please click here to view dainikshiksha website

ফের বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় ৬৩ শিক্ষা কর্মকর্তার প্রমোদ ভ্রমণ

১২ দিনের ফ্রি ভ্রমণের সঙ্গে প্রত্যেকে পাচ্ছেন তিন লাখ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক | অক্টোবর ১, ২০১৬ - ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ
dainikshiksha print

ফের প্রশিক্ষণের নামে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ) ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৬৩ কর্মকর্তার বিশাল এক প্রতিনিধি দল অস্ট্রেলিয়া সফরে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থপনার ওপর প্রশিক্ষণের জন্য এই সফর হলেও এতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তারা ভ্রমণে যাওয়ায় সমালোচনা বেশি হচ্ছে। আবার আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা নেই ইউজিসির এমন কর্মকর্তারাও এতে ঠাঁই করে নিয়েছেন। শিক্ষাজীবনে একাধিক থার্ড ক্লাস থাকা ও সামান্য ইংরেজি বোঝেন না ইউজিসির এমন জনাদশেক কর্মকর্তার ব্যাপারে আপত্তি থাকলেও গা করেনি ইউজিসি।

এতে ব্যয় হবে প্রায় ৫ কোটি টাকা। ১২ দিনের ভ্রমণের ব্যয় বহন করবে বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় চলা হেকেপ প্রকল্প। ভ্রমণ ব্যয় ছাড়া কর্মকর্তাদের প্রত্যেককে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ লাখ টাকা করে হাত খরচ দেওয়া হবে।এই হিসেবে প্রত্যেক কর্মকর্তা দৈনিক হাত খরচ হিসেবে ঋণের টাকা থেকে পাবেন ২৫ হাজার টাকা করে। দৈনিক হাত খরচের এই পরিমাণ বরাদ্দ ৬৩ কর্মকর্তার  মধ্যে অনেকেরই পুরো মাসের সরকারি বেতনের প্রায় অর্ধেক বলে জানাগেছে।

ইউজিসি ও হেকেপ সূত্রে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ার ইউনিভার্সিটির সঙ্গে প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট শর্ট ট্রেনিং কোর্সের আওতায় ৬২ কর্মকর্তা দুই টিমে ভাগ হয়ে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন। প্রত্যেক টিম ১০ দিন করে স্কিল এবং লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। সেখানে ম্যাককোয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা তাদের প্রশিক্ষণ দেবেন। ৬২ জনের মধ্যে ৫০ জন ইউজিসির কর্মকর্তা। এর মধ্যে ৩২ জন একেবারে জুনিয়র পর্যায়ের কর্মকর্তা। যারা প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব (আরডিপিপি) অনুযায়ী, এই ট্রেনিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না। এর মধ্যে আছেন ইউজিসি ও হেকেপের সিস্টেম অ্যানালিস্ট, প্রোগ্রাম অফিসার। তাদের অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান করা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার মতো যোগ্যতা আছে কি-না অথবা ট্রেনিং শেষে দেশে কী কাজে আসবে_ এমন প্রশ্ন উঠেছে স্বয়ং ইউজিসির মধ্যে।

ট্রেনিং প্রোগ্রামের রোস্টার অনুযায়ী, আগামী ৩-১২ অক্টোবর এবং ২৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর টিমে ৩১ জন করে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৩১ জনের ভিসা হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে তাদের ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় টিমের গভর্নমেন্ট অর্ডার (জিও) হয়েছে। চলতি সপ্তাহে তাদের ভিসার জন্য আবেদন করা হবে। ৬২ জনের মধ্যে হেকেপের আটজন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চার কর্মকর্তা রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চারজনের মধ্যে দু’জন যুগ্ম সচিব এবং দু’জন উপ-সচিব পদমর্যাদার। উপ-সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা আবার তথ্য ক্যাডারের। এর আগে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগেও তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন নিয়ম-নীতি অমান্য করে। সর্বশেষ তিনি গত সপ্তাহে ভারত সফর করে এসেছেন। বর্তমানে তিনি মন্ত্রণালয়ের কারিগরি উইংয়ের দায়িত্বে আছেন। তার সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মন্ত্রণালয়ে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা এই কর্মকর্তা যেকোনো সময় অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে যেতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, যারা যাচ্ছেন তাদের সবাই যোগ্য। আরডিপির শর্ত পূরণ না করলে বিশ্বব্যাংক তাদের নাম বাদ দিত। তিনি বলেন, ম্যাককোয়ার ইউনিভার্সিটির সঙ্গে ইউজিসির একটি চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তাদের ট্রেনিং ফি অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য একসঙ্গে এত কর্মকর্তাকে একসঙ্গে ট্রেনিং করাতে পারছি। তিনি আরও বলেন, ইউজিসি এখন অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। যত দিন যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মযজ্ঞ আরও বাড়ছে। আমি মনে করি, কর্মকর্তাদের জন্য এই ট্রেনিং প্রোগ্রামের প্রয়োজন রয়েছে।

হেকেপের প্রকল্প পরিচালক ড. গৌরাঙ্গ চন্দ্র মোহান্ত বলেন, এই ট্রেনিং প্রোগ্রামে তিন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আছেন। কে যোগ্য, কে যোগ্য না তা বলতে পারবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। আমি হেকেপের বিষয়টি বলতে পারব। হেকেপে যে ক’জন কর্মকর্তা এই ট্রেনিংয়ে যাচ্ছেন, তারা সবাই যোগ্য। তিনি বলেন, যে টাকায় ৬২ জন কর্মকর্তা অস্ট্রেলিয়ায় ট্রেনিং করছেন, এই ট্রেনিং সিঙ্গাপুরে করলেও সর্বোচ্চ ২০ জন সুযোগ পেতেন। হেকেপ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রথমে এই প্রোগ্রামে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। পরে মন্ত্রণালয়ের চাপাচাপিতে একজনের ব্যাপারে রাজি হলেও রীতিমতো জোর করে চারজন কর্মকর্তার নাম ঢোকানো হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ট্রেনিং করতে যাবেন অথচ তার ইংরেজি ভাষাগত জ্ঞান নেই, তা যদি সত্যি হয় তাহলে তিনি কীভাবে ট্রেনিং গ্রহণ করবেন এবং তা দেশে এসে কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন? আমি মনি করি, এ রকম ট্রেনিংয়ে তাকে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ঋণের টাকা যদি প্রমোদ ভ্রমণ টাইপের কিছু হয়, তার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ যাচ্ছেন যারা :হেকেপের ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর (যুগ্ম সচিব) সোহেল আহমেদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব লায়লা আরজুমান্দ বানু, বেলায়েত হোসেন, অজিত কুমার দেবনাথ, উপ-সচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালী, নুসরাত জাবীন বেনু, ইউজিসির পরিচালক মিজানুর রহমান, খন্দকার হামিদুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, সামসুল আলম, অতিরিক্ত পরিচালক ফেরদৌস জামান, ওমর ফারুক, এ কে এম শামসুল আরেফিন, রেজাউল করিম হাওলাদার, যুগ্ম সচিব ফখরুল আলম, উপ-পরিচালক জেসমিন পারভীন, উপ-সচিব শাহীন সিরাজ, নাহিদ সুলতানা, রফিকুল আলম, আবদুল ওহাবসহ অনেকে। জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ইউজিসির চেয়ারম্যান ও সদস্যরাও এই প্রশিক্ষণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে এই প্রকল্পের প্রথম ধাপ শুরু হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ইউজিসি বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রথম ধাপে প্রকল্প ব্যয় ধরা ছিল ৬৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সফট লোন হিসেবে ৫৯৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ও বাংলাদেশ সরকারের ৮২ কোটি টাকা রয়েছে। প্রথম ধাপের প্রায় শেষ সময় এসে খরচের অগ্রগতি ছিল মাত্র ৫০ ভাগ। শেষ সময় এসে এই প্রকল্পের টাকা ব্যয় করতে উন্নত দেশে ট্যুরের মাধ্যমে টাকা খরচের মহোৎসব করা হয়। গত বছর দ্বিতীয় ধাপে বিশ্বব্যাংক প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। কিন্তু এই অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত ছয়টি ট্যুর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিক্ষাবিদের চেয়ে আমলা কিংবা নন-শিক্ষাবিদদের তালিকাই ছিল বেশি। অনেক ভিসি, প্রো-ভিসি ও প্রথিতযশা শিক্ষাবিদরা আবেদন করলেও তাদের নাম তালিকায় আসেনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:


আপনার মন্তব্য দিন