‘আমি তো স্কুলে ওকে এত যত্ন নিয়ে পড়াইনি’ - মতামত - Dainikshiksha

‘আমি তো স্কুলে ওকে এত যত্ন নিয়ে পড়াইনি’

মো. মোতাহার হোসেন |

আমাদের দেশে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে যেমন সম্পর্ক অনেকটা তেমনই। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সবদিক বিবেচনা থেকেই শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষক অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কটি একটু ভিন্ন মাত্রারও বটে। মা-বাবার যে কথাটি কোনো ছেলে-মেয়ে খুব সহজেই অগ্রাহ্য করছে, শিক্ষক বলা মাত্রই সে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই কথাটাই মেনে নিচ্ছে। আমাদের সমাজে এটি একটি খুব স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। 

শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকের এই প্রভাব চিরন্তন। তবে স্থান, কাল ও পাত্রভেদে এর রকম-ফের হতে পারে। যে শিক্ষক তাঁর গুণ, মমতা, আর ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনকে নাড়া দিতে পারেন তাঁর পক্ষে শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে স্বপ্নের ঠিকানা দেখানো সম্ভব। কোনো কোনো শিক্ষকের মধ্যে এ গুণগুলো স্বভাবজাত হিসেবেই থাকে। আর এ ধরনের শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আপনজন হিসেবে মনে করে। তাঁদের পাঠদানকে যেমন অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে শুনে তেমনি তাঁদের আদেশ উপদেশকেও শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে মানার চেষ্টা করে এবং তারা অনেকেই পৌঁছে যায় স্বপ্নের গন্তব্যে।

শিক্ষার্থীরা আমাদেরকে শুধু যে সম্মান করে তাই নয় বরং তারা অনেক ক্ষেত্রে উদারতার দিক থেকেও আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার শিক্ষার্থীদের উদারতার কাছে হেরে গেছি অনেকবার। আমার যেসব শিক্ষার্থী ডাক্তার তাদের কাছে চিকিৎসার জন্য গেলে তারা এমন যত্ন করে আমাকে চিকিৎসা দেয় যে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। কোনো কোনো সময় বিব্রত বোধও করি। ভাবি আমি তো স্কুলে ওকে এত সুন্দরভাবে যত্ন নিয়ে পড়াইনি। আমারও তো সুযোগ ছিল ওর মতো শিক্ষার্থীদেরকে আরও ভালোভাবে পড়ানোর। সেটা তো আমি করিনি। নিজের কাছে নিজেকেই ছোট মনে হয় তখন। 

ডাক্তারদের কথা শুধু নয়, সকল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই আশাতীত সুন্দর আচরণ পাই। আমার যে ছাত্র বাসস্ট্যান্ডের টিকেট মাস্টার সেও তো দৌড়ে আসে আমাকে একটা ভালো সিট পাইয়ে দেয়ার জন্য। যে শিক্ষার্থী প্রশাসক, যে পুলিশ অফিসার, এক কথায় যে যেখানে আছে সবার কাছ থেকেই আমরা ভিআইপি মর্যাদা পেয়ে থাকি। কিন্তু আমরা কি আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন স্পেশাল কিছু করি? আমরা কত ভাগ শিক্ষক আছি যাঁরা খুব ভালো করে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে, কিছুটা গবেষণা করে পাঠদান করতে ক্লাসে যাই?

আহারে! অভিভাবক মহোদয়গণ কত আশা করে তাঁদের সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠান। আর যখন দেখেন স্কুলে আশানুরূপ পড়া হচ্ছে না তখন বাধ্য হয়েই নিজে খেয়ে না-খেয়ে গাটের পয়সা খরচ করে প্রাইভেট টিউটরের কাছে বা কোচিং সেন্টারের শরণাপন্ন হন। কত কষ্ট করে, কত দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যে শিক্ষার্থীদেরকে ভালো ফলাফল করতে হয় তার কোনো শেষ নাই। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন তো বিদ্যালয়গুলোর এত সুযোগ সুবিধা, এত বিল্ডিং, মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামাদি, আইসিটি লার্নিং সেন্টার, এতসব ছিল না। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বলতে ছিল শুধু বিএড, আরএম, এড। তাঁদের দেশ-বিদেশে এত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও তো ছিল না। কিন্তু তখন তো শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের পড়াশোনার বাইরে প্রাইভেট টিউটরের বা কোচিং সেন্টারে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। বর্তমানে সারাদেশের এমন কয়টা স্কুলের নাম বলা যাবে যেসব স্কুলে পড়লে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে যেতে হয় না? এখন সমস্যাটা কোথায়? আমরা কি পারি না সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সর্বগ্রাসী সমস্যার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে?

ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এশিয়ার জাপান ও চীন তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন সুন্দরভাবে সাজিয়েছে যে সেখানকার শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে। এমনকি আমাদের খুব কাছের দেশ ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারতও তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ তুলনায় আমরা এখনও বেশ পিছিয়ে। আমাদের সরকারও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্নভাবে ভালো একটা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু আমি মনে করি সকল প্রচেষ্টার সফলতা নির্ভর করবে শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকার উপর। আমরা প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণ নিলাম আর বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে তা জোরালোভাবে কাজে লাগালাম না তাতে কী লাভ হবে আমি বুঝি না।

উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক শুধু আবেগের উপর নির্ভর করে না। এটা সেখানে পেশাদারিত্বের বিষয়। সেখানে শিক্ষাব্যবস্থাটা এমনভাবেই সাজানো যেখানে একজন শিক্ষক তাঁর  শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে কাজ করতে বাধ্য। আমেরিকার সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ হয় দুই বা তিন বছরের জন্য চুক্তির ভিত্তিতে। চুক্তির মেয়াদ শেষে তাঁদের কাজের মূল্যায়নের উপর নির্ভর করে তাঁদের চাকরির মেয়াদ বাড়বে কিনা। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকায় টিইএ প্রোগ্রামে প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় আমাকে নেব্রাস্কা স্টেটের লিংকন শহরের নর্থ স্টার হাইস্কুলে দুই সপ্তাহ কাজ করতে হয়েছিল। সেখানে নবম শ্রেণিতে মি. স্কট ফ্রেইজেনের সাথে পাঠদানে অংশ নিতাম। পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থী, সমাজব্যবস্থা, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ করতাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম চুক্তির মেয়াদ শেষে কারও চাকরি চলে যায় কিনা। উনি বলেছিলেন যে কখনও কারও চাকরি যায় না। আমি খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম। এরপর তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করলেন এই বলে যে, যেহেতু সবাই জানে ভালোভাবে কাজ না করলে চাকরি চলে যাবে তাই সবাই যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করেন। আর তাই চাকরিও হারাতে হয় না। পেশাদারিত্বের বিষয়টি এমনই। 

আমেরিকায় শিক্ষার্থীদেরকে কতটুকু সহযোগিতা করা হয় তার একটা উদাহরণ দেই। একদিন ক্লাস টেস্ট নেয়ার সময় জন নামের এক ছাত্র বেঁকে বসল। সে কোনোমতেই পরীক্ষা দিবে না। অথচ ক্লাস টেস্টের নম্বর যোগ হবে মূল পরীক্ষার নম্বরের সাথে। মি. স্কট জনকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে কাউন্সিলরের সাহায্য চাইলেন। কাউন্সিলর ভদ্র মহিলা এসে জনের একবারে পায়ের কাছে বসে অত্যন্ত অনুনয়ের সাথে বুঝিয়ে শুনিয়ে অবশেষে জনকে পরীক্ষা দিতে রাজি করাতে পারলেন। জন পরীক্ষা দিল।

আমাদের দেশেও শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের আচরণের অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। তাদেরকে মারধর করা, বকাঝকা করা, তাদের উপর চড়াও হওয়া এসব বিষয় এখন আর হয় না বললেই চলে। প্রকৃতপক্ষে, একটু প্রস্তুতি নিয়ে পাঠদানকে আকর্ষণীয় করতে পারলে শিক্ষার্থীরা যে মনযোগী হবে না এমন নয়। আর শিক্ষার্থীদেরকে মনযোগী করতে পারলে হুমকি ধমকি ছাড়াই সুন্দর ক্লাস নেয়া সম্ভব। 

এ লেখাটি লেখতে গিয়ে আমাকে কিছুটা নস্টালজিয়ায় তো পেয়েই বসেছে। মনে হচ্ছে আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি তখনকার একটি ক্লাসরুমে। আমার সামনে উদগ্রীব হয়ে বসে আছে কিশোর বয়সী অনেক শিক্ষার্থী। যারা জ্ঞানের রাজ্যে অবগাহন করতে চায়। তাদের কত আশা, কত আকাঙ্ক্ষা। তাদের চোখে মুখে স্বপ্নের হাতছানি। আমি তাদের আশা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছিলাম? নাকি কিছুই পারিনি? শিক্ষক হিসেবে আমি সব সময়ই অতৃপ্ত ছিলাম। মনে হতো আরও ভালোভাবে যদি পাঠদান করতে পারতাম তবে কতই না ভালো হতো। 

একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। সেটা হল শিক্ষকতা শুধুমাত্র একটা চাকরি বা সাধারণ পেশা নয়। এটা একটা মহান ব্রত। একটা ছোট দিয়াশলাই দিয়ে যেমন বিশাল বড় আগুন জালানো সম্ভব তেমনি নিজের প্রজ্ঞা, মননশীলতা ও সৃজনশীলতা দিয়ে শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে খুঁজে বের করে সেটাকে জাগিয়ে তোলে ও পরিচর্যা করে মহিরুহে পরিণত করাও শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব। এটা কোনো সাধারণ কাজ নয়। আর এই কাজটি যে শিক্ষক যত সুচারুভাবে করতে পারেন, তিনিই সফল হন। আর শিক্ষার্থীর সাথে তাঁর আত্মিক সম্পর্কও তত দৃঢ় হয়। আর এ সম্পর্ক যেমন ফলপ্রসূ তেমনি সুদূরপ্রসারীও। 

আর একটা কথা না বললেই নয়। আমরা কিন্তু সব সময় সেসব শিক্ষার্থীর কথাই উল্লেখ করে থাকি যারা সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যে শিক্ষার্থী জীবনযুদ্ধে জিততে পারেনি, রিকশা, অটো বা সিএনজি চালায় সেকি আমার ছাত্র না? তারও তো স্বপ্ন ছিল একটা সুন্দর জীবনের। হয়তো পারেনি। তাতে কী? সেও তো আমারই ছাত্র। আমি আমার সকল ছাত্রের কল্যাণ ও শান্তি চাই। কেউ কষ্টে আছে একথাটা যেন শুনতে না হয়। গরীব-ধনী, ছোট-বড় যে যেখানেই আছে সবার অন্তরের সুখটা যেন থাকে। রাব্বুল আলামিন মহান আল্লাহ তায়া’লার কাছে আমার এটুকুই চাওয়া। আমার এই লেখাটি আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৬ ব্যাচের সব শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলাম। 

লেখক:  শিক্ষক, কেন্দুয়া, নেত্রকোণা।

একাদশে ভর্তি: ২য় দফার আবেদন শুরু - dainik shiksha একাদশে ভর্তি: ২য় দফার আবেদন শুরু বিসিএসেও তৃতীয় পরীক্ষক চালু - dainik shiksha বিসিএসেও তৃতীয় পরীক্ষক চালু ডিগ্রি ২য় বর্ষ পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বাড়লো - dainik shiksha ডিগ্রি ২য় বর্ষ পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বাড়লো জিপিএ-৫ বিলুপ্তির পর যেভাবে হবে নতুন গ্রেড বিন্যাস - dainik shiksha জিপিএ-৫ বিলুপ্তির পর যেভাবে হবে নতুন গ্রেড বিন্যাস পাবলিক পরীক্ষার গ্রেড: যা আছে আর যা হবে - dainik shiksha পাবলিক পরীক্ষার গ্রেড: যা আছে আর যা হবে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কঠোর নজরদারির নির্দেশ গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর - dainik shiksha প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কঠোর নজরদারির নির্দেশ গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর শিক্ষক নিবন্ধন: ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিষয়ের নতুন সিলেবাস দেখুন - dainik shiksha শিক্ষক নিবন্ধন: ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিষয়ের নতুন সিলেবাস দেখুন সার্টিফিকেট ছাপার আগেই ২ কোটি টাকা তুলে নিলেন ছায়েফ উল্যাহ - dainik shiksha সার্টিফিকেট ছাপার আগেই ২ কোটি টাকা তুলে নিলেন ছায়েফ উল্যাহ রাজধানীর সকল ফার্মেসি থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এক মাসের মধ্যে সরিয়ে নিতে হবে: হাইকোর্ট - dainik shiksha রাজধানীর সকল ফার্মেসি থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এক মাসের মধ্যে সরিয়ে নিতে হবে: হাইকোর্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া  - dainik shiksha please click here to view dainikshiksha website