশ করলেও হামলাকারী ছাত্র সংগঠনটি এসব মারধরের ঘটনা অস্বীকার করছে।

তারা বলছে, আন্দোলনকারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিজেদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ঘটেছে। তারা আরও দাবি করেছে, তারা ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করছে। নির্বাচনের বছরে এমন প্রকাশ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ভোটার এবং সারা দেশের সাধারণ ভোটারদের কাছে সরকারি দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার কারণ কী? এ ছাত্র সংগঠনটিরই বা দোষ কী। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশ্রয় পায় বলেই এমন সব অনৈতিক কাজ করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে তারা কীভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের হামলা করতে পারে, তা ভাবার বিষয়। কীভাবে ৮ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলন করতে জড়ো হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হতে পারে? কীভাবে শহীদ মিনারে আন্দোলনের পক্ষে মানববন্ধন করতে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করতে পারে! কীভাবে রাজশাহী ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যাল দুটিতে একই ভঙ্গিমায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নির্যাতন করতে পারে, তা বোধগম্য নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপককে হেঁটে কোটা আন্দোলনে নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেও বাধা দেয়া হয়। খুলনায় শহীদ হাদিস পার্কে কোটা আন্দোলনে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে প্রগতিশীল জোট সমবেত হতে চাইলে তাদের পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশ বাধা দেয় পরবর্তীকালে প্রেস ক্লাবে অভিভাবক সমাবেশেও।

যেখানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) মতো প্রতিষ্ঠান পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে হামলাকারীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং কোটা সংস্কার নিয়ে প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন চায়, সেখানে ঢাবির প্রক্টর মহোদয় আন্দোলনকারীদের মারধরের ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এসব বিষয়ে তিনি অবহিত নন। তবে সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনটির মারধরের ব্যাপারে অবহিত না থাকলেও প্রক্টর মহোদয়ের ভাষায় যারা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ‘অবরুদ্ধ করে’ কর্মসূচি দিয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি জানেন। তিনি তাদের সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানতে উপদেশ দেন। পুলিশের সামনেই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হলেও পুলিশ হয়তো সেসব দেখতে পায়নি, তবে তারা আন্দোলনকারীদের একজন যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছেন। কোটা আন্দোলনকারীদের নির্যাতন করায় সুশীলসমাজের কয়েকজন এ বিষয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। টিআইবি এ আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলাকে ‘অমানবিক’ ও ‘নিন্দাজনক’ বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করে। বিএনপি কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ করে হামলাকারীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। বাম দলগুলোও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করে।


সরকারদলীয় কোনো কোনো নেতা এ আন্দোলনের মধ্যে রাজনীতি খুঁজে পান। এ দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে রাজনীতি যুক্ত হয়ে গেছে। এ আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ানোরও একটি প্রচেষ্টা আছে।’ তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হামলাকারীদের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ। ৫ জুলাই দুপুরে ঢাবি ছাত্রীরা নিরাপদ ক্যাম্পাস ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ করতে ছাত্রলীগের বাধা উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। পরে সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক আফসানা সাফা ইমু কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন। এ সংবাদ সম্মেলন থেকে হামলাকারীদের বিচারও দাবি করা হয়। যারা আন্দোলন করেছেন, তাদের কেউ আহত হয়ে গেছেন হাসপাতালে, আর কেউ বা মামলা খেয়ে জেলে। এ বিষয়গুলো সাধারণ শিক্ষার্থীরা দেখছেন। ফলে তাদের মধ্যে যে ক্ষোভের জন্ম হচ্ছে, সরকার যদি তা স্তিমিত করতে কৌশলী না হয়ে নির্যাতনের পথ বেছে নেয়, তা ভালো ফল বয়ে আনবে না। ভয় দেখিয়ে যৌক্তিক আন্দোলন দমাতে চাইলে যে কোনো সময় এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ হতে পারে।

আমার মাথায় আসে না যে, কেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংবাদ সম্মেলন করতে বাধা দেয়া হল। কী করত তারা সংবাদ সম্মেলনে? তারা সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে তাদের দাবি অনুধাবন করে সংসদে প্রদত্ত বক্তব্য দেয়ায় হয়তো ধন্যবাদ জানাত। হয়তো কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলত, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রজ্ঞাপন জারি করতে এত দেরি হচ্ছে কেন? তারা হয়তো সংশ্লিষ্ট মহলকে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করতে অনুরোধ করত। আর খুব বেশিকিছু করতে চাইলে তারা হয়তো কয়েক সপ্তাহের সময় দিয়ে একটি আলটিমেটাম দিত। সেখানে বলা হতো, এত তারিখের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা না হলে তারা আবার রাজপথে নামবে। আবার ক্লাস বর্জন, পরীক্ষা বর্জনের মতো কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে। এতে সরকারের কোনোই অসুবিধা হতো না। প্রধানমন্ত্রী চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে কোটা সংস্কারের ব্যাপারে তার দিকনির্দেশনা বুঝিয়ে দিয়ে একটি কমিটি করে ওই কমিটিকে এক বা দুই সপ্তাহের সময় দিয়ে কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারি করতে আদেশ দিলে তখন আন্দোলনকারীরাই খুশি হয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে স্লোগান দিত। এমন একটি সহজ কাজে কেন জটিলতা সৃষ্টি করা হল, তা বোধগম্য নয়।

সরকার কি চেয়েছে, গাজীপুরে নির্বাচন নিয়ে যে আলোচনা চলছে তা বন্ধের জন্য কয়েকদিন ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল থাকুক এবং সবার দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ হোক। তা না হলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন সদস্য কর্তৃক হামলা করার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সে ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেবে না, তা কী করে হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পেটানো হল; তারপর তো ঠিকই সরকার প্রজ্ঞাপন জারির জন্য কমিটি করল। তাহলে কমিটিটা একটু আগে করে দিলে তো আর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো ঘটত না। এ সরকারের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। এতটুকু হিসাব তারা নিশ্চয়ই বোঝেন যে, নির্বাচনের বছরে ক্যাম্পাসে যাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে এরা সবাই ভোটার। আগামী নির্বাচনে তারা ভোট দেবেন। এদের ওপর হামলা করে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করা যাবে না। পরিবর্তে এ কাজটি হবে সরকারি দলের জনপ্রিয়তার মূলে কুঠারাঘাত করার শামিল। ভোটের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিলে নির্বাচনের বছরে এই বুমেরাং পলিসি থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরকারের সরে আসা উচিত।

লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এমপিওভুক্তিতে প্রতারণা: মন্ত্রণালয়ের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি - dainik shiksha এমপিওভুক্তিতে প্রতারণা: মন্ত্রণালয়ের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি অক্টোবরে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা - dainik shiksha অক্টোবরে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নতুন এমপিওভুক্তি: প্রতিষ্ঠান সরেজমিন যাচাইয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর - dainik shiksha নতুন এমপিওভুক্তি: প্রতিষ্ঠান সরেজমিন যাচাইয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর পদোন্নতি পেলেন ৪২০ সহকারী শিক্ষক - dainik shiksha পদোন্নতি পেলেন ৪২০ সহকারী শিক্ষক ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে কোটা না রাখার সুপারিশ - dainik shiksha ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে কোটা না রাখার সুপারিশ দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে - dainik shiksha দৈনিক শিক্ষায় বিজ্ঞাপন পাঠান ইমেইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website