please click here to view dainikshiksha website

৪৫ ছাত্রীর পাশে হিরোকো কোবায়েসি

তরিকুল ইসলাম, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি | জানুয়ারি ৮, ২০১৭ - ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
dainikshiksha print

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রায়গ্রামের সোমা রানী দাস পড়ছেন যশোর পলিকেটনিক ইনস্টিটিউটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ, বলাকান্দর গ্রামের ঝুমরা  খাতুন পড়াশোনা করেন যশোর সরকারি মহিলা কলেজের মার্স্টাসে, ঝিনাইদহ কিশোর চন্দ্র কলেজে বাংলায় অর্নাস পড়ছে আরজুফা, প্রীতিলতা, আফরোজা পারভীন, সামা রানী, সাহানা, বিথী, পিংকি,পুষ্প, বিজলী ও জলির মতো  স্কুল ও কলেজ পড়–য়া ৪৫জন মেয়ে নিেেজরা ঠিক করেছে পড়াশুনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তাদের বিশ্বাস মেয়রা এগিয়ে গেলে, সকলের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ।

আর এমন মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া মেয়েদের সহযোগিতার হাত নিয়ে তাদের পাশে দাড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ও জাপানী নারী হিরোকো কোবাইসি।

মিস হিরোকো কোবায়েসি ৮৮ বছর বয়সী একজন জাপানী নারী যিনি ইকেবানা’র (ফ্লাওয়ার এরেঞ্জমেন্ট) শিক্ষক এবং ৪৫বছর যাবত এই কাজটি করছেন। এছাড়া তিনি একজন ফটোগ্রাফার, তাঁর ছবির মূল উপজীব্য নারী। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলাদেশের (কালীগঞ্জ ও বোদা উপজেলায়) দুটো এলাকার প্রায় ১০০জন মেয়ের পড়ালেখার জন্য পাশে দাঁড়িয়েছেন। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে কালিগঞ্জে ৪৫ মেয়ে শপথ নিয়েছে লেখাপড়া না করে বিয়ে করবে না। তারা আরো শপথ নিয়েছে তারা সমাজে বড় কিছু হয়ে সমাজের অসহায় গরীব মেধাবী মেয়েদের শিক্ষার জন্য সহযোগিতা করবে। মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার এই উদ্যেগকে হাঙ্গার ফ্রি ওমেন স্কলারশীপ নামে একটি কর্মসূচি হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড চলমান রেখেছে।

হাঙ্গার ফ্রি ওমেন স্কলারশীপ দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হাফিজুর রহমান জানান, ২০০৩ জাপানী নারী হিরোকো কোবাইসি বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন। ঐ সময় কালীগঞ্জ উপজেলার মোস্তবাপুর গ্রামের খাদিজা খাতুন এইচএসসি পড়ার সময় টাকার অভাবে পরীক্ষার ফি না দিতে পারায় গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করে।  এমন খবর জানার পর  জাপানী মহতি নারী হিরোকো কোবাইসি খাদিজা খাতুনের বাড়িতে যান এবং প্রতিশ্রুতি দেন অসহায় গরীব মেধাবী মেয়েদের তিনি শিক্ষাবৃত্তি দেবেন। এরপর থেকে শুরু। প্রতি বছর তিনি ৪৫ জন মেয়েকে স্কুল পর্যায়ে টাকা ও কলেজ পর্যায়ে  টাকা প্রদান করে আসছেন।

হাফিজুর রহমান আরো জানান, হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের কর্মীরা কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে  ও স্কুলে গিয়ে এসব  গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুজে বের করে।  ২০১৬-১৭ খ্রিস্টাব্দে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের  ঝুমুরা খাতুন, আরজুফা খাতুন, প্রীতিলতা বিশ্বাস, আফরোজা পারভীন,সাহানা খাতুন, সোমা রানী, বিথি খাতুন, পিংকি খাতুন, পুষ্প বিশ্বাস, জলি খাতুন, বিজলী খাতুন, সুমি খাতুন, অনামিককা সরকার, শিলা খাতুন, ফারজানা আক্তার, স্মৃতি বিশ্বাস, রহিমা খাতুন, নাসরিন খাতুন, শান্তনা ইয়াসমিন, মাধবী লতা বিশ্বাস, সোহাগী খাতুন, মালেকা খাতুন, শান্তনা খাতুন, আখি খাতুন,ফারাফি নুসরাতসহ ২৫ জন শিক্ষার্থী  ও স্কুল পর্যায়ে বিনা খাতুন, সম্পা খাতুন, বৃষ্টি খাতুন, জিনিয়া খাতুন, কনিকা খাতুন,হাফিজা খাতুন, অর্পিতা খাতুন, তামান্না খাতুন, হিরা খাতুন, রুপালী খাতুন, নাজমিন খাতুন, মুক্তা খাতুন, শারমিন জানান, হোসনে আরা বর্ষা, রিমি খাতুন, শিউলি রানী, স্বপ্না বিশ্বাস, চামেলী খাতুন, মল্লিকা বিশ্বাস, নাসরিন আক্তারসহ ২০জন মেয়েকে এ টাকা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতি তিন মাস অন্তর সকল বৃত্তিপ্রাপ্ত মেয়েরা এক জায়গায় হয়।  তিন মাসের টাকা একবারে প্রদান করা হয়। শিক্ষাবৃত্তি দেবার পর সংগঠনের কর্মীরা নিয়মিত খোজ খবর রাখছেন যে বৃত্তির টাকা নিয়ে তারা ঠিকমত পড়াশোনা করছেন কিনা, ঠিকমত স্কুল/কলেজে যাচ্ছে কিনা। তিনি আরো জানান, যে সকল মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয় তারা শপথ নেন লেখাপড়া শেষ না করা পর্যন্ত তারা বিয়ে করবে না। এমনকি তারা কখনো বড় হলে গরীব ও মেধাবী মেয়ের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করবে।

জাপান থেকে প্রতি বছর মার্চ মাসে হিরোকো কোবাইসি আসেন এইসব মেয়েদের সাথে দেখা করতে। হিরোকো কোবাইসি কেন মেয়েদের বৃত্তি দেন এই প্রসঙ্গে হাঙ্গার ফি ওয়ার্ল্ডের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আনজুমান আক্তার জানান, জাপানী এই নারী পেশায় একজন ফটোগ্রাফার । ছোট বেলায় তিনি খুব গরীব পরিবারের ছিলেন। অন্যের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিনি লেখাপড়া করেছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যদি কখন বড় কিছু হতে পারে তাহলে তিনি গরীব মেধাবী মেয়ের লেখাপড়ায় সহযোগীতা করবেন। সেই প্রতিজ্ঞা থেকে কোবাইসি এই শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করে থাকে।
তিনি আরো জানান, এটি এখন আর শুধুমাত্র বৃত্তিপ্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে বৃত্তিপ্রাপ্ত মেয়েদের জীবনদর্শন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের জীবনকে সুন্দর করার স্বপ্ন, ইত্যাদি বিষয়ে তাদের সাথে আলোচনা করা হয়। মিস হিরোকো কোবায়েসির মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের মানুষও এখন এই কর্মসূচী এগিয়ে নিতে মেয়েদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কোবায়েসির মতোই  বাংলাদেশে এরই মধ্যে প্রায় ১১জন মিলে প্রতি বছর মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে যেতে তারাও কোবায়েসির পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করছেন, মেয়েদের পড়ালেখাসহ তাদের ভাল-মন্দ খোঁজ খবর নিচ্ছেন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি আশা করেন এমন একটি প্রক্রিয়া বৃত্তিপ্রাপ্ত মেয়েদের পড়ালেখা শেষ করা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং একটি সুন্দর জীবন গড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। আমরা সকলের চাই মেয়েদের এই দীক্ষা বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হোক, আমরা সকলেই তাদের পাশে দাঁড়াই। মেয়েরা এগিয়ে গেলে, সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে এগিয়ে যাবে আমাদের বাংলাদেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন: