যে কলমের কালি সহজে শেষ হয় না - শিক্ষাবিদের কলাম - Dainikshiksha

যে কলমের কালি সহজে শেষ হয় না

প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন |

ষাট দশকের গোড়ার দিকে আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের প্রথম অথবা দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। স্কুল ঘরের ইটের পায়ার উপর ভর করা ৬-৮ ইঞ্চি উঁচুতে তক্তায় বসতাম আমরা। সেকালে মাটির স্লেটে অথবা কালো প্রলেপ মাখা কাঠের উপর মাটির পেন্সিল দিয়ে তাল গাছের চওড়া পাতা খানিকটা শুকিয়ে বাঁশের কঞ্চি চোখা করে দোয়াতে ট্যাবলেট-গুলা বা কয়লার গুড়ার কালিতে চুবিয়ে চুবিয়ে লিখতে হতো। গ্রাম-গঞ্জে ঝরনা কলমের তেমন প্রচলন ছিল না। আমাদের হাতে আসার তো প্রশ্নই ওঠে না।

স্কুলে একদিন আমার এক বন্ধু রফিকের বুক-পকেটে দেখলাম নতুন কলম। তার বাবা শহরের কোনো এক কারখানায় চাকরি করতেন। ছুটিতে বাড়ি আসার সময় কলমটি এনেছেন। ওই কলম দিয়ে কাগজে একটু লিখতে দিতে তাকে অনেক অনুনয়-বিনয় করলাম। সে কলমটি আমার চোখের সামনে নেড়ে চেড়ে দেখালো, কিন্তু আমাকে ছুঁতেই দিল না। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সে আরো বলল, ‘এই কলমের কালি কোনোদিন শেষ হবে না। নতুন করে কালি ভরার ঝামেলা ছাড়াই আজীবন লেখা যাবে!’ কচি মনে ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আমি কোনো ক্রমেই বুঝতে পারলাম না সেটা কেমন করে সম্ভব! অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছিলাম, ওটা ঝরনা কলম ছিল না, ছিল বলপয়েন্ট কলম। আজকের এইদিনে ভাবতে খুবই অবাক লাগে যে, দুনিয়ার ক্ষমতাধর অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান সুলায়মানসহ অনেক রাজা বাদশারা কেন পাখির পালক কালির দোয়াতে চুবিয়ে চুবিয়ে রাজ্যের ফরমান লিখে ও তা জারি করে আট’শ বছর রাজ্য শাসন করেছিলেন।

স্কুল জীবনের সেই ঘটনা মনে পড়ল কয়েক দশক পরে, দৈনিক ইত্তেফাকে ‘ফিরে দেখা বলপয়েন্ট কলমের ইতিহাস’ লেখাটি পড়ার পর। ইতিহাস মতে, ‘আমেরিকাতে বলপয়েন্ট আবিস্কার হয়েছে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে কিন্তু ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এর তেমন উন্নয়ন হয়নি। ওই সময় মার্কিন বিমান বাহিনী তাঁদের প্রয়োজনে ঝরনা কলমের পরিবর্তে বলপয়েন্ট কলমের আধুনিক সংস্করণ তৈরি করে।’ গুগল সার্চ দিয়ে বলপয়েন্ট কলমের যে ইতিহাস আমি পেয়েছি তা নিম্মরূপ।

জন লাউড নামে আমেরিকার এক চামড়া ব্যবসায়ী ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম বলপয়েন্ট কলমের আদি সংস্করণ তৈরি করে তার প্যাটেন্ট নেন। উদ্দেশ্য কাগজে লেখা নয় বরং ট্যান করা চামড়া সোজা করে কাটার জন্য লাইন টানা। পরবর্তী ৩০ বছরে খোদ আমেরিকাতেই বলপয়েন্ট কলমের আরো ৩৫০টি ভিন্ন ভিন্ন প্যাটেন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু কোনটিই বাণিজ্যিকীকরণ সম্ভব হয়নি। কারণ ছিল রিফিলের কালি নি:সরণ সমস্যা। পাতলা হলে লিক করত, আর ঘন হলে জমে যেত। আবহাওয়া ও তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে কোনো কোনো সময় একই কালিতে দু’টো সমস্যাই দেখা দিত। লাউডারের মূল প্যাটেন্টের প্রায় ৫০ বছর পর ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ল্যাজলো বিরো নামে এক হাঙ্গেরিয়ান ক্যামিস্ট ও তাঁর ভাই জর্জ বিরোর হাতে বলপয়েন্ট কলমের আধুনিক সংস্করণ আবিস্কৃত হয়। বিরো এক সময় একটি সংবাদপত্র অথবা ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন। সম্পাদক হিসাবে তাঁকে নিউজপ্রিন্ট কাগজে অনেক লেখালেখি করতে হত। ঝরনা কলমে ঘন ঘন কালি ভরতে গিয়ে তিনি বিরক্ত হয়ে পড়েন। তার চেয়ে বড় সমস্যা ছিল ঝরনা কলমের ধারালো নিবের খোঁচায় নিউজ প্রিন্ট কাগজ প্রায়ই ছিড়ে যেত।

এই বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য অনেক চিন্তাভাবনা করে ল্যাজলো এবং জর্জ যৌথভাবে ঘন কালি এবং কলমের মুখে কালি প্রতিরোধক ‘রোলিং বল’-এর ডিজাইন আবিষ্কার করেন। কিছুদিন পর বিরো ভ্রাতৃদ্বয় ছুটি কাটাতে যান সাগরতীরে। সেখানে দৈবপাকে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় সফররত তৎকালিন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট অগাস্টিন জাস্টোর। কথায় কথায় তাঁরা প্রেসিডেন্ট জাস্টোকে তাঁদের কলমের মডেল দেখান এবং তাঁদের প্রচেষ্টার কথা জানান। জাস্টো বিরো ভ্রাতৃদ্বয়ের আবিষ্কারে অভিভূত হয়ে বলেন, ‘তোমরা আর্জেন্টিনাতে এসে এর উৎপাদন শুরু কর। কয়েক বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তারপর বিরোরা আর্জেন্টিনাতে গেলেন। কারো কারো মতে, বিরো ভ্রাতৃদ্বয় ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুন ব্রিটিশ সরকার থেকে এবং পরে প্যারিসে থেকেও আবিস্কৃত ডিজাইনের প্যাটেন্ট নেন। প্যাটেন্ট যেখানেই করা হোক না কেন, ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সহায়তায় তাঁরা তাঁদের কলমের উৎপাদন শুরু করেন আর্জেন্টিনাতে। কিন্তু এবারও বলপয়েন্ট কলম সফলতার মুখ দেখেনি। কারণ কলমের মুখের রোলিং বলের ডিজাইন ডিফেক্টের কারণে ৯০ ডিগ্রী কোণে খাড়া করে না ধরলে কালি বের হচ্ছিল না। আবার কোনো কোনো সময় অতিরিক্ত কালি বেরিয়ে আসছিল। বিরো ভ্রাতৃদ্বয় হতাশ হলেন না। আবার ল্যাবে ফিরে গেলেন। রোলিং বলে গ্র্যাভিটি নির্ভরতার পরিবর্তে ‘ক্যাপিরস্রি অ্যাকশন’ চালু করলেন। বলপয়েন্টকে নতুনভাবে ডিজাইন করলেন যাতে একটি ‘স্পঞ্জ’-এর মত কাজ করে এবং অতিরিক্ত কালি ঝরা বন্ধ হয়। বিরো ভ্রাতৃদ্বয়ের নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে উন্নত কলম উৎপাদিত হল, বাজারে বিক্রিও হল, কিন্তু যেভাবে জনপ্রিয় হওয়ার কথা ছিল তা হল না। এরইমধ্যে বিনিয়োগকারীদের মূলধন ফুরিয়ে গেল। বলপয়েন্ট কলমের নতুন অগ্রযাত্রা আবার থমকে গেল।

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। আর্জেন্টিনাতে কর্তব্যরত আমেরিকান এয়ার ফোর্সের লোকদের নজরে এল বলপয়েন্ট কলম। ঐকলম দেখে তাঁরা সাথে সাথে ভাবলেন, প্লেনে উড্ডয়নকালে ঝরনা কলম থেকে বলপয়েন্ট কলমের উপযোগিতা অনেক ভাল এবং বেশি হবে। আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় ঘন ঘন কালি ভরার বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে এবং কালির ওভারফ্লো সমস্যারও সমাধান হয়ে যেতে পারে। তাঁদের মাধ্যমে খবর পেয়ে মার্কিন ফেডারেল সরকার অনেকগুলো কলম কোম্পানির কাছে বলপয়েন্ট কলম উৎপাদনের জন্য বিরো ভ্রাতৃদ্বয়ের নিকট ডিজাইন পাঠাল। তার মধ্যে ‘এবাহার্ড ফেবার’ নামে এক আমেরিকান কোম্পানি বিরো ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছ থেকে ৫ লক্ষ ডলার দিয়ে বলপয়েন্ট কলমের প্যাটেন্ট রাইট কিনে নিয়ে আরেকটু উন্নত করে কলম তৈরি করার চিন্তা ভাবনা করছিল। এমন সময় ‘মিল্টন রেনোল্ডস’ নামে শিকাগোর এক সেলসম্যান আর্জেন্টিনা থেকে বিরো ভ্রাতৃদ্বয়ের মডেলের কলম এনে সামান্য ঘসা-মাজা করে প্যাটেন্ট রাইটের তোয়াক্কা না করে দেদারসে বলপয়েন্ট কলম বানিয়ে বাজারজাত করতে শুরু করেন। রেনোল্ডসের ব্যবসা যখন জমজমাট, তখন এক পর্যায়ে তাঁর অস্থায়ী কারখানায় ৩০০ শ্রমিক কাজ করত। মার্কেটিং এর জন্য রেনোল্ডস ‘গিম্বলস রিটেল স্টোর’-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়।

বিরো ভ্রাতদ্বয় আবিষ্কার করলেও বলপয়েন্ট কলম রেনোল্ডস এবং ‘গিম্বলস রিটেল স্টোরের মাধ্যমে আমেরিকা তথা বিশ্বের বাজারে সর্বপ্রথম ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরের কোনো এক সকালে নিউ ইয়র্কের গিম্বলস্ ডিপার্টমেন্ট স্টোরে একসাথে ৫ হাজার কাস্টমার ভীড় জমায় রেনোল্ডস বলপয়েন্ট কলম কেনার জন্য। ঐ সময় প্রথমবারের মত এক দোকানে এক দিনে ১০ হাজার বলপয়েন্ট কলম বিক্রি হয়েছিল। সেদিন প্রতিটি কলমের দাম ছিল সাড়ে বারো ডলার করে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের সাড়ে বারো ডলারের বর্তমান মূল্যমান কত হতে পারে আপনারা সহজেই অনুমান করে নিতে পারেন। চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি রেনোল্ডস লক্ষ লক্ষ বিরো বলপয়েন্ট কলম বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার কামাই করে। হাঙ্গেরীর বিরো ভ্রাতৃদ্বয় অক্লান্ত পরিশ্রম করে বলপয়েন্ট কলম আবিষ্কার করলেন এবং শিকাগোর মিল্টন রেনোল্ডস এর বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কালির দোয়াত  এবং বার বার কালি ভরে লেখার বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পেল। অব্যাহত থাকুক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা।

লেখক :  পরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)

১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলিমিনারিতে পাস ২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ - dainik shiksha ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলিমিনারিতে পাস ২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেকারভাতা দেয়ার চিন্তা সরকারের - dainik shiksha বেকারভাতা দেয়ার চিন্তা সরকারের তদবিরে তকদির: চাকরির বাজারে এগিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটরা - dainik shiksha তদবিরে তকদির: চাকরির বাজারে এগিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটরা নতুন সূচিতে কোন জেলায় কবে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা - dainik shiksha নতুন সূচিতে কোন জেলায় কবে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এমপিওভুক্ত হচ্ছেন ১০ হাজার ৮৫ শিক্ষক - dainik shiksha এমপিওভুক্ত হচ্ছেন ১০ হাজার ৮৫ শিক্ষক প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২৪ মে শুরু - dainik shiksha প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২৪ মে শুরু সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি - dainik shiksha সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা - dainik shiksha ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের স্কুলের ছুটির তালিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া - dainik shiksha জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খোলা সব ফেসবুক পেজই ভুয়া please click here to view dainikshiksha website